শহীদুল জহিরের গল্প: নিঃসঙ্গতা, জনপদ ও লোকশ্রুতির এক অনন্য বুনন
শহীদুল জহিরের গল্প: নিঃসঙ্গতা ও জনপদের এক অনন্য বুনন

শহীদুল জহিরের গল্পের আখ্যান কে বলেন—লেখক নিজে, না গ্রামের লোকেরা? বারবার দেখা যায়, সুহাসিনী গ্রামের লোকেরা বলে যে আবদুল ওয়াহিদ বাঁচার জন্য ঘরের সিলিং বেয়ে পাশের ডাবগাছে উঠে যায়, সেদিন আততায়ীদের হত্যাচেষ্টা থেকে বেঁচে যায়। আবার গল্প বলে দক্ষিণ মৈশুন্ডি, পদ্মনিধি লেন, র‍্যাংকিন স্ট্রিট, কলতাবাজার, লক্ষীবাজার বা ভূতের গলির মহল্লাবাসী। তারা বলে, আবদুল করিম সারাদিন স্যাঁতসেতে বারান্দায় বসে থাকে, কিংবা আবদুস সাত্তার ব্যালকনিতে একা বসে থাকে। অর্থাৎ সমষ্টিগত মানুষ গল্প বলছে পাঠকের কাছে। আমরা পাঠকও একা ও সমষ্টি। সুহাসিনী গ্রামের লোকেরা বা পুরান ঢাকার নারিন্দার ভূতের গলির মহল্লাবাসী—অনেকে মিলে একটি গল্প বলে বা নির্মাণ করে, শেষ করে আবার আরেকটি বলে। একজন পাঠক যখন পড়েন, তখন মনে হতে পারে যে শুধু একজন শহীদুল জহির নন, অনেক মানুষ সম্মিলিতভাবে গল্পটি বলছে। এতে গল্প বিশ্বাসযোগ্য হয়।

গল্পের নির্মাণশৈলী ও বাস্তবতার নিখুঁত চিত্রায়ণ

গল্পের বিষয়-আশয় ও বাস্তবতার ডিটেইল এমন নিখুঁত ভঙ্গিতে রচিত যে মনে হয়, মহল্লাবাসী বা গ্রামের লোকেরা কোনো ঘটনা বা চরিত্রের গতিবিধি সামনে থেকে দেখছে, উপলব্ধি করছে, তারপর বলছে। তাদের হয়ে শহীদুল জহির লিখে দিচ্ছেন। তিনি নিজেও ঘটনা দেখছেন বা উপলব্ধি করছেন। অথবা বলা যায়, মহল্লার লোকেরা যা দেখল, ভাবল, করল, সবই দেখলেন শহীদুল জহির। তিনি হয়তো তাদের মধ্যে ঘাপটি মেরে ছিলেন, তারা টের পায়নি। পরে তিনি নিজের বাসায় ফিরে গিয়ে গল্প লিখছেন। পাঠক হিসেবে আমরা কোথায় অবস্থান করছি? বিভ্রম হয়, আমিই কি সুহাসিনী গ্রামের বাসিন্দা? নাকি ভূতের গলির কেউ? নাকি আমি কিছুটা শহীদুল জহির?

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আবদুল ওয়াহিদের গল্প: সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙা থেকে গ্রামে ফেরা

এক ধুলাওড়া দিনে আবদুল ওয়াহিদ গ্রামে ফিরে এল। যখন সে গ্রাম ছেড়ে যায়, তখন যুবক; বাইশ বছর পর ফিরে এসেছে ভাঙা চেহারা ও ভাঙা স্বপ্ন নিয়ে। কারণ, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেছে। কোথায় সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙল, তার সঙ্গে সিরাজগঞ্জ জেলার সুহাসিনী গ্রামের গ্রামীণ নকশাল আবদুল ওয়াহিদের জীবন ও স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার সম্পর্ক কী? অল্প বয়সে সশস্ত্র শ্রেণিসংগ্রামের রাজনীতিতে যুক্ত হয় ওয়াহিদ, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে। সে তখন সদ্য তরুণ, বালিকা নূরজাহানকে পছন্দ করত। একদিন নারকেলগাছের খোড়ল থেকে সদ্য ফোটা পাখির বাচ্চা এনে দেয় নূরজাহানকে, বলে, 'এই নে ময়নার ছাও, বড় হইলে কতা শিখাস...' তারপর চলে যায় সশস্ত্র রাজনীতিতে। বাড়ির সবাই বলে, 'নূরজাহান, এইডা ময়নার ছাও না, শালিখের ছাও।' নূরজাহান ওয়াহিদকে বিশ্বাস করে শালিকের বাচ্চাকেই ময়না মনে করে পালন করে। একদিন বাচ্চা পরিপূর্ণ শালিক হয়, নূরজাহান তাও মানতে পারে না। তার বিয়ে হয় ওয়াহিদের বাল্যবন্ধু স্কুল মাষ্টার আবুল হোসেনের সঙ্গে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সময় বদলায়, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায়, আশির দশক অতিক্রান্ত হয়। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সেই শ্রেণিসংগ্রামের রাজনীতিতেও ভাটা পড়ে। ক্লান্ত, বিধ্বস্ত আবদুল ওয়াহিদ প্রায় বাইশ বছর পর গ্রামে ফেরে। বাড়িতে কিছুদিন নিঃসঙ্গতায় ডুবে থাকে, তারপর সত্যি সত্যি এক জোড়া ময়না ও একটি গোলাপের ডাল কিনে আনে। গোলাপের ডালের কলপ কাচারির সামনের মাটিতে পুঁতে দেয়, কারণ ডাল মানুষের কথা বুঝতে পারে। ময়না দুটিকে আলাদা খাঁচায় রেখে কালো কাপড়ে ঘিরে দেয়, কথা শেখায়। এক ময়নাকে বলে, 'ক্যান্দেন ক্যা?' অন্য ময়না উত্তর দেয়, 'সুখ নাই জীবনে।'

