জিয়ানজিয়াকোমো ফেলত্রিনেল্লি: পুঁজিবাদের চূড়ায় বসে যিনি গেয়েছিলেন 'সাম্যের গান'
জিয়ানজিয়াকোমো ফেলত্রিনেল্লি: প্রকাশক থেকে গেরিলা যোদ্ধা

বিংশ শতাব্দীর ইউরোপীয় ইতিহাস নানা বৈপরীত্য, আদর্শিক সংঘাত ও নাটকীয়তায় পূর্ণ। সেই ইতিহাসের পাতায় জিয়ানজিয়াকোমো ফেলত্রিনেল্লির (১৯ জুন ১৯২৬—১৪ মার্চ ১৯৭২) মতো দ্বিতীয় চরিত্রের দেখা মেলা ভার। তিনি ছিলেন একাধারে ইউরোপের অন্যতম শীর্ষ ধনাঢ্য ব্যক্তি, বিশ্বসাহিত্যকে বদলে দেওয়া একজন দূরদর্শী প্রকাশক এবং জীবনের শেষভাগে রাষ্ট্রব্যবস্থা আমূল বদলে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষায় অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়া একজন গেরিলা যোদ্ধা।

জন্ম ও পারিবারিক পটভূমি

ইতালির মিলানের এক প্রভাবশালী ও ধনাঢ্য পরিবারে ফেলত্রিনেল্লির জন্ম। বাবা ছিলেন দেশটির শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকার এবং বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রক। ফলে ফেলত্রিনেল্লি বিপুল প্রাচুর্যের মধ্যে বেড়ে ওঠেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর উত্তরাধিকার সূত্রে তিনি যে অঢেল সম্পত্তির মালিক হন, তা তাঁকে তৎকালীন ইতালির অন্যতম ধনী ব্যক্তির কাতারে শামিল করে। কিন্তু আদর্শের টানে, এই কোটিপতি তরুণই পরবর্তী জীবনে সেই সমাজব্যবস্থার ভিত কাঁপিয়ে দেওয়ার ব্রত নেন; হাতে তুলে নেন অস্ত্র।

প্রকাশনা জগতে বিপ্লব

ফেলত্রিনেল্লি, বলা যায়, প্রকাশনা জগতেও ‘বিপ্লব’ ঘটিয়েছেন। ১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন তাঁর বিখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা ‘ফেলত্রিনেল্লি এদিতোরে’ (Feltrinelli Editore)। প্রচলিত ব্যবসার বাইরে গিয়ে তিনি এটিকে প্রগতিশীল, বৈপ্লবিক ও আন্তর্জাতিক সাহিত্যের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত করার চেষ্টা করেছিলেন। প্রকাশক হিসেবে ফেলত্রিনেল্লি বিশ্বসাহিত্যকে দুটি অমূল্য উপহার দিয়েছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ডক্টর জিভাগো

এক—ডক্টর জিভাগো (Doctor Zhivago)। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নে নিষিদ্ধ থাকা লেখক বরিস পাস্তেরনাকের এই মাস্টারপিস উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি ফেলত্রিনেল্লির হাতে পৌঁছায়। ১৯৫৭ সালে বইটি প্রকাশের পর তোলপাড় শুরু হয় বিশ্বজুড়ে। অনেকের মতে, উপন্যাসটি আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও ঠান্ডা যুদ্ধের সমীকরণকেও প্রভাবিত করেছিল। এর পরের বছরই কালজয়ী এই উপন্যাসের জন্য পাস্তেরনাক নোবেল পুরস্কার পান। যদিও তৎকালীন সোভিয়েত সরকারের তীব্র রাজনৈতিক চাপের মুখে তিনি শেষ পর্যন্ত পুরস্কারটি প্রত্যাখ্যান করতে বাধ্য হয়েছিলেন।

চিতাবাঘ

দুই—চিতাবাঘ (The Leopard/Il Gattopardo)। জুসেপ্পে তোমাসি দি লাম্পেদুসার (Giuseppe Tomasi di Lampedusa) এই মহাকাব্যিক উপন্যাস ইতালির অন্য সব নামী প্রকাশক প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, কিন্তু ফেলত্রিনেল্লি ঠিকই অনুধাবন করেন এর সাহিত্যমূল্য। বইটি তিনি প্রকাশ করেন। বলাই বাহুল্য, চিতাবাঘ এখন আধুনিক ইতালীয় সাহিত্যের অন্যতম সেরা উপন্যাস হিসেবে স্বীকৃত।

