ব্রিজের রেলিংটি পাখিদের খুব প্রিয়। প্রায়শই পাখিদের এখানে বসতে দেখা যায়, তবে তাড়া থাকায় কয়েক মুহূর্ত বসেই তারা উড়ে যায়। পাখি না হয়েও ব্রিজের রেলিংয়ে গিয়ে বসে বর্ণনাকারী। তার কোনো তাড়া নেই, সে বসে থাকে। রাত গভীর হয়েছে। রেলিংপ্রেমিক পাখিরা কেউ নেই আশেপাশে। চারদিক সুনসান। একটু দূরে নদীর ওপারে চাঁদের আলোয় থমথমে বটগাছ। বর্ণনাকারীর চুলে নদীর বাতাস লাগে।
রহস্যময় আগন্তুক
ব্রিজের একপ্রান্তে আলো-আঁধারিতে একজন মানুষকে দেখা যায়। সে এদিকেই এগিয়ে আসে। এ সময় এখানে একাকী মানুষটিকে কেমন অস্বাভাবিক ঠেকে। সে এগিয়ে এসে বর্ণনাকারীর সামনে দাঁড়ায় এবং দেশলাই চায়। বর্ণনাকারীর কাছে দেশলাই নেই। মানুষটা ঝুঁকে খুব কাছে এসে নিচু স্বরে বলে, ‘আই ফল আপ অন দ্য থর্নস অব লাইফ, আই ব্লিড!—বলুন এটি কার লেখা?’
কিছুক্ষণ উত্তরের অপেক্ষা করে মানুষটি শিস দিতে দিতে আবার হাঁটতে শুরু করে। বহুদিন শিসে মগ্ন মানুষ দেখা যায়নি। কিছুদূর গিয়েই লোকটি আবার ফিরে আসে এবং বলে, ‘শুনুন, প্রাগৈতিহাসিক মালভূমির ওপাশ থেকে একটি বালক সেদিন “নেকড়ে, নেকড়ে” বলে চিৎকার করে দৌড়ে আসছিল এবং তার পেছনে ছিল একটি অতিকায় বাদামি নেকড়ে, সাহিত্য সেদিন সৃষ্টি হয়নি, সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছিল সেই দিন, যেদিন বালকটি “নেকড়ে, নেকড়ে” বলে চিৎকার করছিল এবং তার পেছনে কোনো নেকড়ে ছিল না।’ বর্ণনাকারী মৃদু হাসে। মানুষটি তার হাতের সিগারেটটি শূন্যে ছুড়ে আবার মুঠোয় ধরে নিয়ে হেঁটে যায় অন্যদিকে।
নদীর বাতাস ও ভাবনা
একটি ভারী ট্রাক সশব্দে ব্রিজ পেরিয়ে যায়। ব্রিজের রেলিং থিরথির করে কাঁপে। তারপর নিস্তব্ধতা আবার। অনেক দূরের গ্রামে কেউবা মাইকে গান বাজায়। অস্পষ্ট ভেসে আসে গানের কলি—‘মন-জালুয়া জাল ফালাইল এই ভবসংসারে, জালে মাছ ওঠে না’। গায়ে এসে লাগে নদীর হুঁ হুঁ বাতাস। ‘রানী পুবে দাঁড়াইলেন, বাতাস দ্বিগুণ, রানী পশ্চিমে দাঁড়াইলেন বাতাস আগুন।’ নেশাজাগানিয়া ঠাকুরমার ঝুলির ভাষা মনে আসে। যদিও বাতাস এখানে আগুন নয়, বরং নদীর পানি ছুঁয়ে আসা শীতল বাতাস। আগুন, পানি আর বাতাস—কে বেশি শক্তিমান? উদ্ধত আগুন বলে, আমিই শক্তিমান, কারণ আমি পুড়িয়ে দিই সবকিছু। শুনে পানি বলে, শক্তিমান আমিই, আমি আগুনকে নিভিয়ে ফেলি। তখন বাতাস বলে, আমি পানিকে উড়িয়ে নিয়ে যাই মেঘের ভেলায়, অতএব শক্তিমান আমিই।
শিশুকন্যার খেলা