নিঃসঙ্গতার চিত্রায়ণ: আবদুল করিম ও আবদুল আজিজ ব্যাপারী

শহীদুল জহিরের চরিত্র আবদুল করিম নিঃসঙ্গ। ভূতের গলিতে শুয়ে-বসে থাকা ছাড়া যেন তার কোনো কাজ নেই। সে মানুষের সঙ্গ চায়, কিন্তু আজকের দিনের মানুষ বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে উঠতে পারে না। কৌশল করে মানুষের সঙ্গ পেতে চায়: ফেরিওয়ালার কাছ থেকে কাগজ কিনে আবার তার কাছেই বিক্রি করে—বাজার বাণিজ্যের ছলে সঙ্গলাভের বাসনা। কথা বলার সুযোগ আসে মহল্লার অভিভাবকদের কাছ থেকেও; তাদের বাচ্চারা মারামারি করে রক্তাক্ত হয়, তার অনুঘটক হিসেবে আবদুল করিম গুপ্ত-উদ্যোগ নেয়।

আবদুল আজিজ ব্যাপারী আরেক নিঃসঙ্গ চরিত্র, ভূতের গলির বাসিন্দা। পুরো বাড়িতে একা বাস করে, মাঝেমধ্যে মহল্লাবাসী আসে। নিঃসঙ্গতা কাটাতে তারা মিলে গল্পের ঘোর তৈরি করে, যেখানে বারবার সুবোধ-স্বপ্না নামের দম্পতি আসে এবং ব্যাপারীর বাড়িতে ভাড়াটিয়া হয়ে উঠানের কুয়ায় ডুবে মারা যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা যায়, উঠানে কোনো কুয়াই ছিল না। মহল্লাবাসী বলে, 'সব বানাইন্না গল্প। হালারপুত গল্পের হুগার ভিত্রে হান্দাইছে!'

শহীদুল জহিরের গদ্যভাষা ও নিঃসঙ্গতার দর্শন

শহীদুল জহিরের লেখায় প্রচুর গালি আছে চরিত্রদের সংলাপে, যা পুরান ঢাকার জনভাষা। জনভাষার ব্যবহার আখ্যানকে শক্তিশালী করে। তাঁর গদ্যভাষা একেবারে নিজস্ব বুননশৈলী, যা অন্য কথাসাহিত্যিকদের থেকে আলাদা। আধুনিক মানুষ মূলত একা—এ নিপুণভাবে চিত্রিত হয়েছে তাঁর লেখায়।

নিঃসঙ্গতার প্রসঙ্গে লেখক নিজের অভিজ্ঞতা বলেন: এক ঈদের রাতে ঢাকায় লোকজন কম, বন্ধুরা সংসারী, কোথায় যাই ভাবছি। ভাবলাম, শহীদুল জহিরের বাসায় যাই, যদিও পরিচয় নেই। একদিন তাঁর অফিসিয়াল ফোন নম্বরে কল করেছিলাম, ওপার থেকে জানতে চায়, 'কোন শহীদুল জহির?' বলি, 'লেখক শহীদুল জহির।' উত্তর, 'শহীদুল জহির বলে এখানে কেউ চাকরি করেন না।' পরে আর কথা আগায়নি।

আরেকবার এক ঈদের রাতে বেইলি রোডের সরকারি আবাসনে, ছয়তলায়, দরজায় কড়া নাড়ি। দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করি, 'এই বিল্ডিংয়ে শহীদুল জহির থাকেন?' দারোয়ান প্রশ্ন করে, 'কোন শহীদুল জহির?' বলি, 'লেখক, যুগ্ম সচিব।' দারোয়ান বলে, 'ওহ্! অকৃতদার শহীদুল জহির?'

