তথ্যচিত্রে মেসি ও রোনালদিনহো। নেটফ্লিক্সে তাঁদের দেখা। ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এটি এক অনন্য অভিজ্ঞতা। ফুটবলের ইতিহাসে এমন কিছু খেলোয়াড় আছেন, যাঁদের কথা শুনলেই পরিসংখ্যানের আগে চোখে ভেসে ওঠে আনন্দ। গোল, শিরোপা কিংবা রেকর্ড নয়, তাঁদের স্মরণ করা হয় খেলার সৌন্দর্যের জন্য। ব্রাজিলের সাবেক খেলোয়াড় রোনালদিনহো সেই তালিকার অন্যতম। মাঠে বল পায়ে তাঁর হাসি, প্রতিপক্ষকে বোকা বানানো ড্রিবল, অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলা পাস কিংবা দর্শকদের জন্য ফুটবলকে বিনোদনের শিল্পে পরিণত করার ক্ষমতা তাঁকে অন্য সবার থেকে আলাদা করেছে।
দুই দশকের প্রশ্নের উত্তর
দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ফুটবলপ্রেমীদের মনে একই প্রশ্ন ঘুরেফিরে এসেছে—রোনালদিনহো আসলে কে? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই নতুন তথ্যচিত্র ‘রোনালদিনহো: দ্য ওয়ান অ্যান্ড অনলি’। বিশ্বকাপ ফুটবলকে সামনে রেখে গত এপ্রিলে নেটফ্লিক্সে মুক্তি পায় তথ্যচিত্রটি। তিন পর্বের এই তথ্যচিত্র শুধু একজন ফুটবলারের গল্প নয়; এটি এক দরিদ্র ব্রাজিলিয়ান ছেলের বিশ্বজয়ের কাহিনি, যার মুখে সব সময় হাসি ছিল, কিন্তু জীবনে ছিল সংগ্রাম, ট্র্যাজেডি, বিতর্ক এবং অবিশ্বাস্য সাফল্য।
পোর্তো অ্যালেগ্রের ছোট্ট ছেলেটি
রোনালদিনহোর জন্ম ১৯৮০ সালে ব্রাজিলের দক্ষিণাঞ্চলের শহর পোর্তো অ্যালেগ্রেতে। তাঁর পুরো নাম রোনালদো দে আসিস মোরেইরা। ফুটবল তাঁর পরিবারের রক্তেই ছিল। বাবা জোয়াও ছিলেন অপেশাদার ফুটবলার এবং জাহাজ নির্মাণ কারখানার কর্মী। বড় ভাই রবার্তো পেশাদার ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু রোনালদিনহোর শৈশব সুখের ছিল না। মাত্র আট বছর বয়সে বাবাকে হারান তিনি। পরিবারের ওপর নেমে আসে আর্থিক সংকট। তথ্যচিত্রে পরিবারের সদস্যরা সেই সময়ের কথা স্মরণ করেছেন। সেখানে দেখা যায়, ফুটবলই ছিল ছোট্ট রোনালদিনহোর একমাত্র আশ্রয়।
রাস্তার ফুটবল থেকে বিশ্বমঞ্চ
ব্রাজিলের অলিগলি, সৈকত আর ছোট ছোট মাঠে ফুটবল খেলেই বড় হয়েছেন রোনালদিনহো। তথ্যচিত্রে উঠে এসেছে কীভাবে অল্প বয়সেই তাঁর অসাধারণ প্রতিভা সবার নজর কাড়ে। ১৩ বছর বয়সে এক ম্যাচে ২৩ গোল করার ঘটনাও আবার আলোচনায় এসেছে। খুব দ্রুতই তিনি ব্রাজিলিয়ান ক্লাব গ্রেমিওর নজরে আসেন। সেখান থেকেই শুরু পেশাদার ফুটবলের যাত্রা। তথ্যচিত্রে পুরোনো ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, কিশোর রোনালদিনহোর খেলার ধরন তখনই অন্যদের থেকে আলাদা ছিল। তিনি শুধু গোল করতে চাইতেন না; দর্শকদের আনন্দ দিতে চাইতেন।
ইউরোপ জয়
ফ্রান্সের পিএসজি ক্লাবে যোগ দেওয়ার মাধ্যমে ইউরোপীয় ফুটবলে প্রবেশ করেন রোনালদিনহো। কিন্তু তাঁর প্রকৃত উত্থান ঘটে স্পেনের বার্সেলোনায়। তথ্যচিত্রের সবচেয়ে আবেগঘন অংশগুলোর একটি হলো বার্সেলোনা অধ্যায়। ক্লাবটি তখন সংকটের মধ্যে। সমর্থকেরা হতাশ। সেই সময় রোনালদিনহো এসে শুধু দলটিকেই বদলে দেননি, বদলে দিয়েছিলেন পুরো ক্লাবের মানসিকতা। ২০০৫ সালে তিনি জেতেন ব্যালন ডিঅর। একই সময়ে বার্সেলোনাকে আবার ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলোর একটিতে পরিণত করেন। তথ্যচিত্রে সাবেক সতীর্থদের ভাষ্য থেকে জানা যায়, রোনালদিনহোর উপস্থিতি ছিল সংক্রামক। তিনি মাঠে যেমন হাসতেন, অনুশীলনেও তেমনি আনন্দ ছড়িয়ে দিতেন।
মেসির জীবনে রোনালদিনহো
