‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ এক হয়ে যাওয়া শিল্পকর্ম, যার সৃষ্টিরহস্য যুক্তির আধারে যথার্থভাবে ধারণ করা প্রায় অসম্ভব। এ কবিতা বা গান এক কার্যকর ও সফল শিল্পকর্মও বটে, যেহেতু ১০০ বছর ধরে অতি তাজা আর আকর্ষণীয় রচনা হিসেবে এটি অসংখ্যবার উৎপাদিত-পুনরুৎপাদিত হয়েছে এবং বাংলাভাষীদের শৈল্পিক চাহিদা মেটাতে ও অগণিত উপলক্ষে মানুষের উজ্জীবনের খোরাক জোগাতে ব্যবহৃত হয়েছে অজস্রবার। খুব কম রচনার ক্ষেত্রেই এ যৌথ প্রাপ্তির অসামান্য নজির মেলে।
শিল্পগত প্রেরণা ও জাগরণী আকাঙ্ক্ষার সম্মিলন
মানুষের শিল্পগত অভীপ্সার সর্বজনীন একটা দিক আছে। এর বদৌলতে স্থান ও কালের বিপুল দূরত্বে দুনিয়ার বহু শিল্পকলা ভোগ-উপভোগের সামগ্রী হয়। আবার প্রয়োজনের তাগিদে মানুষ ফিরে ফিরে যায়, এ রকম শিল্পকলাও যথেষ্ট আছে। কোনো না কোনোভাবে ধর্মীয় বর্গে পড়ে না, এমন রচনার ক্ষেত্রে অবশ্য প্রয়োজনীয় শিল্পকর্ম হিসেবে ব্যবহার ও ভোগের হার খুবই নগণ্য। ক্ল্যাসিক শিল্পকর্মে মানুষ প্রধানত ফিরে যায় শিল্পগত প্রেরণায়। ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ সেই বিরল প্রজাতির সৃষ্টিশীলতা, যার ভোগ-উপভোগ ও ব্যবহারে দুই সেক্যুলার প্রণোদনা প্রায় সমহারে কাজ করে যাচ্ছে ১০০ বছর ধরে। একদিকে নিছক শিল্পগত প্রেরণায় এ কবিতা ও গান নতুনভাবে উপস্থাপিত হয়েছে অসংখ্যবার; অন্যদিকে জাগরণী আকাঙ্ক্ষায় মানুষ সংখ্যাতীত আয়োজনে রচনাটির শরণ নিয়েছে। কাব্য ও গানের যৌথ প্রকাশ হয়তো অন্যতম প্রধান কারণ, যার সুবাদে রচনাটি এ বিরল প্রকৃতির সাফল্য রোজগার করতে পেরেছে।
সমকালীন সংকট ও কর্তব্যের প্রতিফলন
এ কাব্য এক যাত্রার কাহিনি। মহাযাত্রা। যাত্রার উৎসবিন্দু গভীরভাবে তৎকালীন ‘বর্তমানময়তা’য় পোঁতা। অন্তত দুটি উল্লেখ প্রত্যক্ষভাবে দেখতে পাচ্ছি, যেখানে সেকালের সংকট ও কর্তব্যের নিরিখে কর্মসূচি প্রণীত হচ্ছে। প্রথমত, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের মধ্যে মূর্ত স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে সুস্পষ্ট কর্তব্য হিসেবে ঘোষণা করা। দ্বিতীয়ত, হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িকতার বিষাক্ত আবহে ভেঙে পড়া জনতার ঐক্য প্রস্তাব করা। দুটিই সেকালের ঘোরতর বর্তমান। দুটিই সেকালের সবচেয়ে কেন্দ্রীয় সংকট ও কর্তব্য আকারে মানুষের অস্ফুট কথামালা আর আকাঙ্ক্ষার মধ্যে হাজির বাস্তবতা। প্রচণ্ডভাবে জায়মান সে অস্ফুট ভাষাকে দ্ব্যর্থহীন উচ্চারণে রূপায়িত করাই ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতার তীব্রতার মূল উৎস।
