অলংকরণ: এআই আর্ট
মহাকাশের অদ্ভুত অভিজ্ঞতা
স্যাটেলাইট কন্ট্রোল থেকে যখন ডাক পড়ল, আমি তখন বাংলাদেশ স্পেস রিসার্চ স্টেশনের পর্যবেক্ষণ কাচঘরে। ‘স্টেশন সুপারভাইজার বলছি।’ সাড়া দিলাম ডাকের উত্তরে, ‘কী সমস্যা, বলুন।’ নিচে ২০ হাজার মাইল দূরের আকাশগঙ্গার পটভূমিতে স্পষ্ট দেখছি সবুজ-নীলে মেশানো পৃথিবী।
‘ছোট একটি লক্ষ্যবস্তু ধরা পড়েছে আমাদের রাডারে।’ জবাব এল, ‘স্টেশনের কক্ষপথের প্রায় একই উচ্চতায়। প্রায় স্থির বস্তুটি সিরিয়াসের ৫ ডিগ্রি পশ্চিমে। জিনিসটি কী, ভিজ্যুয়ালি পরীক্ষা করতে পারবেন?’
কক্ষপথের এত নিখুঁত সাদৃশ্য সাধারণ কোনো উল্কাপিণ্ডের হয় না, নিশ্চয়ই এটি আমাদেরই কিছু—কোনো যন্ত্রাংশ হয়তো ঠিকমতো আটকানো হয়নি, যার ফলে ভেসে গেছে মহাশূন্যে। কিন্তু দুরবিন দিয়ে ওরায়নের দিকে তাকাতেই বুঝতে পারলাম ভুলটা। জিনিসটি মনুষ্যনির্মিত, কিন্তু আমাদের নয়।
‘হ্যাঁ, দেখলাম ওটা।’ জানালাম কন্ট্রোলকে, ‘কোনো এক দেশের পুরোনো টেস্ট স্যাটেলাইট। চোঙা আকৃতির, চারটি অ্যানটেনা, নিচের অংশে লেন্স। মার্কিন সামরিক স্যাটেলাইট খুব সম্ভবত—ষাটের দশকের শুরুর দিকের। এ ধরনের কয়েকটা কৃত্রিম উপগ্রহ নাকি কক্ষপথে হারিয়েছিল ওরা—ওদের প্রাথমিক ডিজাইনের কয়েকটা।’
ফাইলপত্র ঘেঁটে আমার অনুমানের সত্যতা নিশ্চিত করল কন্ট্রোল। আরেকটু খোঁজ নিয়ে জানা গেল, কেউই ফেরত পেতে আগ্রহী নয় স্যাটেলাইটটা। এমনকি হারিয়ে গেলেও আপত্তি নেই তাদের। ‘কিন্তু আমাদের তো হারানো চলবে না।’ মন্তব্য করল কন্ট্রোল, ‘যদিও কেউ ওটার মালিকানা চাইছে না, তারপরও নেভিগেশনের জন্য বিপজ্জনক এটি। কাউকে ওটার একটা ব্যবস্থা করতেই হবে।’
কাজের দায়িত্ব
অর্থাৎ প্রকারান্তরে আমার ঘাড়েই গছিয়ে দেওয়া হচ্ছে কাজটা। নির্মাণ দলের কাউকে এ কাজের দায়িত্ব দেওয়ার সুযোগ নেই এ মুহূর্তে—সময়সূচি থেকে এরই মধ্যে বহু পিছিয়ে আছি আমরা, একেকটি দিন মানে কোটি কোটি টাকার লোকসান। পৃথিবীর সব রেডিও আর টেলিভিশন নেটওয়ার্ক আমাদের মাধ্যমে গ্লোবাল সম্প্রচারের অপেক্ষায়—উত্তর থেকে দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত বিস্তৃত প্রথম পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক সেবাদানের জন্য।
‘ঠিক আছে, যাচ্ছি আমি’, বললাম কন্ট্রোলকে। বড্ড উপকার করছি, এ রকম ভান করলেও খানিকটা খুশিই আমি ভেতরে-ভেতরে। প্রায় দুই সপ্তাহ বাইরে বেরোইনি, গোডাউন তালিকা আর মেইনটেন্যান্স রিপোর্ট দেখে দেখে ক্লান্ত।
স্টেশনের নতুন সদস্য
এয়ারলকের দিকে যেতে যেতে মোলাকাত হলো স্টেশনের নতুন সদস্য কাফকার সঙ্গে। মহাকাশে পোষা প্রাণী থাকা মানে বিশাল কিছু, তবে সব প্রাণীই যে ওজনহীনতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে, তা কিন্তু নয়। কাতরভাবে ডাকল প্রাণীটা, তাড়া থাকায় নজর দিতে পারলাম না ওর দিকে।
একটা বিষয়ে বলা দরকার এখানে—আমাদের স্পেসস্যুটগুলো কিন্তু চাঁদে হাঁটার জন্য ব্যবহৃত নমনীয় স্যুটের মতো নয়। ছোট ছোট স্পেসশিপের মতো এগুলো, একজনই বসতে পারে একটিতে। সাত ফুট লম্বা একেকটি স্যুটে মোটা সিলিন্ডার আর হালকা থ্রাস্টার আছে, হাত বের করার জন্য রয়েছে অ্যাকর্ডিয়ন ধাঁচের এক জোড়া হাতা; কিন্তু সাধারণত ভেতরেই রাখা হয় হাত, বুকে থাকা কন্ট্রোল দিয়ে চালানো হয় সবকিছু।
