কলকাতার শিল্পী চন্দ্র ভট্টাচার্যের একক শিল্পকর্ম প্রদর্শনী ‘সাক্ষী ও কল্পনার মাঝে’ শুরু হয়েছে রাজধানীর উত্তরার গ্যালারি কায়ায়। প্রদর্শনীটি উদ্বোধন করেন স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইনামুল হক।
প্রদর্শনীর উদ্বোধন ও বক্তব্য
গতকাল শুক্রবার ঘনঘোর মেঘের সন্ধ্যায় প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন ইনামুল হক। তিনি বলেন, সামাজিক দায়িত্ববোধ থেকে তারা শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশে সহায়তা করে থাকেন।
গ্যালারি কায়ার পরিচালক শিল্পী গৌতম চক্রবর্তী চন্দ্র ভট্টাচার্যের কাজ সম্পর্কে বলেন, ‘জলরং বলতে সাধারণত যে ধারার ছবি দেখতে আমরা অভ্যস্ত, তাঁর কাজ এর অন্য প্রান্তে। সময়, সমাজ, পৃথিবী এসব সম্পর্কে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যে চিন্তার স্রোত আমাদের মাথায় প্রবাহিত হয়, সেখান থেকে উপাত্ত নিয়ে নিজস্ব রীতিতে নান্দনিক দৃশ্যকল্প চন্দ্র ভট্টাচার্য তাঁর ছবিতে উপস্থাপন করেছেন।’
শিল্পীর বক্তব্য ও কাজের বৈশিষ্ট্য
শিল্পী চন্দ্র ভট্টাচার্য বলেন, আগেও ঢাকায় একাধিক যৌথ প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন। এবার প্রথম একক প্রদর্শনী করতে পেরে খুবই আনন্দিত। নিজের কাজ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমার কাজের ধরনটাই এমন যে এ নিয়ে বিশেষ ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন পড়ে না। বর্তমানে শিল্পকলার সঙ্গে বাণিজ্যিক বিষয় নিবিড়ভাবে জড়িয়ে গেছে। ভোগবাদী প্রবণতা প্রবল হচ্ছে। প্রকৃতিকে ধ্বংস করা হচ্ছে। সমাজের নিচতলার মানুষের দিকে তাকানোর অবকাশ ও ইচ্ছা নেই। সে কারণে এমন বড় আকারে আমি তাঁদের ছবি এঁকেছি যেন ঘাড় উঁচু করে সেই ছবি দেখতে হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘শিল্পের ভাষা, প্রকাশভঙ্গি এসবেরও পরিবর্তন এসেছে। বিষয়বস্তুকে এমন করে দেখানো যায়, যা দর্শককে ভাবিত করে, নাড়া দেয়। আমি আমার ছবিতে সেই চেষ্টাই করেছি।’
প্রদর্শনীর শিল্পকর্ম
এই প্রদর্শনীতে শিল্পীর সাম্প্রতিক কালের ৩২টি শিল্পকর্ম রয়েছে। এর মধ্যে বিশাল আকারের চারটি অবয়বধর্মী কাজ আছে চারকোলে আঁকা। ছবির বিষয়বস্তুর মধ্যে রয়েছে প্রান্তিক মানুষের ফুটপাতে কাত হয়ে শুয়ে থাকা, দুই হাতে পোঁটলা নিয়ে হেঁটে চলা, টুকিটাকি জিনিসপত্র নিয়ে পোঁটলা ভরা ইত্যাদি।
অন্য কাজগুলো জলরঙের। বাস্তব অঙ্কন রীতির ছবি। পাখিকে পাখি, গাছপালাকে তাদের মতো করেই সহজে চেনা যায়। বনের দৃশ্য আছে। গাছগাছালির ডালপালা ভেঙে মাটিতে পড়ে আছে। পাতা ঝরে যাচ্ছে। অধিকাংশ শাখা নিষ্পত্র। কোনো কোনোতে দু-একটি বক বসে বসে ঝিমোচ্ছে।
রঙ ও কৌশল
বড় আকারের কাজগুলোতে ধূসর বা ছায়াময় নেপথ্যের সঙ্গে উজ্জ্বল কমলা ও হলুদ রঙের বিন্দু-বৃত্ত–রেখা আলো-আঁধারির দ্বন্দ্বকে আরও তীব্র ও তির্যক করে তুলেছে। সৃষ্টি করেছে কাব্যিক ব্যঞ্জনা। ছোট আকারের ছবিগুলোতে মূলত সাদাকালোরই প্রাধান্য। এখানেও সেই ঘনিয়ে আসা আঁধারির মধ্য আলোর ঝলকানি। মেঘের কোলে রোদের উদ্ভাস। রাতের বনে টর্চের আলো ফেললে যেমন রহস্যময়তা সৃষ্টি হয়, বন্য প্রাণীদের আবছা অবয়ব, গাছের ডালপালার ভেতর জমে থাকা অন্ধকার আর মাটিতে তাদের ছায়া মিলিয়ে যেমন গা ছমছম করা রহস্যময়তা সৃষ্টি হয়, এমন দৃশ্যও আছে অনেকগুলো।
দর্শকের অভিজ্ঞতা
দর্শকেরা বিশেষ যে অভিজ্ঞতা পাবেন, তা হলো যেমনটা গৌতম চক্রবর্তী বলেছেন, সেই অন্য রকম জলরং দেখার আনন্দ। এই কাজগুলো যে জলরঙের, নিচে তা লেখা না থাকলে বুঝে ওঠাই কঠিন। মনে হয় যেন ছাপচিত্র। কিছু কিছু ছবির বুনট একেবার এচিংয়ের মতো। খুব সরু তুলি দিয়ে গায়ে গায়ে লাগানো হাজার হাজার অতি সূক্ষ্ম রেখা টেনে পুরো দৃশ্যপট সৃষ্টি করা। এই কাজগুলো যে অনেক সময় নিয়ে, অনেক ধৈর্য, শ্রম আর নিষ্ঠার সঙ্গে করা, তা অনায়াসেই দর্শকেরা অনুভব করতে পারবেন। এখানেই শিল্পীর কাজের ধারার স্বাতন্ত্র্য।
প্রদর্শনীর সময়সূচি
প্রদর্শনী চলবে ২১ জুলাই পর্যন্ত। প্রতিদিন বেলা সাড়ে ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দেখতে পাবেন শিল্পকলার অনুরাগী দর্শকেরা।