তথ্যচিত্রের অন্যতম আকর্ষণীয় অংশ হলো লিওনেল মেসির সঙ্গে রোনালদিনহোর সম্পর্ক। আজকের মেসিকে সবাই চেনে। কিন্তু ২০০৪ সালে তিনি ছিলেন লাজুক এক কিশোর। রোনালদিনহোই প্রথম তাঁকে ড্রেসিংরুমে আপন করে নিয়েছিলেন। বার্সেলোনার মূল দলে মেসির অভিষেকের সময় রোনালদিনহো ছিলেন দলের সবচেয়ে বড় তারকা। মেসির প্রথম গোলটির অ্যাসিস্টও করেছিলেন রোনালদিনহো। তথ্যচিত্রে উঠে এসেছে, কীভাবে তিনি তরুণ মেসিকে আগলে রেখেছিলেন এবং ড্রেসিংরুমে আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছিলেন। অনেক বিশ্লেষকের মতে, বার্সেলোনার ইতিহাসে মেসির উত্থানের পেছনে রোনালদিনহোর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তথ্যচিত্রে মেসিও সেই সময়ের স্মৃতি ভাগাভাগি করেছেন।
রোনালদোর গল্পেও তাঁর ছায়া
আরেকটি মজার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে তথ্যচিত্রে। ২০০৩ সালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড রোনালদিনহোকে দলে নেওয়ার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি বার্সেলোনা বেছে নেন। ফলে ইউনাইটেডে একটি উইঙ্গারের জায়গা খালি থেকে যায়। সেই সুযোগেই ক্লাবে আসেন ১৮ বছর বয়সী এক তরুণ—ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো।
২০০২ বিশ্বকাপের নায়ক
ব্রাজিলের পঞ্চম বিশ্বকাপ জয়ও তথ্যচিত্রে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ২০০২ সালে রিভালদো, রোনালদো ও রোনালদিনহোকে নিয়ে গঠিত আক্রমণভাগ ছিল ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম ভয়ংকর ত্রয়ী। বিশেষ করে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেই বিখ্যাত ফ্রি-কিক গোল আজও বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত মুহূর্ত। সেটি কি শট ছিল, নাকি ক্রস? প্রশ্নটির উত্তর এখনো পুরোপুরি মেলেনি। কিন্তু গোলটি ব্রাজিলকে সেমিফাইনালে নিয়ে যায়। পরে দলটি বিশ্বকাপও জিতে নেয়।
শুধু সাফল্য নয়, বিতর্কও
তথ্যচিত্রটি রোনালদিনহোর জীবনের বিতর্কিত অধ্যায়গুলোও এড়িয়ে যায়নি। ক্যারিয়ারের শেষভাগে ফিটনেস সমস্যা, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন এবং মাঠের বাইরের নানা সমালোচনার বিষয় উঠে এসেছে। বিশেষ করে ২০২০ সালে প্যারাগুয়েতে ভুয়া পাসপোর্ট ব্যবহার করে গ্রেপ্তার হওয়ার ঘটনাটি তথ্যচিত্রে আলোচিত হয়েছে। নির্মাতারা দেখানোর চেষ্টা করেছেন, বিশ্বজোড়া জনপ্রিয়তা কখনো কখনো একজন মানুষের ব্যক্তিগত জীবনকে কতটা জটিল করে তুলতে পারে।
কেন তিনি এত প্রিয়?
রোনালদিনহোর ক্যারিয়ারের পরিসংখ্যান অসাধারণ। তিনি বিশ্বকাপ জিতেছেন, চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতেছেন, ব্যালন ডি’অর জিতেছেন। কিন্তু তথ্যচিত্রটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরে—মানুষ তাঁকে শুধু শিরোপার জন্য মনে রাখে না। কারণ, তিনি ফুটবল খেলতেন আনন্দ নিয়ে। যে যুগে ফুটবল ক্রমেই কৌশল, অর্থনীতি এবং ব্যবসার মধ্যে বন্দী হয়ে পড়ছিল, সেই সময় রোনালদিনহো দর্শকদের মনে করিয়ে দিয়েছিলেন যে ফুটবল মূলত আনন্দের খেলা। তথ্যচিত্রটি দেখায়, কীভাবে তিনি শুধু ম্যাচ জিতেননি, ফুটবল খেলার ধরনও বদলে দিয়েছিলেন। তাঁর ‘নো-লুক পাস’, ‘এলাস্টিকো’ ড্রিবল, অসম্ভব ফ্রি-কিক কিংবা প্রতিপক্ষকে অপদস্থ করে দেওয়া স্কিল আজও ইউটিউব যুগের আগের ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে জীবন্ত।
এই তথ্যচিত্রের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো, এটি রোনালদিনহোকে দেবতা বানানোর চেষ্টা করেনি। বরং একজন মানুষ হিসেবে তাঁকে দেখিয়েছে। এখানে যেমন আছে কিংবদন্তির উত্থান, তেমনি আছে ভুল সিদ্ধান্ত। যেমন আছে সাফল্যের ঝলক, তেমনি আছে ব্যর্থতার অন্ধকার। ফলে দর্শক শুধু একজন ফুটবল তারকাকে দেখেন না; একজন মানুষকেও চিনতে পারেন।