ছয়তলায় দরজা খুললেন আবদুল করিম কিংবা আবদুস সাত্তার কিংবা আবদুল আজিজ ব্যাপারী বা আবদুল ওয়াহিদ। বললাম, 'আপনিই তো শহীদুল জহির?' তিনি মাথা নাড়লেন, আমাকে চিনলেন। বললাম, 'আমি আপনার ছবি দেখেছি বইয়ের ফ্ল্যাপে, গোঁফ ছিল, এখন নেই।' তিনি বললেন, 'পত্র–পত্রিকায় আপনার ছবি দেখেছি।' ঘণ্টা তিনেক আড্ডা চলল, কথাবার্তা তাঁর চরিত্রদের দিকে ধাবিত ছিল। তিনি আমার বন্ধুদের লেখা সম্পর্কে জানতে চান।

এখন মনে হচ্ছে, না, কোনো ঈদের রাতে আমি বেইলিতে যাইনি, শহীদুল জহিরের সঙ্গে কখনো দেখা হয়নি, হবেও না। যেন তাঁর গল্পের ভঙ্গিতেই বেঁচে আছি। সত্যি কি বেঁচে আছি? সিক্সটিজে নাকি নাইনটিজে? নাকি ২০২৬ সালে?

শহীদুল জহিরের প্রভাব ও বাংলা সাহিত্যে অবস্থান

বাংলা ভাষায় শহীদুল জহিরের চেয়ে শক্তিশালী লেখক এই মুহূর্তে কেউ হাজির করতে পারবে? তাঁর মতো গদ্যভাষাকে নিজের আয়ত্তে এনে ব্যবহার করার ক্ষমতা কি কারও আছে? বয়ানের মহাজনী ও ফাঁপা বাগাড়ম্বর নয়, করে দেখাতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে প্রভাবশালী কথাসাহিত্যিক শহীদুল জহির—এ বাক্যকে অস্বীকার করার মতো কিছু কি আছে?

শহীদুল জহিরের গল্প বা আখ্যান কি তিনি নিজেই বলেন, নাকি সম্মিলিতভাবে গ্রামের লোকেরা বলে? আখ্যান লোকশ্রুতির মতো হয়ে ওঠে, যার মধ্যে মিথ-রূপকল্প দানা বাঁধে। নারিন্দায় ভূতের গলির লোকেরা গল্প বলে? না, পাঠক গল্পটি পড়তে থাকেন, তা তাঁর দেখা গল্প হয়ে যায়। আখ্যান কি তাঁরই? জনপদের গল্প? জনসমষ্টির গল্প? এমন করেই নির্মাণ করেন শহীদুল জহির।

মুক্তিযুদ্ধ ও প্রান্তিক চরিত্র

শহীদুল জহিরের চরিত্রেরা মূলত সমাজের প্রান্তিকবর্গের বাসিন্দা—শহরের বস্তি, মহল্লার সাধারণ মানুষ বা সুহাসিনী গ্রামের মানুষ। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ বড় ফ্যাক্টর হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে তাঁর লেখায়। মুক্তিযুদ্ধের বাস্তবতায় অনেক ক্ষতি মেনে নিতে হয়েছে জাতিকে। যুদ্ধের সময় বাঙালির অসহায়ত্ব যেমন তুলে এনেছেন, তেমনি রাজাকারদের চরিত্র চিত্রণেও মনোযোগী। মুক্তিযুদ্ধ তিনি নিজেই দেখেছেন, কারও কাছে শোনা গল্প লেখেননি। বাংলাদেশ যেমন মুক্তিযোদ্ধার লড়াইয়ের গর্বের দেশ, আবার রাজাকার-বাস্তবতাও ইতিহাসের অনিবার্য অংশ। স্বাধীন দেশে রাজনৈতিক পালাবদলের বাস্তবতায় অনেকে রাজাকারগিরির প্রতি সমর্থন প্রকাশ্যে স্বীকার করতে অস্বস্তি বোধ করেন।

কেউ কেউ নৈতিক কারণে শহীদুল জহিরের লেখার প্রাপ্য মান্যতা দিতে নারাজ। কিন্তু সময়ের অগ্রসর পাঠক ক্রমশ তাঁর আখ্যানে বুঁদ হয়ে উঠছেন। অনূদিত শহীদুল জহির বহির্বিশ্বের পাঠকের কাছে ছড়িয়ে পড়ছেন তাঁর রচনার শক্তিতেই। বাংলা ভাষায় তাঁর চেয়ে শক্তিশালী লেখক এখন কেউ নেই। তিনি বাংলা কথাসাহিত্যকে অভিনব উচ্চতায় রেখে গেছেন। আমি চাই, কেউ তাঁকে অতিক্রম করুক, তবেই বাংলা সাহিত্যের ভান্ডার সমৃদ্ধ হবে। তবে লেখালেখি ব্যতিরেকে বড় লেখককে বয়ান করে খারিজ করা যায় না। স্মর্তব্য সেই অমর বাণী, 'বরং নিজেই তুমি লেখো নাকো একটি কবিতা—' লিখে প্রমাণ করো যে তুমি পারো।