স্যুটের মধ্যে ঢুকেই পরীক্ষা করলাম গেজগুলো। ফুয়েল, অক্সিজেন, রেডিও, ব্যাটারি—সবই ঠিকঠাক। মাথার ওপর স্বচ্ছ ডোমটা নামিয়ে দিয়ে সিল করে নিলাম নিজেকে। এয়ারলকে ঢোকার পর শূন্যের দিকে নেমে যেতে লাগল বায়ুচাপ। বাইরের দরজাটা খুলে যেতেই বাতাসের শেষ কণা ধীরে ধীরে মহাশূন্যে ঠেলে পাঠিয়ে দিল আমাকে।
এখন আমি নিজেই একটা উপগ্রহ। সীমাহীন আকাশ দেখছি। স্যুটের মধ্যে নড়াচড়া করা প্রায় অসম্ভব। মহাশূন্যে সবচেয়ে ভয়ংকর শত্রু হচ্ছে সূর্য। সে জন্য চালু হয়ে গেল স্বয়ংক্রিয় নাইট ফিল্টার, চোখ দুটি যাতে ঝলসে না যায়। স্টেশন তখন মাত্র ১২ ফুট দূরে।
অদ্ভুত শব্দ
চোখে পড়ল লক্ষ্যবস্তুটা—ঝিকমিক করছে রুপালি একটা বিন্দু। পায়ের প্যাডেলে চাপ দিতেই চালু হলো থ্রাস্টার। অলংকরণ: এআই আর্ট
এগিয়ে চললাম ধীরে ধীরে। ১০ সেকেন্ড পর গতি ঠিক মনে হতেই থ্রাস্ট বন্ধ করে আপনাআপনি ভেসে যেতে দিলাম নিজেকে—৫ মিনিট লাগবে পৌঁছাতে। আর ঠিক তখনই টের পেলাম অস্বাভাবিকতাটা!
স্পেসস্যুটের ভেতরটা কখনো নীরব থাকে না পুরোপুরি—অক্সিজেনের ফোঁস ফোঁস আর ফ্যানের ঘর্ঘর আওয়াজের সঙ্গে শোনা যায় নভোচারীর শ্বাসপ্রশ্বাস আর হৃৎস্পন্দন; কিন্তু আজ এক নতুন শব্দ। অসামঞ্জস্যপূর্ণ চাপা ধুপধাপ। মাঝেমধ্যে ধাতুর সঙ্গে ধাতুর ঘষাঘষি। থমকে গেলাম আমি। কন্ট্রোল প্যানেলে তো কোনো সমস্যা দেখছি না! ক্রমেই বাড়ছে আওয়াজটা!
বিশাল মহাশূন্যে একা আমি—কিছুই নেই আমার আশপাশে, তারপরও মনে হচ্ছে, কিছু একটা…কিছু একটা যেন…স্যুটের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছে! ঘাড়ের লোম দাঁড়িয়ে গেল সড়সড় করে!
মনে পড়ল রওশন ভাইয়ের কথা। বছর তিনেক আগে স্টেশন থেকে খানিক দূরেই মৃত্যু হয় তাঁর। অসম্ভব ধরনের দুর্ঘটনা ছিল সেটি—অক্সিজেন রেগুলেটর নষ্ট, সেফটি ভালভ কাজ করেনি, ফেটে গিয়েছিল স্যুটটা। মুহূর্তেই মরণকামড়। স্যুটটা অবশ্য বাতিল করা হয়নি, রিপেয়ার করে রেখে দেওয়া হয়েছে নতুন করে ব্যবহারের জন্য। আচ্ছা…আমি যে স্যুটটা পরে আছি এখন, সেটা আবার রওশন ভাইয়েরটা নয় তো!
হাত কাঁপতে লাগল আতঙ্কে। কমিউনিকেশন চালু করে চিৎকার করলাম—‘স্টেশন! আমার স্যুটের হিস্ট্রি চেক করো তো—জলদি! আমার…!’ শেষ করতে পারিনি বাক্যটা। কারণ, ঠিক তক্ষুনি আমার ঘাড়ের পেছনে আলতো করে আঁচড় দিল কিসে যেন! ব্যস, জ্ঞান হারালাম নিশ্চিন্তে!
আসল ঘটনা
পরে জেনেছি, আমার চিৎকারে মাইক্রোফোনই নষ্ট হয়ে যায়। জ্ঞান ফিরল এক ঘণ্টা পর। মেডিকেল টিমের সবাই তখন তাকিয়ে আছে আমার দিকে। চোখে পড়ল—ছোট্ট, গোলগাল দুটি বিড়ালের বাচ্চা আনন্দে লাফঝাঁপ করছে। বুঝে গেলাম, কী হয়েছিল আসলে। কাফকার বাচ্চা এগুলো। নিরাপদ আশ্রয় ভেবে স্পেসস্যুটের স্টোরেজ লকারে বাচ্চাগুলোকে বড় করছিল মা বিড়াল।
বিদেশি কাহিনি অবলম্বনে*
লেখাটি ২০২৬ সালে বিজ্ঞানচিন্তায় জানুয়ারি সংখ্যায় প্রকাশিত



