জর্জ অরওয়েলের ১০ সেরা বই: অ্যানিমেল ফার্ম থেকে নাইনটিন এইটি-ফোর
জর্জ অরওয়েলের ১০ সেরা বই: অ্যানিমেল ফার্ম থেকে নাইনটিন এইটি-ফোর

ব্রিটিশ সাহিত্যের অন্যতম প্রভাবশালী লেখক জর্জ অরওয়েলের ১০ সেরা বইয়ের তালিকা প্রকাশ করেছে দ্য গার্ডিয়ান। তার লেখা 'অ্যানিমেল ফার্ম' ও 'নাইনটিন এইটি-ফোর' বিশ্বসাহিত্যের অমর সম্পদ। নিচে দেওয়া হলো তালিকাটি:

১০. আ ক্লার্জিম্যানস ডটার (১৯৩৫)

কল্পনাশক্তি জর্জ অরওয়েলের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল না। তার প্রায় সব উপন্যাসের প্রধান চরিত্র যেন তারই প্রতিচ্ছবি। তিনি নিজে যা করেছেন, তারাও এমনটা করে। এমন জায়গায় থাকে, যেখানে তিনি নিজেও ছিলেন। তবে 'আ ক্লার্জিম্যানস ডটার' উপন্যাসে সেই চরিত্রটি নাম ডরোথি হেয়ার। একজন নিপীড়িত তরুণী। একসময় সে তার স্মৃতি, পরিচয় ও ধর্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। অরওয়েল নিজেই এই বইটিকে 'নিরেট আবর্জনা' বলেছিলেন। তবে একটি অধ্যায়কে তিনি ব্যতিক্রম মনে করতেন। সেখানে গৃহহীন ডরোথি ট্রাফালগার স্কোয়ারে রাত কাটানোর স্বপ্নময় ও বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়। এই অংশে তরুণ অরওয়েলের ওপর জেমস জয়েসের প্রভাব স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।

বিখ্যাত লাইন: 'পৃথিবীতে এমনিতেই যথেষ্ট অশুভ আছে; তা খুঁজে বেড়ানোর কোনো দরকার নেই।'

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

৯. বার্মিজ ডেজ (১৯৩৪)

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে না গিয়ে জর্জ অরওয়েল বার্মায় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক পুলিশের চাকরিতে যোগ দেন। পরে সেই অভিজ্ঞতা এবং সাম্রাজ্যবাদের অংশ হয়ে থাকার অপরাধবোধ থেকে মুক্তি পেতেই যেন তিনি এই উপন্যাসটি লেখেন। গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন ক্লান্ত ও হতাশ কাঠ ব্যবসায়ী জন ফ্লোরি। তার জীবনকে ঘিরে দুর্নীতি, অপরাধবোধ ও নৈতিক সংকটের এক ভারী পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ভাষা অরওয়েলের পরবর্তী বইগুলোর তুলনায় কিছুটা বেশি অলংকারপূর্ণ। তবে এখানেই প্রথম দেখা যায় তাঁর পরিচিত চরিত্রদের—এমন মানুষ, যারা ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ে, নিজেকেই ঘৃণা করে এবং এমন এক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করে, যাকে তারা আর মেনে নিতে পারে না, যদিও শেষ পর্যন্ত সেই লড়াই ব্যর্থ হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিখ্যাত লাইন: 'নিজের প্রকৃত জীবনকে গোপন রেখে বাঁচা মানুষকে কলুষিত করে। জীবনের স্রোতের সঙ্গে চলাই উচিত, তার বিপরীতে নয়।'

৮. কামিং আপ ফর এয়ার (১৯৩৯)