বর্ণনাকারীর শিশুকন্যা প্রায়ই এক অভিনব খেলায় মেতে ওঠে তার সঙ্গে। ছুটে এসে বলে, ‘আমাকে ধরো তো দেখি বাবা।’ বর্ণনাকারী তাকে ধরে। সে হাসিতে লুটিয়ে পড়ে বলে, ‘এ কী, তুমি তো আমার হাত ধরেছ, আমাকে ধরেছ কই?’ বর্ণনাকারী এবার তার মাথায় হাত রাখে। সে বিপুল কৌতুকে বলে ওঠে, ‘এ তো আমার মাথা, আমি বলেছি আমাকে ধরতে।’ বর্ণনাকারী এই অদ্ভুত বোধিতাত্ত্বিক ক্রীড়ায় পরাজিত হয়। সে তার কন্যাকে ধরতে পারে না। ভুল করে ধরে বসে তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। ‘তোকে কোনো দিন কি ধরতে পারব কন্যা আমার?’ একটা মদির ব্যর্থতা জেগে থাকে মনের মধ্যে।
রফিকের ডায়েরি
বর্ণনাকারীর কন্যা এঘর–ওঘর করতে করতে সুর করে পড়ে—‘চড়ই পাখি বারোটাডিম পেড়েছে তেরোটাএকটা ডিম নষ্টচড়ই পাখির কষ্ট।’ এই ছড়ার অন্তর্গত পরাবাস্তব বেদনাটিকে লক্ষ্য করে বন্ধু রফিক খুবই উৎফুল্ল হয়েছিল। জীবনের জন্য এত অসহ্য ব্যথা ছিল ওর, এত অসহ্য আনন্দ। ও কবর দেখেও কাঁদত, বাসর দেখেও। অনেক অনুরোধ করে রফিকের মায়ের কাছ থেকে ওর ডায়েরিটা চেয়ে এনেছেন বর্ণনাকারী। অদ্ভুত দিনলিপি। একেকটি দিনে একটি মাত্র সংবাদ, একটি মাত্র ভাবনা। একটি দিন যেন একটি অ্যাপেলের মতো সম্পূর্ণ নিটোল।
রবিবার: কী আশ্চর্য বৃষ্টি সারা দিন। কাগজের ফুলই শুধু বৃষ্টিকে ভয় পায়। সোমবার: বহুদিন জোনাকি দেখি না। জোনাকি দেখা প্রয়োজন। মঙ্গলবার: বাইরে বেরিয়ে আসার আগে সবকিছু শুরু হয় ভেতরে, নিচে, দৃষ্টির আড়ালে, যেমন বীজ আর বৃক্ষ। বুধবার: জ্ঞানীরা এমন হয়, ছেলেমানুষ, উন্মাদ, পৈশাচিকও বটে। বৃহস্পতিবার: ভোরে যখন সূর্য ওঠে কোনো কোনো দিন বিশ্বাস হতে চায় না যে কোথাও কখনো রাত ছিল। যেন আজ। শুক্রবার: একটা নিভৃতি প্রয়োজন, যেখানে বসে অসম্ভব সব ভাবনাগুলো ভাবা যায়। শনিবার: পৃথিবীর সমস্ত মোহই চারদিকে কেমন যেন মাছি পড়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
রফিকের শেষ চিঠি
রফিকের শেষ চিঠিটিও বর্ণনাকারী সংরক্ষণ করেছেন। সে লিখেছিল—ব্রিজের রেলিংয়ে বসে ফুরফুরে হাওয়ায় ওপারে বটগাছ দেখি, আকাশের তারা দেখি, জ্যোৎস্নাপ্লাবিত নদী দেখি। মনে হয় এসবই যেন একেকটি প্রতীক, যেন এদের সবারই অন্য কোনো অর্থ আছে। ব্রিজের অপর প্রান্ত থেকে সেই মানুষটিকে আবার হেঁটে আসতে দেখি। এবার তার ঠোঁটে জ্বলন্ত সিগারেট। কারও কাছে দেশলাই পেয়েছেন বুঝিবা। মানুষটি বর্ণনাকারীর কাছে এসে দাঁড়ায়। তার মুখে রহস্যময় হাসি। ‘...হ্যাঁ, মিথ্যা প্রচুর বলি, অফুরন্ত বানিয়ে বলতে পারি। আমার চরিত্রের এই এক কলঙ্ক। কবে ঘুচবে কে জানে? তবু বলতে পারি, অনেক ক্ষেত্রে মিথ্যা বলি না। প্রিয়জনের ভালোবাসার চরাচরে মিথ্যার কী প্রয়োজন?...ঠাট্টা করতে করতে চিঠির পরের অংশে যে কথাগুলো ও লিখেছিল, ভাবতে পারিনি তার পরিণতি এমন ভয়াবহ।
