হামেদ গাড়িয়াল: গ্রামীণ জীবনের মিথ থেকে আধুনিকতার সংঘাতে এক গাড়োয়ানের যাত্রা
হামেদ গাড়িয়াল: গ্রামীণ মিথ থেকে আধুনিকতার সংঘাত

হামেদ গাড়িয়াল: গ্রামের কিংবদন্তি থেকে আধুনিক সংঘাতের মুখে

গ্রাম সাতগ্রামে হামেদ গাড়িয়ালের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে এক জীবন্ত কিংবদন্তির মতো। তার চারপাশে নানা উপকথা ও গল্প জড়িয়ে আছে, যা গ্রামবাসীর মুখে মুখে ফেরে। একবার ফজর আলি বেপারির তামাকবাহী তিন গরুগাড়ি চাঁদনি রাতে বদরগঞ্জের দিকে যাচ্ছিল। বোয়ালমারীর বটগাছের নিচে কালভার্ট ভাঙা অবস্থায় প্রথম গাড়িটি আটকে যায়। হবিবর গাড়োয়ান গাড়ি তুলতে ব্যর্থ হয়, পেন্টি দিয়ে বলদ দুটোর পিঠে মারতে মারতে চাকা চাকা দাগ পড়ে যায়। চাঁদের আলোয় গরুর পিঠে চাবুকের দাগ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল, গরু দুটি প্রচণ্ড চেষ্টা করেও গাড়ি তুলতে পারছিল না।

ফজর আলি সাইকেলে করে সেখানে এসে দেখে হামেদ গাড়িয়াল পেছনের গাড়িতে বসে তামাশা দেখছে। হামেদ নেমে এসে গরুর পিঠের দাগ দেখে বলল, “সরেন দেখি বাহে তোমরা, গরু দুটাকে মারিয়া তো জখম করি ফেলাইছেন, গাড়িয়াল নাকি কসাই বাহে।” সে চালকের আসনে বসে বলদের পিঠে হাত বুলিয়ে দিল, মুখে কিছু কুচ্ছ বোল তোলে, আর গাড়ি যেন ওজনবিহীন হয়ে উঠল। গাড়ি চলতে শুরু করে, ফজর আলি বেপারি বুকে থুতু দেয়। এই ঘটনা হামেদের খ্যাতি আরও বাড়িয়ে দেয়।

হামেদের ব্যক্তিগত জীবন ও সংগ্রাম

হামেদ গাড়িয়ালের বয়স মাত্র বিশ-বাইশ বছর। অল্প বয়সেই তার বাবা ছগির গাড়িয়াল মারা যান, যিনি এলাকায় বিখ্যাত ছিলেন। মৃত্যুর আগে ছগির একটি ধবধবে শাদা মনুষ্যাকৃতি মূর্তি দেখতে পান, যা তাকে তার সময় শেষ হওয়ার সংকেত দেয়। তিনি তিন ছেলেকে ডেকে ছোট ছেলে হামেদকে বলদের দড়ি ধরিয়ে দেন, বললেন, “বাপধন, বাপ-দাদায় যে কাম করি খাইত, তাক তোকেই করা লাগবে বাপ, নে ধর দড়িখান।” তিন দিন পর বাবা মারা গেলে হামেদ বুঝে নেয়, এখন থেকে তার নামের সঙ্গে গাড়িয়াল শব্দটি চিরদিনের জন্য জড়িয়ে থাকবে।

হামেদের জীবনযাত্রায় গ্রামীণ রোমাঞ্চ ও প্রেমের ছোঁয়া লাগে। ফকিরপাড়ার সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় সে গান গায়, “বাউকৃষ্ঠা বাতাস যেমন ঘুরিয়া ঘুরিয়া মরে; ওরে, সেই মতো মোর গাড়ির চাকা পন্থে, পন্থে ঘোরে রে।” আবদালের বউ ভাবি ও তার ননদ জরিনার সঙ্গে হামেদের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একদিন জরিনা তাকে মাত্রাতিরিক্ত চুন দেওয়া পান খাওয়ায়, হামেদের মুখ পুড়ে যায়, সে টিউবওয়েলের দিকে দৌড়ায়। জরিনা খিলখিল করে হাসে, আর হামেদের মনে তার প্রতি আকর্ষণ বাড়তে থাকে।