এই উপন্যাস লেখার সময় জর্জ অরওয়েল শান্তিবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। তবে তিনি ফ্যাসিবাদের বিরোধী ছিলেন না, এমন নয়। তার আশঙ্কা ছিল, যুদ্ধের পরিস্থিতি ব্রিটেনকেই ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারে। উপন্যাসের প্রধান চরিত্র জর্জ বোলিং একজন মধ্যবয়সি বীমা বিক্রয়কর্মী, যার রাজনীতিতে বিশেষ আগ্রহ নেই। বহু বছর পর তিনি নিজের শৈশবের শহরে ফিরে গিয়ে দেখেন, আধুনিকতার ছোঁয়ায় তার চেনা পৃথিবী ও স্মৃতিগুলো বদলে গেছে। মরক্কোতে অসুস্থতা থেকে সেরে ওঠার সময় ইংল্যান্ডের জন্য গভীর অনুভব থেকেই অরওয়েল এই উপন্যাসটি লেখেন। উপন্যাসের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো, যখন তিনি চরিত্রদের ভুলে গিয়ে নিজের ভাবনা ও ক্ষোভ সরাসরি প্রকাশ করতে থাকেন।

বিখ্যাত লাইন: 'মাছ ধরা যুদ্ধের সম্পূর্ণ বিপরীত।'

৭. দ্য রোড টু উইগান পিয়ার (১৯৩৭)

ভিক্টর গোলান্‌জ তার লেফট বুক ক্লাব থেকে বইটি প্রকাশ করার সময় দ্বিতীয় অংশ নিয়ে পাঠকদের কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন। কারণ বইটি পড়ার সময় মনে হয় না একই বই পড়ছি। প্রথম অংশে উত্তর ইংল্যান্ডের শ্রমজীবী মানুষের জীবন অরওয়েল অসাধারণ পর্যবেক্ষণশক্তি ও গভীর সহমর্মিতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন। দ্বিতীয় অংশে তিনি এমন এক সমাজতন্ত্রের পক্ষে যুক্তি দেন, যা হবে উদ্ভট, যন্ত্রপূজা ও সোভিয়েত রাশিয়াকে অন্ধভাবে অনুসরণের প্রবণতা থেকে মুক্ত। এ সময় তিনি সমকালীন সমাজতন্ত্রীদেরও তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ করেছেন। সেই মন্তব্যগুলো যেমন মজার, তেমনি অনেক ক্ষেত্রে বেশ নির্মম। সময় পেরিয়ে গেলেও বইটির প্রথম অংশ আজও সমান প্রাসঙ্গিক ও শক্তিশালী।

বিখ্যাত লাইন: 'আমরা সারাজীবন ইংল্যান্ডের সমালোচনা করি, কিন্তু কোনো বিদেশি একই কথা বললে ভীষণ রেগে যাই।'

৬. ডাউন অ্যান্ড আউট ইন প্যারিস অ্যান্ড লন্ডন (১৯৩৩)

এরিক ব্লেয়ার প্রথমবারের মতো এই বইয়ের প্রচ্ছদে 'জর্জ অরওয়েল' নামটি ব্যবহার করেন। তার আশঙ্কা ছিল, প্যারিসে বাসন মাজার কাজ ও ইংল্যান্ডে ভবঘুরে জীবন নিয়ে লেখা এই স্মৃতিকথা তার মধ্যবিত্ত পরিবারকে বিব্রত করতে পারে। দারিদ্র্যের জীবন তিনি কেবল বাধ্য হয়ে বেছে নেননি। নিজেকে নতুনভাবে চিনতে ও লেখার উপাদান সংগ্রহ করাও ছিল তার প্রধান উদ্দেশ্য। বইটির প্যারিস অংশ লন্ডনের অংশের তুলনায় বেশি শক্তিশালী হলেও এখানেই প্রথম স্পষ্ট হয়ে ওঠে অরওয়েলের সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণশক্তি, ট্র্যাজিক-কমিক দৃষ্টিভঙ্গি ও সমাজের প্রান্তিক মানুষের প্রতি তার গভীর সহমর্মিতা।

বিখ্যাত লাইন: 'ক্ষুধার্ত দেখানো মারাত্মক ভুল। এতে মানুষের তোমাকে লাথি মারতে ইচ্ছে করে।'

৫. কিপ দ্য অ্যাসপিডিস্ট্রা ফ্লাইং (১৯৩৬)