দেশ ও জনতার রূপকল্প
অবশ্য এ কেন্দ্রমুখী ‘বর্তমানময়তা’র বাইরে আরও দুটি উপাদান এ কবিতার রূপকল্প গঠনে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করেছে। এ দুটিও সমসাময়িকতার বহির্ভূত কিছু নয়; কিন্তু তার উপস্থিতি স্থান ও কালের বড় পরিসরে ব্যাপ্ত। এর একটি হলো ‘দেশ’। ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতায় একে বরাবরই সম্বোধন করা হয়েছে মাতৃমূর্তিতে। অন্যটি হলো ‘জনতা’। দেশটি সেকালের ভারতবর্ষই বটে। অবশ্য ক্লাইভের খঞ্জরে লাল হওয়া শহীদদের পরিচয় যেভাবে ‘বাঙালি’ বলে দেওয়া হয়েছে, তাতে দেশের আকৃতি-প্রকৃতি নিয়ে একটা সংশয় উপস্থিত হওয়া বিচিত্র নয়। কিন্তু ভূগোল যা–ই হোক, মর্মগতভাবে ব্রিটিশ-কবলিত দেশটি এ কবিতার অন্যতম প্রাণ। অন্যদিকে নজরুল-সাহিত্যের জনতা—৩৩ কোটি মানুষ—এ রচনারও মূল আশ্রয়। পূর্ববর্তী দুই উপাদানের মতো এ দুই উপাদানের সাথেও সেকালের বাস্তবতার গভীর সম্পর্ক আছে। কিন্তু উপাদান দুটি এমন যে সমকালের প্রতাপ মাড়িয়ে তাদের গতি প্রসারিত হতে থাকে ভবিষ্যতের দিকে। ‘দেশ’ আবির্ভূত হতে পারে যেকোনো স্থান-কালের সন্ধিক্ষণে; আর ‘জনতা’, বিশেষত নিপীড়িত ‘জনতা’ দুনিয়ার যেকোনো দেশ-কালের প্রত্যক্ষ চরিত্র। ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ এভাবে সমকালীনতার প্রত্যক্ষতায় জন্ম নিয়েও কালকে দ্রুত ছাড়িয়ে যায়, আসন পোক্ত করে নেয় মহাকালের খাতায়।
নজরুলের বিপ্লবী চেতনা ও কবিতার রূপকল্প
বস্তুত, সময়টি ছিল উন্মাতাল। ব্রিটিশ ভারতের প্রথম গণ-আন্দোলন তখন সবে শেষ হয়েছে। হিন্দু-মুসলমাননির্বিশেষে সামষ্টিক কর্মসূচি বলা যায়, এমন এক বিপুল রাজনৈতিক তৎপরতায় ভারতবাসী তখন উজ্জীবিত। এ প্রেক্ষাপটেই নজরুল প্রথমবারের মতো ভারতের সর্বাঙ্গীণ স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন। বলা যায়, যুগের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ভাষা নজরুলের ভাষাতেই প্রথম বাণীরূপে মূর্ত হয়েছিল। স্তিমিত হয়ে আসা ‘সন্ত্রাসবাদী’ আন্দোলন এ সময় আরেকবার প্রাণ পেতে শুরু করে। নজরুল কেবল সে তৎপরতার সাথেই সম্পৃক্ত ছিলেন না, অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, তাঁর রচনা ও কার্যক্রম নতুন বিপ্লবী চেতনার অন্যতম জোগানদার হয়ে উঠেছিল।