‘...সাহিত্য আমার কাছে ধন উপার্জন কিংবা খ্যাতির পরিপূরক কোনো মাধ্যম ছিল না। ছিল বেঁচে থাকার মতো প্রয়োজনীয় খাদ্যমাত্র। ভেবেছিলাম বেঁচে থাকার মতো প্রয়োজনীয় খাদ্যমাত্র। ভেবেছিলাম বেঁচে থাকার একটাই তাৎপর্য: লিখব। লেখালেখি ছাড়া পৃথিবীর বাকি যাবতীয় কাজ আমার কাছে হাস্যকর। কিন্তু ক্রমশ টের পাচ্ছি লেখালেখি আমাকে দিয়ে হবে না। সৃষ্টির জন্য প্রয়োজন সৃষ্টিক্ষম প্রজ্ঞার। সেই প্রজ্ঞার উৎসভূমি আমার মধ্যে নেই, যাকে বলে প্যাশন। সেই প্যাশনের অভাব রয়েছে আমার মধ্যে। আছে প্রবঞ্চনা। এ ছাড়া লিখতে পারি অন্যের সাহিত্য নিয়ে আলোচনা। কিন্তু তাতে কী লাভ? যার ভালো লাগার আমি না লিখলেও সে পড়বে। বাকি রইল সাহিত্যপাঠ। এযাবৎকাল বেশ কিছু পরিমাণ সাহিত্য পড়ে মনে হয়েছে, না পড়লেও বিশেষ ক্ষতিবুদ্ধি ছিল না। অতএব স্পষ্ট বুঝতে পারছি, আমার যাবতীয় প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছিল, হয় এবং হবে।...’
বর্ণনাকারী ইচ্ছা করে ট্রেনের চাকায় পিষ্ট রফিকের শরীর দেখতে গেছেন। শীতল চোখ রেখেছেন ছিন্নভিন্ন মাংসের ওপর, মৃত্যুর ওপর। যারা ট্রেনের চাকায় আত্মহত্যা করে, তাদের সম্পর্কে তিনটি কথা বলা যায়—এক. তারা একটি বীভৎস মৃত্যু চায়। দুই. তারা জনসমক্ষে মৃত্যু চায়। তিন. তারা অন্যের দ্বারা নিহত হতে চায়। একটিই জীবন আমাদের। তুলনা করার মতো পূর্ববর্তী কোনো জীবন আমাদের হাতে নেই, হাতে নেই শুধরে নেওয়ার মতো পরবর্তী কোনো জীবনও। তাহলে কী করে বোঝা যাবে জীবনের কোন সিদ্ধান্তটি সঠিক, কোনটি ভুল?
প্রেম ও মৃত্যু
ব্রিজের রেলিংয়ে বসে ফুরফুরে হাওয়ায় ওপারে বটগাছ দেখি, আকাশের তারা দেখি, জ্যোৎস্নাপ্লাবিত নদী দেখি। মনে হয় এসবই যেন একেকটি প্রতীক, যেন এদের সবারই অন্য কোনো অর্থ আছে। ব্রিজের অপর প্রান্ত থেকে সেই মানুষটিকে আবার হেঁটে আসতে দেখি। এবার তার ঠোঁটে জ্বলন্ত সিগারেট। কারও কাছে দেশলাই পেয়েছেন বুঝিবা। মানুষটি বর্ণনাকারীর কাছে এসে দাঁড়ায়। তার মুখে রহস্যময় হাসি। বলে—মরণে কে হবে সাথি?প্রেম ও ধর্ম জাগিতে পারে না বারোটার বেশি রাতি। সিগারেটের ধোঁয়া ছড়াতে ছড়াতে মানুষটি হেঁটে চলে যায়। মানুষটি কি বর্ণনাকারীর চেনা?