অর্থনৈতিক সংকট ও পরিবর্তন

কার্তিক মাসে এলাকায় ভয়াবহ আকাল পড়ে। খ্যাপের অভাব দেখা দেয়, হামেদের দুই ভাই সংসার চালাতে হিমশিম খায়। বড় ভাই গরু বিক্রির পরামর্শ দিলে হামেদ প্রথমে রাগ করে, কিন্তু না খেতে পেয়ে ভাইদের শিশুরা কাঁদতে থাকলে সে মানতে বাধ্য হয়। বলদ দুটো হাটে বিক্রি হয়ে যায়, গাড়িও। হামেদ কাজের সন্ধানে রংপুর শহরে গিয়ে রিকশা চালানোর কাজ জুটিয়ে নেয়।

অগ্রহায়ণ মাসে ধান কাটার সময় হামেদ গ্রামে ফিরে আসে। জরিনার কাছে যায়, কিন্তু জরিনা বলে, “হামেদ গাড়োয়ানক মুই ভালো পাঁও, কিন্তুক উয়ার যদিল গরুগাড়িট না থাকিল, উয়ার সাথে মোর কিসের কথা।” এই কথা হামেদের বুকে গভীর আঘাত করে, সে গরুগাড়ি কেনার পুঁজি জোগাড় করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়।

আধুনিকতার মুখোমুখি হামেদ

দুই বছর পর হামেদ নতুন গরুগাড়ি নিয়ে গ্রামে ফিরে আসে, কিন্তু সময় বদলে গেছে। এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধ তৈরি হয়েছে, রাস্তা পাকা হয়েছে, এবং রিকশাভ্যানের প্রচলন বাড়ছে। গরুগাড়ির চাহিদা কমে যায়, হামেদের গাড়ি কেউ ভাড়া চায় না। তার ভাইয়েরা অসন্তুষ্ট হয়, কারণ বলদ পুষতে খরচ বাড়ছে।

হামেদ ভাবির কাছ থেকে জরিনার ঢাকার ঠিকানা নিয়ে সেখানে যায়। জরিনা গার্মেন্টে কাজ করে, সে হামেদকে বলে, “গরুগাড়ি কিনছেন। ভালো করছেন। কিন্তুক আমি চাই তোমরা ঢাকাত থাকেন। মোর কাছে কাছে থাকেন।” জরিনা তাকে রিকশা চালানোর প্রস্তাব দেয়, গরুগাড়ি বিক্রি করে ঢাকায় থাকতে বলে। হামেদ দ্বিধায় পড়ে যায়: তার প্রিয় গরুগাড়ি কি সে বিক্রি করবে?

ঢাকার রাস্তায় সোডিয়াম লাইটের আলোয় এক রিকশাওয়ালার নাঙা পিঠে কালশিটে দেখে হামেদের মনে পড়ে বোয়ালমারীর বটগাছের নিচের সেই রাতের কথা, বলদের পিঠের দাগ, এবং ফজর আলির গাড়ির ঘটনা। সে ফুঁপিয়ে ওঠে, গান গায়: “ও কি ও বন্ধু কাজল ভোমরা রে, কোন দিন আসিবেন বন্ধু, কয়া যাও, কয়া যাও রে।”

হামেদ গাড়িয়ালের গল্প শুধু একজন গাড়োয়ানের জীবনকথা নয়, বরং গ্রামীণ ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সংঘাত, প্রেম, এবং অর্থনৈতিক সংগ্রামের এক জীবন্ত দলিল। তার যাত্রা এখনও শেষ হয়নি, ভবিষ্যত অনিশ্চিত, কিন্তু আশা ও স্বপ্ন তার সঙ্গী।