রাজধানীর হাজারীবাগের ‘দাগি আর্ট গ্যারেজ’-এ তরুণ শিল্পী অনিন্দিতা অনির প্রথম একক প্রদর্শনী ‘প্রস্তরে নারী’ শেষ হচ্ছে আজ। বিকেল ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সবার জন্য খোলা থাকবে এই প্রদর্শনী। বর্ষার এক বিকেলে গ্যালারিতে ঢুকলেই বোঝা যায়, এটি বাণিজ্যিক স্থাপত্যের ঝকঝকে পরিসর নয়; বরং শিল্পের সঙ্গে সংলাপের জন্য উপযুক্ত এক অন্তরঙ্গ পরিবেশ।
পাথরে নারীর জীবনচক্র
প্রদর্শনীকক্ষে মেঝেজুড়ে ছোট ছোট টেবিলে পাটের চট বিছানো, তার ওপর সাজানো বিভিন্ন আকারের পাথর। কোনোটি হাতের তালুতে রাখা যায়, কোনোটি আবার বড় আকৃতির। সাধারণত গ্যালারিতে শিল্পকর্ম দেয়ালে ঝুলিয়ে প্রদর্শন করা হয়; কিন্তু এই কাজগুলো দেখতে হয় মাথা নিচু করে, খুব কাছে গিয়ে। একেকটি পাথরকে কখনো ভাস্কর্য মনে হয়, কিন্তু কাছে গিয়ে তার গায়ে লেপন করা রঙের দৃশ্যপাঠে তৈরি হয় ছোট ছোট গল্প। আর এই ৩০টি শিল্পকর্মের দৃশ্যগল্প ধারাবাহিকভাবে পাঠ করলে নারীজীবনকে ঘিরে নির্মিত এক দৃশ্য-উপন্যাসের অনুভূতি জাগে।
জন্ম থেকে বার্ধক্য: নারীর বহুমাত্রিক অধ্যায়
জন্ম, শৈশব, কৈশোর, স্বপ্ন, প্রেম, সংসার, মাতৃত্ব, বিচ্ছেদ ও বার্ধক্য—নারীর জীবনের বহুমাত্রিক অধ্যায়গুলো এখানে একটির পর একটি পাথরের গায়ে উন্মোচিত হয়েছে। শিল্পী কোনো নির্দিষ্ট নারীর আত্মকথা বলেননি; বরং এমন এক নারীর কথা বলেছেন, যার ভেতরে বহু নারীর অভিজ্ঞতা মিলেমিশে আছে। অ্যাক্রিলিক রঙে নির্মিত এই চিত্রভাষা কখনো বাস্তব, কখনো প্রতীকী। ‘কল্পলোকের দুয়ার’ শিল্পকর্মে কিশোরী মনের স্বপ্ন ও রূপকথার আকাঙ্ক্ষা ধরা পড়েছে। ‘নীরব দহন’-এ প্রেমের উন্মেষের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অন্তর্গত অস্থিরতা, ‘নিভৃত স্বপ্ন’-এ কৈশোরের গোপন ইচ্ছা ও আত্মপরিচয়ের সন্ধান।
মাতৃত্ব: প্রদর্শনীর কেন্দ্রীয় শক্তি
প্রদর্শনীর কেন্দ্রীয় শক্তি নিঃসন্দেহে মাতৃত্ব। শিল্পী বারবার ফিরে গেছেন এই অধ্যায়ে। ‘অভ্যন্তরীণ সৃষ্টি’, ‘সৃজন মুহূর্ত’, ‘সহযাত্রা’ কিংবা ‘তার নীরবতার অন্তর্লয়’ শীর্ষক শিল্পকর্মে মাতৃত্বকে শুধু জৈবিক অভিজ্ঞতা নয়, এক গভীর অস্তিত্বগত রূপান্তর হিসেবে দেখা হয়েছে। সন্তান ধারণ, জন্ম দেওয়া, দুধপান করানো, সন্তানকে লালন-পালন ও শিক্ষা দেওয়ার মুহূর্তগুলোকে তিনি কেবল সামাজিক ভূমিকা হিসেবে দেখেননি; বরং সৃষ্টির এক মহাজাগতিক ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখেছেন। যেন মা শুধু সন্তানকে জন্ম দেন না, সন্তানও মাকে নতুনভাবে জন্ম দেয়। ‘নির্ভরতার মুহূর্ত’ আলিঙ্গন দৃশ্যে সেই অনুভূতি ব্যক্ত হয়েছে।
নীরব ক্ষত ও প্রতীকী ভাষা
তবে অনিন্দিতার শিল্পভাষা কোনো রোমান্টিক উদযাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি নারীজীবনের নীরব ক্ষতগুলোকেও এড়িয়ে যাননি। কিছু কাজে উঠে এসেছে সহিংসতা, ধর্ষণের স্মৃতি, সামাজিক অবদমন, বিধবা জীবনের নিঃসঙ্গতা কিংবা পুরুষনির্ভর সমাজে নারীর অনিশ্চিত অবস্থান। এসব শিল্পকর্মে শিল্পী সরাসরি বক্তব্য দেননি; বরং প্রতীক, রং ও গঠনের মাধ্যমে অনুভূতির নানা স্তর নির্মাণ করেছেন।