গর্ডন কমস্টক অরওয়েলের অন্যতম স্মরণীয় ও হাস্যরসাত্মক চরিত্র। তিনি একজন কবি, যিনি অর্থকে একই সঙ্গে ঘৃণা করেন আবার তার ওপর নির্ভরও করেন। এই দ্বন্দ্বই তাকে ধীরে ধীরে অস্থির ও অসহায় করে তোলে। অরওয়েল বলেছিলেন, আর্থিক সংকটে পড়েই তিনি এই উপন্যাস লিখেছিলেন। কিন্তু সেই মন্তব্য বইটির আসল শক্তিকে পুরোপুরি তুলে ধরে না। এতে রয়েছে প্রাণবন্ত ব্যঙ্গ, তীব্র ক্ষোভ ও ১৯৩০-এর দশকের পুঁজিবাদী সমাজের কড়া সমালোচনা। জর্জ গিসিংয়ের প্রভাবও স্পষ্ট। কমস্টককে জন অসবোর্নের জিমি পোর্টার কিংবা কিংসলে অ্যামিসের জিম ডিক্সনের পূর্বসূরি বলা যায়। একই সঙ্গে তিনি অরওয়েলের নিজের ব্যর্থতার ভয়েরও প্রতীক।

বিখ্যাত লাইন: 'টাকা না থাকলে কোনো মেয়ের কাছে আকর্ষণীয় হওয়া যায় কীভাবে?'

৪. দ্য পেঙ্গুইন এসেজ অব জর্জ অরওয়েল (১৯৮৪)

অরওয়েলের লেখালেখির বড় অংশই ছিল পত্রপত্রিকার জন্য লেখা প্রবন্ধ ও সাংবাদিকতা। তাই তার রচনার কোনো একক বা চূড়ান্ত সংকলন নেই। তবে এই বইটি তার লেখার বিস্তৃতি ও বৈচিত্র্য বোঝার জন্য অন্যতম সেরা সংগ্রহ। এখানে রাজনৈতিক প্রবন্ধ (Antisemitism in Britain), আত্মজৈবনিক রচনা (Shooting an Elephant), সংস্কৃতিবিষয়ক বিশ্লেষণ (Boys' Weeklies), হাস্যরসাত্মক লেখা (Confessions of a Book Reviewer), প্রকৃতিচিন্তা (Some Thoughts on the Common Toad), সাহিত্যসমালোচনা (Charles Dickens) এবং শিল্পী ও শিল্পকে আলাদা করে দেখার প্রশ্ন নিয়ে লেখা (Benefit of Clergy: Some Notes on Salvador Dalí)—সবই স্থান পেয়েছে।

বিখ্যাত লাইন: 'সত্য কথাটি যখন শত্রু উচ্চারণ করে, তখন সেটিকেও অসত্য বলে মনে হয়।'

৩. হোমেজ টু কাতালোনিয়া (১৯৩৮)

অরওয়েলের সেরা তিনটি বইয়ের পেছনে রয়েছে স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধে কাটানো ছয় মাসের অভিজ্ঞতা। সেখানে তিনি একটি ছোট মার্কসবাদী মিলিশিয়ায় লড়াই করেছিলেন। স্তালিনপন্থী কমিউনিস্ট ও ফ্রাঙ্কোর ফ্যাসিস্টদের মধ্যে কতটা মিল রয়েছে—তিনি তা কাছ থেকে দেখেছিলেন। যদিও সে কথা তখন অনেকেই স্বীকার করতে চাইতেন না। 'হোমেজ টু কাতালোনিয়া' যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক অন্তর্দৃষ্টির অনন্য উদাহরণ। এতে আছে যুদ্ধের নোংরা বাস্তবতা, মিথ্যার বিস্তার ও স্ত্রী আইলিনকে নিয়ে স্তালিনপন্থীদের হাত থেকে অল্পের জন্য পালিয়ে বাঁচার কাহিনি। অস্বস্তিকর সত্য প্রকাশে অরওয়েলের সাহস ও সততার সবচেয়ে শক্তিশালী উদাহরণ এই বই।

বিখ্যাত লাইন: 'গুলিবিদ্ধ হওয়ার পুরো অভিজ্ঞতাই অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং আমি মনে করি এটি বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা উচিত।'

