দ্য ইউনিভার্সিটি অব চানখাঁরপুল: স্বাধীন ধারার সিনেমায় নতুন জাগরণ
ইউনিভার্সিটি অব চানখাঁরপুল: স্বাধীন সিনেমার জাগরণ

বিশ্বজুড়েই স্বাধীন ধারার সিনেমা যেন নতুন এক জাগরণ তৈরি করেছে। অস্কারজয়ী 'আনোরা' আর 'ফ্লো' যেমন দেখিয়েছে ছোট বাজেটের গল্পের শক্তি, তেমনি চলতি বছর 'ব্ল্যাকরুমস' ও 'অবসেশনস' প্রমাণ করেছে ইন্ডি চলচ্চিত্রও বক্স অফিসে বড় সাফল্য অর্জন করতে পারে। অনেক বিশ্লেষকই বলছেন, পরিচিত ফ্র্যাঞ্চাইজির চেয়ে নতুন ও মৌলিক গল্পের প্রতিই এখন বেশি আগ্রহী দর্শক। এই বৈশ্বিক ধারার প্রতিফলন বাংলাদেশেও দেখা যাচ্ছে। গত বছর মুক্তি পাওয়া 'দেলুপি' আর গত সপ্তাহে মুক্তি পাওয়া 'দ্য ইউনিভার্সিটি অব চানখাঁরপুল'-এর মতো অল্প বাজেটের সিনেমাগুলো যেন স্বাধীন ধারার তরুণ নির্মাতাদের ভিন্ন ধারার গল্প বলাকে সামনে নিয়ে আসছে।

একনজরে সিনেমা

সিনেমা: 'দ্য ইউনিভার্সিটি অব চানখাঁরপুল', ধরন: স্যাটায়ার, ড্রামা, চিত্রগ্রহণ, সম্পাদনা, চিত্রনাট্য, প্রযোজনা, পরিচালনা: আকাশ হক, অভিনয়: দেবদ্যুতি আইচ, রকি খান, ববি বিশ্বাস, আখতারুজ্জামান আজাদ, দৈর্ঘ্য: ২ ঘণ্টা ২২ মিনিট।

আকাশ হকের 'দ্য ইউনিভার্সিটি অব চানখাঁরপুল' মুক্তি পেয়েছে ১২ জুন। রনো আনোয়ারের ছোটগল্প 'ঝরাপাতার দুঃখবিলাস' থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নির্মিত সিনেমাটিতে উঠে এসেছে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হলসংস্কৃতি, ছাত্ররাজনীতি ও ক্ষমতার জটিল সম্পর্ক। মুক্তির আগেই সিনেমাটি ২৪তম ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশ প্যানোরামা বিভাগে সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফিল্ম সোসাইটির 'আমার ভাষার চলচ্চিত্র' উৎসবে হীরালাল সেন পদক অর্জন করে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গল্পের শুরু ও মূল উপজীব্য

গল্পের শুরুতেই দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে সদ্য ভর্তি হওয়া জুনিয়রদের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছেন কয়েকজন সিনিয়র ভাই। তারপর তাঁদের ক্যানটিনে খাওয়াতে নিয়ে যান। সেখানে বড় ভাইদের কথামতো জুনিয়ররা খেতে শুরু করে। তবে খাওয়াটা স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশিই হয়ে যায়। তারপর শুরু হয় গণরুমে তাদের ওপর বড় ভাইদের র‍্যাগ। এরপর একে একে বের হতে থাকে বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতির নানা দিক।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সিনেমার প্রেক্ষাপট চাঁনখারপুল নামের একটি কাল্পনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যাসাগর আবাসিক হল। কিন্তু এখানকার কর্মকাণ্ড এতটাই পরিচিত যে বাংলাদেশের যেকোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সহজেই নিজেকে কোনো না কোনো জায়গায় মেলাতে পারবেন। গেস্টরুম সংস্কৃতি, র‍্যাগিং, পদ-পদবির লড়াই, সিনিয়রদের প্রতি অন্ধ আনুগত্য এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের বিনিময়ে সুবিধা লাভের সংস্কৃতি—সবকিছুই এখানে ব্যঙ্গ আর নির্মম বাস্তবতার মিশেলে তুলে ধরা হয়েছে। আছে হালের বহুল চর্চিত 'গুপ্ত' চরিত্রও।

হাস্যরসের মাধ্যমে ক্ষমতার উপহাস

চলচ্চিত্রটির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো হাস্যরসের মাধ্যমে ক্ষমতাকে উপহাস। 'ভদ্রঘরের ছেলে রাজনীতি না করলে দেশের কী হবে', 'এমন কি কোনো খেলা আছে, যেটা একা খেলা যায়' থেকে 'এত উন্নয়ন তবু খালি নির্বাচন নির্বাচন'–এর মতো তীক্ষ্ণ সংলাপগুলো সিনেমা শেষ হওয়ার পরও মনে থাকে। ব্যঙ্গ আর হাস্যরসের আড়ালে নির্মাতা মনে করিয়ে দিয়েছেন, আজকের শোষিত ব্যক্তিটিই কাল হয়ে ওঠে শাসক।