পাথর: সময় ও স্মৃতির প্রতীক
এই প্রদর্শনীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় উপাদান পাথর। বাংলাদেশের পঞ্চগড় অঞ্চলের নদী থেকে সংগ্রহ করা প্রাকৃতিক পাথরগুলোকে শিল্পী কেবল আঁকার পৃষ্ঠ হিসেবে ব্যবহার করেননি। প্রতিটি পাথরের স্বাভাবিক রেখা, খাঁজ, ফাটল ও বর্ণকে তিনি শিল্পকর্মের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করেছেন। ফলে চিত্র ও মাধ্যমের মধ্যে একটি জৈব সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। কোথাও পাথরের বাঁক নারীর মুখাবয়বের অংশ হয়ে উঠেছে, কোথাও তার ফাটল স্মৃতি বা ক্ষতের রূপক হয়ে দেখা দিয়েছে। তাই এই সৃজনশীলতাকে শুধু চিত্রকলা না বলে চিত্রকলা ও ভাস্কর্যের এক মেলবন্ধন বলাই অধিক যুক্তিযুক্ত।
শিল্পীর ভাষায়, পাথর এখানে সময়, স্মৃতি ও স্থায়িত্বের প্রতীক। যেমন নদীর স্রোত বছরের পর বছর ধরে একটি পাথরকে নতুন আকার দেয়, তেমনি জীবন, সম্পর্ক, ভালোবাসা ও সংগ্রাম একজন নারীর সত্তাকে ক্রমাগত নির্মাণ করে। এই ভাবনা শিল্পকে একটি বৃহত্তর নৃতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক পরিসরের সঙ্গে যুক্ত করে।
প্রযুক্তিগত দিক ও প্রদর্শন-পরিসর
প্রযুক্তিগত দিক থেকেও প্রদর্শনীটি উল্লেখযোগ্য। পাথরের মতো অসমতল ও রুক্ষ পৃষ্ঠে অ্যাক্রিলিক রঙের প্রয়োগ সহজ নয়। শিল্পী দীর্ঘ পরীক্ষা–নিরীক্ষার মাধ্যমে নিজস্ব পদ্ধতি তৈরি করেছেন। ফলে দ্বিমাত্রিক চিত্র এবং ত্রিমাত্রিক বস্তুর সংযোগে যে নতুন দৃশ্যমান অভিজ্ঞতা সৃষ্টি হয়েছে, তা দর্শককে একই সঙ্গে স্পর্শ, স্মৃতি ও কল্পনার জগতে নিয়ে যায়।
প্রদর্শনী দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, শিল্পী যেন একেকটি পাথরের মাধ্যমে একেকটি অধ্যায় পাঠ করছেন। বাইরে তখনো ঝুম বৃষ্টি। শিল্পী নিজে উপস্থিত থেকে দর্শকদের কাজের গল্প শোনাচ্ছিলেন। সেই মুহূর্তে গ্যালারির পরিবেশটা যেন কোনো রূপকথার আসর, যেখানে গল্পকারের ভাষা শব্দ নয়, রং ও রেখা।
তবে ‘প্রস্তরে নারী’-এর গুরুত্ব শুধু শিল্পকর্মে নয়; এর প্রদর্শন-পরিসরেও। রাজধানীর হাজারীবাগ, বছিলা কিংবা শহরের নানা প্রান্তে গড়ে ওঠা শিল্পীদের এই বিকল্প স্টুডিওভিত্তিক গ্যালারিগুলো আমাদের শিল্পচর্চাকে নতুন মাত্রা দিচ্ছে। প্রাতিষ্ঠানিক গ্যালারির সীমা পেরিয়ে শিল্পকে মানুষের কাছাকাছি নিয়ে আসছে। শিল্পকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে নতুন সামাজিক ও নান্দনিক সম্প্রদায়।
অনিন্দিতা অনির এই প্রথম একক প্রদর্শনী তাই কেবল নারীর গল্প নয়; এটি স্মৃতি, সময়, শরীর, সম্পর্ক ও অস্তিত্বের এক দীর্ঘ যাত্রার দৃশ্যরূপ। পাথরের নীরবতার ভেতর তিনি শুনিয়েছেন নারীর বহু উচ্চারিত ও অনুচ্চারিত কাহিনি। আর সেই কাহিনি পড়তে পড়তে দর্শকের মনে হয়—এ যেন রংতুলিতে লেখা এক উপন্যাস, যার প্রতিটি অধ্যায় একটি পাথর, আর প্রতিটি পাথরের ভেতর লুকিয়ে আছে এক একটি জীবন।



