ঢাকার মোহাম্মদপুরে জাকির হোসেন রোডের মির্জাবাড়ির পেছনে একটি কুয়া আছে, যার নাম ‘অতল কুয়া’। মহল্লায় গুজব, এই কুয়ার কোনো তলা নেই। কেউ যদি পাথর ফেলে কান পেতে থাকে, সারা দিনেও পতনের শব্দ পাওয়া যায় না। না পানির ছলাৎ, না তলদেশে আছড়ে পড়ার আওয়াজ। কুয়ার মুখে সব সময় এক গাঢ় নিস্তব্ধতা, যেন শব্দহীনতাও স্পর্শ করা যায়—ভেজা, শেওলা ধরা।
মির্জাবাড়ির কুয়া: কুসংস্কার ও বাস্তবতা
মহল্লাবাসী কুয়া নিয়ে কুসংস্কার পুরোপুরি বিশ্বাস না করলেও সমীহ করে। কেউ কুয়ার চারপাশে খুব একটা ঘেঁষে না। কারণ, মির্জাদের বাড়িটি প্রায় পরিত্যক্ত। মূল দোতলা বাড়ির পেছনে ছোট বাগান—আম, লিচু, জামরুলগাছ অযত্নে জঙ্গল হয়ে গেছে। বাগানের কোণায় উঁচু জামগাছের ছায়ায় শানবাঁধানো কুয়াতলা, কোমরসমান উঁচু সিমেন্টের রেলিং। কুয়াতলায় শুকনো জামপাতা পড়ে থাকে। কোনো বিড়াল বা পাখি সেখানে যায় না।
পরিত্যক্ত বাড়ির দেখাশোনা করে শ্যামল নামের এক মাঝবয়সী অলস লোক। সে একসময় ডাকপিয়ন ছিল, চাকরি গেছে আলস্যের কারণে। সে নিচতলার একটি ঘরে থাকে, হোটেল-রেস্তোরাঁয় খায়। শ্যামল দাবি করে, মাঝে মাঝে কুয়ার ভেতর থেকে অস্পষ্ট আওয়াজ আসে—যেন দুটি মানুষ তর্ক করছে, বা কেউ কাউকে ডাকছে অচেনা ভাষায়। কোনো কোনো অমাবস্যার রাতে যান্ত্রিক শব্দও শোনা যায়, যেন ট্রেন চলছে।
পুতুল কুড়াতে নামা
মির্জাবাড়ির তৃতীয় ভাই আদিল এহসান মির্জা বছরে একবার বেড়াতে আসেন। এবার এলেন তিন বছর পর, সঙ্গে পাকিস্তানি স্ত্রী শেহনাজ তাবাসসুম ও তিন বছর বয়সী কন্যাশিশু তাবাসসুম। বাড়ি বিক্রির ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে এসেছেন। শিশুকন্যা খেলতে খেলতে তার কাপড়ের পুতুল কুয়ায় ফেলে দেয়। স্ত্রীর অনুরোধে এহসান শ্যামলকে কুয়ায় নামার নির্দেশ দেন।
শ্যামল কিছুতেই নামতে চায় না। সে লোক জোগাড় করতে চায়, কিন্তু কাউকে পায় না। ফলে তাকে নামতে বাধ্য হতে হয়। বুড়ো চৌকিদার ইমানকে সঙ্গে নিয়ে কুয়ার পাড়ে আসে। আসরের আজান পড়ছে। বিকেলের তেরছা রোদে কুয়ার মুখ বোয়াল মাছের হাঁ করা মুখের মতো। উঁচু পাড় কালচে-সবুজ শেওলায় ঢাকা, কমলা আগুনের মতো।
শ্যামল কুয়ার গহ্বরে ‘হোই’ বলে চিৎকার দেয়। কোনো প্রতিধ্বনি ফিরে আসে না। ইমান এক টুকরা পাটকেল ফেলে, ‘ঝুপ’ শব্দও আসে না। শ্যামল পুরোনো অ্যালুমিনিয়ামের টর্চ জ্বালায়, আলো নিচে নেমে যায় কিন্তু কোথাও বাধা পায় না। সে লুঙ্গি মালকোঁচা বাঁধে, ফতুয়া খুলে ফেলে। দেড় শ ফুট দড়ি জোড়া দিয়ে জামগাছের কাণ্ডে বাঁধে, অপর প্রান্ত কোমরে। মুখে টর্চ কামড়ে অন্ধকারে গলিয়ে দেয় শরীর।
নামতে নামতে কুয়ার দেয়াল বদলায়। প্রথমে শেওলা ও ফার্নের ঝোপ, তারপর ধূসর, শেষে বাঁধানো দেয়াল শেষ হয়ে মাটির দেয়াল। মেটেল গন্ধ। টর্চ হাতে নিতে গিয়ে ফস্কে নিচে পড়ে যায়। শেষ মুহূর্তে অন্ধকার থেকে লাফিয়ে ওঠে ধবধবে সাদা কিছু—একটি তিন ব্যাটারির অ্যালুমিনিয়াম টর্চ।
অরিগনের কুয়া: আরেক রহস্য
অন্যদিকে, আমেরিকার অরিগনের ছোট্ট শহর জোসেফের বাইরে ম্যাকঅ্যালিস্টারদের পুরোনো খামারবাড়িতে একটি প্রাচীন কুয়া আছে। ছোট ছেলে এলির জ্যাক রাসেল টেরিয়ার পিপ কুয়ায় পড়ে গেছে। ফায়ারকর্মী ইথান কোল উদ্ধারকাজে নামে। অ্যালুমিনিয়ামের এক্সটেনশন ল্যাডার নামিয়ে, হেলমেটের এলইডি লাইট জ্বালিয়ে সে নামতে শুরু করে। পঞ্চাশ ফুট নিচে তাকিয়ে দেখে ওপরের মুখগুলো ছোট হয়ে গেছে।
ল্যাডার শেষ হলে রশিতে ঝুলে নামে ইথান। নিচ থেকে ধাতব আওয়াজ আসে—ঠং ঠং ঠং। আওয়াজ বাড়তে থাকে, যেন কোনো ধাতব জন্তু উঠে আসছে। শেষ মুহূর্তে অন্ধকার থেকে লাফিয়ে ওঠে ছোট বিড়াল আকৃতির ধবধবে সাদা কিছু। ইথান স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাঁ হাতে সেটা ধরে ফেলে। বিস্মিত হয়ে দেখে—একটি পুরোনো আমলের তিন ব্যাটারির অ্যালুমিনিয়াম টর্চ।
দুই কুয়ার সংযোগ?
শ্যামলের হাত থেকে পড়ে যাওয়া টর্চটি কি কোনোভাবে অরিগনের কুয়ায় পৌঁছাল? নাকি এটা কাকতালীয়? গল্পের শেষে রহস্য আরও গভীর হয়। ইথানের হাতে ধরা টর্চটি কি শ্যামলেরই? উত্তর অজানা।