২. নাইনটিন এইটি-ফোর (১৯৪৯)

এই উপন্যাসের প্রথম খসড়া তৈরি হয় ১৯৪৩ সালে, এর মূল ধারণাগুলো অরওয়েল আগে থেকেই নানা প্রবন্ধে তুলে ধরেছিলেন। শেষ উপন্যাসটি যেন তার সমগ্র সাহিত্যজীবনের সারাংশ। তিনি স্বাধীনতা, সত্য ও মানবিকতার পক্ষে দাঁড় করিয়েছেন ক্ষমতা, মিথ্যা ও নিপীড়নকে। ইয়েভগেনি জামিয়াতিন ও অলডাস হাক্সলির প্রতি যথাযথ সম্মান রেখেই বলা যায়, এটি ডিস্টোপিয়ান সাহিত্যের সবচেয়ে পরিপূর্ণ উদাহরণগুলোর একটি। রাজনৈতিক ব্যঙ্গ ও দর্শনের সঙ্গে এখানে মিলেছে গুপ্তচরকাহিনি ও প্রেমের গল্পের উত্তেজনা। বইটির প্রভাব এতটাই ব্যাপক যে অনেক সময় এর স্বপ্নময় ও অস্বস্তিকর আবহ চোখ এড়িয়ে যায়। উইনস্টন স্মিথের বিগ ব্রাদারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এমন এক জগতে ঘটে, যেখানে বাস্তবতা প্রতিনিয়ত বদলে যায় ও সত্য ক্রমাগত হাতছাড়া হয়ে যায়।

বিখ্যাত লাইন: 'তোমার নিজের বলে যা কিছু ছিল, তা কেবল তোমার মাথার ভেতরের কয়েক ঘন সেন্টিমিটার জায়গা।'

১. এ্যানিমেল ফার্ম (১৯৪৫)

স্ত্রী আইলিনের সম্পাদনা ও পরামর্শে জর্জ অরওয়েল এই উপন্যাসটি লিখেছিলেন। অনেকের মতে, অ্যানিমাল ফার্মই তার সবচেয়ে নিখুঁত সাহিত্যকর্ম। তবে সোভিয়েত ইউনিয়নের তীব্র সমালোচনা থাকায় বইটি রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর বলে মনে করা হয়েছিল এবং একসময় এর প্রকাশও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। 'একটি রূপকথা' উপশিরোনামযুক্ত এই ছোট উপন্যাসটি আসলে সোভিয়েত বিপ্লব থেকে স্বৈরতন্ত্রে রূপ নেওয়ার ইতিহাসের একটি শক্তিশালী রূপক। কিন্তু বইটির আবেদন শুধু রাজনৈতিক পাঠকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ক্রনস্টাড্ট বিদ্রোহ বা আলেকজান্ডার কেরেনস্কির ইতিহাস না জানলেও একজন কিশোর পাঠকও এর গল্পে মুগ্ধ হতে পারে। হাস্যরস, বেদনা কিংবা চমক—যে পরিস্থিতিই আসুক না কেন, অরওয়েলের সংযত, সহজ ও স্বচ্ছ ভাষা কখনো তার শক্তি হারায় না। 'এ্যানিমেল ফার্ম'-কে 'নাইনটিন এইটি-ফোর'-এর পূর্বসূরিও বলা যায়, কারণ ভাষার বিকৃতি, স্মৃতির নিয়ন্ত্রণ এবং বিপ্লবী আদর্শের অপব্যবহার—এই দুই বইয়েরই কেন্দ্রীয় বিষয়। ১৯৭১ সালে প্রথম প্রকাশিত বইটির অপ্রকাশিত ভূমিকাটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে এক শক্তিশালী ঘোষণা হিসেবে আজও সমান প্রাসঙ্গিক।

বিখ্যাত লাইন: 'আর এটাও মনে রেখো, মানুষের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে আমরা যেন নিজেরাও মানুষের মতোই হয়ে না যাই।'

মূল: ডরিয়ান লিনস্কি, দ্য গার্ডিয়ান।