উৎসব ও বেদনা
চারদিকে উৎসবের আলোকসজ্জা, বাজনা, ভোজনের মৌতাত। এরই মধ্যে বোনেরা আমাদের কাঁধে মাথা রেখে কাঁদে। আমরা ওদের মাথায় হাত বুলিয়ে সংসারে পাঠাই। বলি, কাঁদে না বোন। অথচ রান্নার তদারকিতে গিয়ে ধোঁয়ার ছলে কাঁদি। আমাদের মুখে সারা জীবন লেগে থাকে বাবার দেওয়া কদমার মায়াবী স্বাদ, চোখে ভাসে রঙিন কাঠিলজেন্স, আমাদের তাড়া করে ফেরে মায়ের গন্ধভরা শৈশবের বাতাস। বিনিময়ে কী দেব ওদের—ভেবে ভেবে বুক কাঁপে আমাদের।
বেবুনের গল্প
ভাবতে ভাবতে হঠাৎ বেবুনের গল্প মনে আসে। অথচ বেবুনের গল্প মনে আসার কোনো মানে হয় না। কারণ, আমরা তো ছেলের পা বুকে নিয়ে চাঁদমামাকে ডাকি। আঁচলে ঢেকে রাতভর মেয়েকে দিই উত্তাপ। আমরা ওদের চুল আঁচড়ে, গাল টিপে বলি, সাবধানে রাস্তা পার হবে। মেঘলা রাত, ঝোড়ো হাওয়ায় আমাদের জানালায় আছড়ে পড়ে কাঁঠালপাতা। চমৎকার রান্না হয় সেদিন। ঘরময় পাঁচফোড়নের ঘ্রাণ। চারদিকের বাতি নিভে যায় হঠাৎ। আমরা সুখী দম্পতি মোমের আলোয় খেতে বসি। তারপর আলো-আঁধারিতে বিছানায় যাই। আমরা প্রমাণ করি দম্পতির বিছানায় অশ্লীলতাই নৈতিক, নান্দনিক। আমরা পরস্পরকে বলি, তোমাকে ভালোবাসি অস্থিমাংসসহ।
একটি বেবুন মা তার শিশুটিকে বুকে জড়িয়ে নদী পার হওয়ার চেষ্টা করছে। নদীতে তখন জোয়ার আসে। হঠাৎ স্রোত যখন বাড়তে থাকে, বেবুন মা তখন একটি পাথরখণ্ডের ওপর গিয়ে দাঁড়ায়, বুকে শক্ত করে চেপে রাখে তার শিশুটিকে। কিন্তু নদীর পানি বাড়তে থাকে। পাথর ডুবে যায়, পানি বাড়তে বাড়তে ডুবে যায় বেবুনের বুক। বেবুন তখন তার শিশুটিকে কাঁধের ওপর বসিয়ে দেয়। কিন্তু পানি তবু বাড়ছে। বেবুন মা শেষে তার শিশুটিকে দুই হাতে মাথার ওপর উঁচু করে শূন্যে ধরে রাখে। বাঁচাতে হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে, তার সন্তানকে। তবে পানি যখন আরও বাড়তে থাকে, তখন সহসা বদলে যায় সবকিছু। পানি বাড়তে বাড়তে যখন বেবুন মায়ের গলা ডুবে যায় এবং যে মুহূর্তে পানির স্তর তার নাক স্পর্শ করে, অমনি সে একটানে শিশুটিকে নিয়ে আসে তার পায়ের নিচে। জলমগ্ন পাথরের ওপর শিশুটিকে রেখে তার ওপর দাঁড়ায় সে। এবার তার নাক পানি থেকে যথেষ্ট উঁচুতে, নিরাপদ দূরত্বে। বেবুন প্রাণভরে নিশ্বাস নেয় এবার।
শেষ দৃশ্য
খুব চকিত এ সময় ব্রিজ পেরিয়ে যায় আরেকটি নাইট কোচ। বাসের জানালা থেকে হঠাৎ বর্ণনাকারী ব্রিজের রেলিংয়ে বসে দেখে—জ্যোৎস্নাপ্লাবিত নদীর ওপর হাওয়ায় তিরতির ভেসে যাচ্ছে রাতজাগা খেয়ালি এক যাত্রীর তৈরি কাগজের এরোপ্লেন।