কিউবা ও চে গুয়েভারার সঙ্গে সম্পর্ক

ফেলত্রিনেল্লি তাই কেবল সমাজতন্ত্রের তত্ত্বে সীমাবদ্ধ ছিলেন না; বিশ্বজুড়ে চলমান সব মুক্তিকামী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হতে চেয়েছিলেন। সেই সূত্রে তিনি কিউবা ভ্রমণ করেন। ফিদেল কাস্ত্রো ও চে গুয়েভারার সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। ১৯৬৭ সালে চে গুয়েভারার মৃত্যুর পর, আলবার্তো কোর্দার তোলা চে-র সেই ঐতিহাসিক ছবির (Guerrillero Heroico) স্বত্ব ফেলত্রিনেল্লি নিজের দূরদর্শিতায় সংগ্রহ করেন। ছবিটির লাখ লাখ পোস্টার বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেন। আজকের দিনে চে–কে দেখা হয় বিদ্রোহ ও তারুণ্যের প্রতীক হিসেবে, এর পেছনে ফেলত্রিনেল্লির ভূমিকাও কিন্তু কম নয়।

অস্ত্র হাতে বিপ্লবী পথে

তবে ফেলত্রিনেল্লির জীবন কেবল বইয়ের জগতে সীমাবদ্ধ ছিল না। ষাটের দশকের শেষ দিকে ইউরোপজুড়ে যখন ছাত্র আন্দোলন, ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী প্রতিবাদ এবং বিপ্লবী রাজনীতির উত্থান ঘটছে, তখন ফেলত্রিনেল্লি আরও সক্রিয়ভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। তিনি কিউবার বিপ্লবের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন, লাতিন আমেরিকার গেরিলা আন্দোলন নিয়ে আগ্রহী ছিলেন এবং নিজেও ইতালিতে বিপ্লবী পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেন। বিলাসী জীবন, প্রকাশকের পরিচয়, খ্যাতি—সব ত্যাগ করে তিনি আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যান। ছদ্মনাম ও ছদ্মবেশ ধারণ করে তিনি হয়ে ওঠেন রাষ্ট্রের ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ তালিকার অন্যতম শীর্ষ ব্যক্তি।

গ্যাপ গঠন ও সশস্ত্র সংগ্রাম

১৯৬০-এর দশকের শেষের দিকে ইতালির রাজনীতিতে চরম অস্থিরতা শুরু হয়, যা ইতিহাসে ‘সীসার বছর’ (Years of Lead) নামে পরিচিত। ডানপন্থী সহিংসতা ও রাষ্ট্রীয় ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থানের আশঙ্কায় ফেলত্রিনেল্লি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে ইতালিতে নব্য-ফ্যাসিবাদী অভ্যুত্থান অনিবার্য। এই ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ১৯৭০ সালে নিজেই গঠন করেন সশস্ত্র বামপন্থী গেরিলা সংগঠন—গ্যাপ (গ্রুপ্পি দি আজিওনে পার্তিজিয়ানা) [GAP (Gruppi di Azione Partigiana)]।

বিতর্কিত মৃত্যু

১৯৭২ সালের ১৫ মার্চ মিলানের অদূরে সেগ্রাতে এলাকার একটি বিদ্যুতের পিলারের নিচে ফেলত্রিনেল্লির ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সরকারি তদন্ত ও পুলিশের দাবি অনুযায়ী, আগের দিন বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ধ্বংস করার জন্য বোমা বাঁধার সময় অসাবধানতাবশত বিস্ফোরণে তাঁর মৃত্যু ঘটে। তবে তাঁর সহযোদ্ধা ও সমসাময়িক বহু বুদ্ধিজীবীর মতে, এটি ছিল ইতালীয় গোপন সংস্থা বা ডানপন্থীদের দ্বারা সংঘটিত পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।

উত্তরাধিকার

ফেলত্রিনেল্লির শততম জন্মবার্ষিকীতেও তাই ইতালির সংস্কৃতি ও প্রকাশনা জগতে তাঁর নাম সমান উজ্জ্বল। তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রকাশনী এবং বইয়ের চেইন শপ ‘লিবরেরিয়ে ফেলত্রিনেল্লি’ (Librerie Feltrinelli) ইতালির অন্যতম বৃহত্তম এবং সফল ‘বইয়ের সাম্রাজ্য’ হিসেবে টিকে রয়েছে। ফেলত্রিনেল্লি চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন এমন একজন মানুষ হিসেবে, যিনি পুঁজিবাদের চূড়ায় বসেও গেয়েছিলেন ‘সাম্যের গান’।

মাত্র ৪৬ বছর বেঁচে ছিলেন তিনি। তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে বই কখনো কখনো শুধু ‘বই’ নয়। একটি পাণ্ডুলিপি রাষ্ট্রকে অস্বস্তিতে ফেলতে পারে, একটি প্রকাশনা রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে, একজন প্রকাশক ইতিহাসের গতিপথেও প্রভাব ফেলতে পারেন। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, লেখক যেমন ইতিহাস তৈরি করেন, কখনো কখনো প্রকাশকও ইতিহাসের নেপথ্য নায়ক হয়ে ওঠেন। প্রকাশনার ইতিহাসে এমন উদাহরণ খুব বেশি নেই।