কবিতার রূপকল্পটিও হয়েছে ভারি সুন্দর। যাত্রাপথটি এগিয়েছে মুখ্যত রূপকের হাত ধরে। কবি শুরু করেছেন প্রচলিত ও পরিচিত উপকরণের সন্নিবেশে। দুরূহ পথের রূপক হিসেবে গিরি, মরু আর সাগরের রূপক বরাবরই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। নিশীথ রাত্রির উপমাও অ-চলিত নয়। কিন্তু বিশেষণের সমাবেশ যুক্ত হয়ে যে সামবায়িক আবহ তৈরি হয়, তাতে এ পরিচিত উপাদানগুলোই অপরিচিতের আবেশ লাভ করে। প্রথম দুটি চরণ পরীক্ষা করা যাক: ‘দুর্গম গিরি, কান্তার-মরু, দুস্তর পারাবার / লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি-নিশীথে, যাত্রীরা হুঁশিয়ার!’ যুক্তব্যঞ্জন তথা হলন্ত উচ্চারণে ঋদ্ধ বিশেষণ তিনটি পরিচিত উপাদানগুলোতে খানিকটা দূরাগত আবহ সঞ্চার করে। তাতে খেলে যায় একাধিক মধ্যমিলের ঢেউ। সাথে যুক্ত হয় ‘র’ ধ্বনির অনুপ্রাস। দ্বিতীয় চরণে তিনটি বৈশিষ্ট্যই কমবেশি অক্ষুণ্ন থাকে। হলন্ত উচ্চারণের পাটাতনে দাঁড়িয়ে সাংগীতিক গতির মূর্ছনা চরণ দুটিকে এমন এক অমোঘতা দেয়, যেখানে সামষ্টিক উচ্চারণের কোরাসে এক মহাযাত্রার পুনরাবৃত্ত ধ্রুবপদ হিসেবে এর ন্যায্যতা সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।
জাতীয়তাবাদী অভীপ্সা ও মুক্তির বার্তা
কবিতাটির পটভূমিতে নিঃসন্দেহে এক জাতীয়তাবাদী অভীপ্সা কাজ করে গেছে। ‘জাতীয়তাবাদী’ শব্দের নির্দিষ্টতা এড়াতে চাইলে আমরা ‘রাজনৈতিক স্বাধীনতা’ কথাটাও ব্যবহার করতে পারি। স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল পলাশীর প্রান্তরে। রক্তদানের দুরূহ যাত্রায় স্বাধীনতার লাল সূর্য আবার উদয়পথে আবির্ভূত হবে—এ–ই কবির অভিপ্রায়। কিন্তু নজরুলের ক্ষেত্রে যেমনটি হয়, এখানেও তা–ই হয়েছে। আলংকারিক স্বাধীনতা কখনোই তাঁর উচ্চারণে প্রাধান্য পায়নি। তিনি জুড়ে দিয়েছেন অতি জরুরি ও কাঙ্ক্ষিত মুক্তির বার্তা। আরও ভালো হয় বললে, স্থান ও কালের বিশেষ সন্ধিস্থলে উজ্জীবিত জনতাকে স্বাধীনতার ছলে মুক্তির বার্তায় শামিল করানোই তাঁর প্রকল্প।
এখানে জনমানুষের চৈতন্য, সক্রিয়তা ও নেতৃত্বের সঙ্গে তাদের সম্পর্ককে ঘিরে এক দার্শনিক প্রশ্ন সামনে চলে আসে। প্রশ্ন জাগে, এ কান্ডারি কে? কী তার গুণ, যার ভিত্তিতে কেউ একজন হয়ে উঠতে পারে পথপ্রদর্শক আর অন্যরা মুক্তিপিয়াসী কিন্তু নিষ্ক্রিয় অনুসারী? আমাদের কালে একক সত্যের ধারণাটি এতটাই বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে যে কোনো নির্দিষ্ট সত্যের ধারক হিসেবে ব্যক্তি বা ব্যক্তিগণকে মুক্তির দিশারি হিসেবে সাব্যস্ত করা খুব কঠিন হয়ে উঠেছে। শতবর্ষ আগে এ প্রশ্ন এত গুরুত্বপূর্ণ কিছু ছিল না। নজরুলও জনতার সঙ্গে কান্ডারির সম্পর্ক বিষয়ে কোনো জটিল অনুসন্ধানে ব্যাপৃত হননি বলেই মনে হয়। কিন্তু জনলিপ্ততা তাঁর এমনই সহজাত ছিল, প্রস্তাবিত নেতৃত্বের গুণ ও কর্মসূচিতে জনমানুষ এতটাই অনিবার্য ছিল যে ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতায় তিনি নেতৃত্বকে প্রায় সাধারণের কাতারে নামিয়ে আনতে পেরেছেন।