একজন শিক্ষার্থী কীভাবে একটি ক্ষমতাকাঠামোর অংশ হয়ে ওঠে এবং শেষ পর্যন্ত সেই কাঠামোতেই বন্দী হয়ে পড়ে, সেটাই সিনেমার মূল উপজীব্য। বারবার উচ্চারিত 'ভাই' সম্বোধন যে এই ক্ষমতার সম্পর্কের প্রতীক, সেটাও দেখানো হয়েছে।

একক চরিত্রকেন্দ্রিক নয়

একক চরিত্রকেন্দ্রিক কোনো সিনেমা এটি নয়। এখানে আছেন হল সভাপতি, সেন্ট্রাল সভাপতি, হল কমিটির পদপ্রার্থী আর সাধারণ ছাত্র। সিনেমাটিতে কোনো চরিত্রের নাম দেননি নির্মাতা। ছাত্ররাজনীতির যে ধারা গত কয়েক দশকে দেখা গেছে, সেখানে নাম বদলেছে কিন্তু সাধারণ ছাত্ররা দাবার ঘুঁটির মতো ব্যবহৃত হয়েছে বারবার। নামে কী আসে যায়।

অভিনয়শিল্পীদের বেশির ভাগই অপেশাদার, কিন্তু পর্দায় সেটা খুব একটা বোঝা যায়নি। বিশেষ করে হর্সম্যানের চরিত্রে দেবদ্যুতি আইচ, আর বিশ্ববিদ্যালয় সভাপতির চরিত্রে রকি খান ভালো করেছেন। স্বল্প উপস্থিতিতে নজর কেড়েছেন আখতারুজ্জামান আজাদ। চয়ন মন্ডল, আবু সায়ীদ, এস এ জীবন, ইফাদ হাসানসহ পার্শ্ব চরিত্রে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের দেখেও মনে হয়েছে, যেন ক্যাম্পাস থেকে তুলে আনা কোনো বাস্তব চরিত্র।

হর্সম্যান ও ফ্যান্টাসি

হর্সম্যানের চরিত্রটি ধীরে ধীরে সিনেমায় যেভাবে প্রধান ভূমিকা নেয়, সেটাও চমকপ্রদ। সাধারণ ছাত্র বাইক কেনার স্বপ্নে বিভোর। কিন্তু এক রাতে হঠাৎই পেয়ে যায় ঘোড়া, এর পর থেকে সার্বক্ষণিক ঘোড়াই তার সঙ্গী। ব্যঙ্গ আর ড্রামা থেকে সিনেমাটি তখন ফ্যান্টাসির দিকে চলে যায়।

গল্পের সঙ্গে মানানসই আবহসংগীত ও গান সিনেমার ইতিবাচক দিক। 'রাজনীতির ময়দান ও সহমত ভাই' ও 'সহমত ভাই ২'-এর মতো র‍্যাপ গানগুলোর উপস্থাপন ও চিত্রায়ণে রয়েছে নতুনত্ব। যা অনেক বড় বাজেটের সিনেমার গানের কোরিওগ্রাফিকেও চ্যালেঞ্জ করে। গানের কথাগুলোও ছিল সিনেমার মেজাজের সঙ্গে মানানসই। যদিও কিছু দৃশ্যে আরও ভালোভাবে আবহসংগীতের ব্যবহার করা যেত।

দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা

শুরুর দিকে গল্পে গতি থাকলেও মাঝামাঝি এসে কিছুটা একঘেয়ে হয়ে যায়। মনে হচ্ছিল, কয়েকটি দৃশ্যের মধ্যেই সিনেমাটি যেন ঘুরপাক খাচ্ছে। বিশেষ করে যখন ফ্যান্টাসি উপাদান ঢুকে পড়ে। সম্পাদনা আরও ধারালো হওয়া প্রয়োজন ছিল; কয়েকটি দৃশ্য শেষ হওয়ার আগেই পরের দৃশ্যে ঢুকে পড়ে।

এই সিনেমা রচনা, প্রযোজনা, চিত্রগ্রহণ, সম্পাদনা ও পরিচালনা একা হাতে সামলাচ্ছেন আকাশ হক। কিছু দুর্বলতা সত্ত্বেও 'দ্য ইউনিভার্সিটি অব চানখাঁরপুল' তাঁর সাহসী প্রচেষ্টা। গল্প নির্মাতার 'জীবন থেকে নেওয়া', আমার, আপনারও নয় কি?