সঞ্জীদা খাতুন: এক কালজয়ী সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের জীবনকথা
১৯৩৩ সালের ৪ এপ্রিল, ঢাকার ১১৩ সেগুন বাগানে জন্মগ্রহণ করেন সঞ্জীদা খাতুন। পরিবারের সপ্তম সন্তান হিসেবে তাঁর আগমন ঘটে, এবং মাছের মতো বড় চোখের জন্য নাম রাখা হয় মীনাক্ষী। পরবর্তীতে তিনি পরিচিত হন মিনা বা মিনু নামে, কিন্তু তাঁর পোশাকি ডাক নাম হয়ে ওঠে সঞ্জীদা খাতুন। ঋতুরাজ বসন্তের মতো আনন্দময় জীবনযাপন করে, তিনি বিরানব্বই বসন্ত পেরিয়ে ঝরে পড়েন। তাঁর বিখ্যাত গান 'ঝরা পাতা গো, আমি তোমারি দলে' যেন তাঁর জীবনদর্শনের প্রতিফলন। দীর্ঘ ৯ দশকের জীবনে তিনি স্নিগ্ধ বাসন্তী আলো ছড়িয়েছেন এবং শত্রু-মিত্র সবার অন্তরে আলোড়ন তুলেছেন।
দেশের অস্থির সময় ও সঞ্জীদার ভূমিকা
দেশ যখন অস্থির ও উন্মাতাল অবস্থায় ছিল, সরকার পতনের পর উপদেষ্টাদের হাতে ক্ষমতা চলে যায়। সংস্কারের নামে বাংলার গলায় ফাঁস পরানোর চেষ্টা করা হয়, এবং পাকিস্তানি শাসনামলের বিরোধিতার ইতিহাস উপড়ে ফেলা হয়। মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের ভোলানোর মহোৎসব শুরু হয়, যেখানে বাক্স্বাধীনতা শুধু একটি গোষ্ঠীর সম্পদে পরিণত হয়। উগ্র দমননীতি ও সন্ত্রাসের মুখোমুখি হয় সাধারণ মানুষ। এই সময়ে সঞ্জীদা খাতুনের তেজোদীপ্ত চেতনায় ক্রমান্বয় ক্ষয় দেখা দেয়, এবং তাঁর স্বজনরা হতভম্ব হয়ে পড়েন। বাঙালির স্বাধীন দেশ পিছু হটছে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।
শেষ দিনগুলো ও হাসপাতালবাস
২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে সঞ্জীদা খাতুনের স্বাস্থ্য আরও অবনতি হয়। কথা কমে যায়, এবং প্রিয় গানও একঘেয়ে লাগতে শুরু করে। তিনি বিছানায় শুয়ে থাকতেন, নড়াচড়া সীমিত হয়ে পড়ে। ছায়ানট তখন তাঁর আহ্বান আমলে নিয়ে, বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বাংলা সংস্কৃতির প্রচারের কথা বলেন। ডায়ালাইসিসের চিকিৎসা শুরু হয়, এবং তিনি হুইলচেয়ারে করে হাসপাতাল যাতায়াত করতেন। ২০২৫ সালের মার্চ মাসে আবার হাসপাতালে ভর্তি হন, এবং ডাক্তাররা লাইফ সাপোর্টের কথা জানান। নাতনি প্রকৃতি আমেরিকা থেকে ছুটে আসেন, এবং পরিবারের সদস্যরা উদ্বেগে থাকেন।
হাসপাতাল থেকে ছুটি পেয়ে বাড়ি ফিরলেও, এক ঘণ্টার মধ্যে তিনি বাক্রহিত হয়ে পড়েন। আবার হাসপাতালে নেওয়া হয়, এবং ব্রেনে একাধিক স্ট্রোক ধরা পড়ে। পাঁচ দিন পর, ২০২৫ সালের এক রাতে, তিনি চিরতরে চলে যান। স্বজন, সহযাত্রী, ও সাংবাদিকরা ছুটে আসেন, এবং ছায়ানটকর্মীরা স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান স্থগিত করার কথা ভাবেন। কিন্তু সন্তানরা দৃঢ়ভাবে জানান, দেশের দায়িত্ব অনেক ওপরে।
শ্রদ্ধাঞ্জলি ও দেহদান
সঞ্জীদা খাতুনের ইচ্ছা ছিল গান ও দেহদানের মাধ্যমে বিদায় নেওয়া। বিদেশ থেকে নাতি-নাতনিরা ফিরলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ছায়ানট সংস্কৃতি-ভবনে শ্রদ্ধাঞ্জলি অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ভবন ছাড়িয়ে ধানমন্ডি সড়কে দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। ভেতরে তাঁর প্রিয় গানের মুক্তকণ্ঠ স্রোত বয়ে যায়, এবং সবাই মনপ্রাণ ঢেলে গান গায়। পরবর্তীতে তিনি জাতীয় শহীদ মিনারে নেওয়া হন, যেখানে ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিমহলে শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয়।
হিমঘরে এক রাত কাটানোর পর, সকালে দেহদানের আচার সম্পন্ন হয়। তাঁর চিরসাথি সুর, ফুল, আটপৌরে শাড়ি, ও লাল টিপ দিয়ে সাজানো হয়। পরিবার সগৌরবে এই ইচ্ছাপূরণের কথা জানান, যা মানুষের প্রতি পরম ভালোবাসার নিদর্শন।
উগ্রবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম
সঞ্জীদা খাতুনের সময় জুড়ে উগ্রবাদীরা তাঁর মননের বিরোধী ছিল, এবং সংস্কৃতিপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমে হামলা চালাতো। কিন্তু এই হামলাগুলো প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও জনপ্রিয় করে তোলে, এবং গড়ার কারিগররা হতোদ্যম হয় না। ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলার পর, সঞ্জীদা খাতুন স্বয়ং মঞ্চে আসীন হয়ে সবাইকে অভয় দেন, যা সংস্কৃতির শক্তি প্রদর্শন করে।
তাঁর প্রয়াণের পরও, সমাজমাধ্যমে অশ্লীলতা ও কটুকাটব্য দেখা যায়, কিন্তু ভক্তরা তাঁর নির্ভীক গানের সুরবাণীতেই বিদায়সভা সাজায়। সব মহলকে তিনি প্রবলভাবে আন্দোলিত করেছেন, ভালোয় বা মন্দে। শেষ দেখায়, তিনি আটপৌরে শাড়ি ও লাল টিপে সজ্জিত থাকেন, যা বাঙালির ঘরে ঘরে স্বাধীনচেতা মানবদরদি দেশপ্রেমিকের জন্ম কামনা করে।