নেতৃত্বের গুণ ও আত্মদানের প্রস্তুতি
ব্যাপারটির তাৎপর্য বোঝার জন্য আমরা আরেকবার ফররুখ আহমদের প্রকল্পের শরণ নিতে পারি। দেখা যাচ্ছে, ফররুখের কবিতায় নেতৃত্বের সঙ্গে আমজনতার ফারাকটা নির্ণয় করেছে কেবল মুক্তির বাসনা নয়; বরং আদর্শিক সাফল্যের পূর্বতন নজির ও তার অনুসরণ। অন্যদিকে নজরুলের নেতার দুই প্রধান গুণ—নেতৃত্বের জন্য এগিয়ে আসার হিম্মত আর আত্মদানের প্রস্তুতি। ‘কে আছ জোয়ান হও আগুয়ান, হাঁকিছে ভবিষ্যৎ’—এ চরণের প্রস্তাব জনমানুষের মধ্য থেকে নেতার আবির্ভাবের পরিষ্কার ঘোষণাপত্র। কেবল ভবিষ্যৎ দেখতে পাওয়ার গুণই তার জন্য যথেষ্ট। নজরুলের এই দার্শনিক অবস্থানের বিশদ পরিচয় পাওয়া যায় বিখ্যাত ‘আমি সৈনিক’ রচনায়। বোঝা যায়, এটা কোনো আকস্মিক উচ্চারণ নয়। তদুপরি, নেতা, সৈনিক আর উজ্জীবিত জনতা যে একাকার হয়ে এখানে ক্রিয়া করছে, তার পরিষ্কার চিহ্ন আছে কবিতার শেষ স্তবকে, যেখানে খোদ কান্ডারিকেই প্রাণদানের মন্ত্রণা দেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক চৈতন্যের বনিয়াদে গড়া শিল্পকর্ম
এভাবে ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ গড়ে ওঠে পরিচ্ছন্ন রাজনৈতিক চৈতন্যের বনিয়াদে। দেশ-কালের বিশেষ পরিস্থিতি মোকাবিলা করে সে আয় করে নেয় তেজোদ্দীপ্ত উচ্চারণভঙ্গি। তৎসম শব্দ, স্বর ও ব্যঞ্জনের সুরেলা বিন্যাস আর সামষ্টিক জনতার কোরাসসম উচ্চারণে নিষ্পন্ন হয় তার নান্দনিক বিশিষ্টতা। উত্থিত জনতার লিপ্ত আবেশে গড়া যুগের সবল অভিব্যক্তি থেকে সে শুষে নেয় মুক্তির প্রকল্প। যুগসত্য থেকে ছেনে নেওয়া বলেই মুক্তির এ বার্তা এত তীব্র, কার্যকর আর সামঞ্জস্যপূর্ণ।
যেসব রাজনৈতিক চৈতন্যের স্ফুট বা অস্ফুট আবহে কবিতাটি সম্ভবপর হয়ে উঠেছে, তার আরেকটি উদাহরণ দেওয়া যাক। কান্ডারির কর্তব্য সম্পর্কে এক জায়গায় বলা হয়েছে: ‘ফেনাইয়া উঠে বঞ্চিত বুকে পুঞ্জিত অভিমান, / ইহাদের পথে নিতে হবে সাথে, দিতে হবে অধিকার।।’ শেষের পঙ্ক্তির ‘অধিকার’ শব্দটি এখানে বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষক। সহানুভূতি বা উদ্ধার প্রকল্প থেকে এ উচ্চারণ বেশ কতকটা দূরবর্তী। কৃষক ও শ্রমিক প্রসঙ্গে অসামান্য সব উচ্চারণে নজরুল শ্রমকে যেভাবে তাবৎ উৎপাদনের উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন, এখানকার ‘অধিকার’ শব্দটি তারই সগোত্র।
শতবর্ষে এসে নিশ্চিন্তে বলা যায়, বাংলাভাষীরা আরও বহুকাল ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ নিত্য বর্তমান শিল্পকর্ম হিসেবে ব্যবহার ও ভোগ করতে থাকবে।



