কানাডার মর্যাদাপূর্ণ লিও অ্যাওয়ার্ডস ২০২৬-এ বড় সাফল্য অর্জন করেছেন বাংলাদেশি–কানাডীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা ওয়াহিদ ইবনে রেজা। তার পরিচালিত অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র ‘আফটার আস’ এবারের আসরে সেরা অ্যানিমেশন প্রোগ্রাম বিভাগে পুরস্কার জিতেছে। চারটি বিভাগে মনোনয়ন পাওয়া চলচ্চিত্রটি শেষ পর্যন্ত তিনটি বিভাগে বিজয়ী হয়েছে।
লিও অ্যাওয়ার্ডস ২০২৬: ভ্যাঙ্কুভারে দুই দিনের জমকালো আসর
গত ৪ ও ৫ জুলাই কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার ভ্যাঙ্কুভারে দুই দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয় লিও অ্যাওয়ার্ডসের ২০২৬ আসর। ১৯৯৯ সালে যাত্রা শুরু করা এই পুরস্কার ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার চলচ্চিত্র, টেলিভিশন, অ্যানিমেশন ও ডিজিটাল মাধ্যমের সেরা কাজগুলোকে স্বীকৃতি দেয়। বর্তমানে এটি কানাডার অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ আঞ্চলিক চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন পুরস্কার হিসেবে বিবেচিত। এবারের আসরে দেড় হাজারের বেশি জমা পড়া কাজ থেকে বিভিন্ন বিভাগে বিজয়ী নির্বাচন করা হয়।
‘আফটার আস’-এর প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং বিজয়
এবারের প্রতিযোগিতায় ‘আফটার আস’-এর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল ‘লেগো: ডিজনি ফ্রোজেন’, ‘লেগো মার্ভেল অ্যাভেঞ্জার্স’, ‘স্নুপি প্রেজেন্টস’, ‘ডায়েরি অব আ উইম্পি কিড’সহ আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত একাধিক অ্যানিমেশন। পাশাপাশি হলিউড অভিনেতা অ্যান্ডি সার্কিস কণ্ঠ দেওয়া একটি অ্যানিমেটেড স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রও ছিল প্রতিযোগিতায়। এমন শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেও ‘আফটার আস’ সেরা অ্যানিমেশন প্রোগ্রামের পুরস্কার জিতে নেয়। পাশাপাশি চলচ্চিত্রটি সেরা শিল্প নির্দেশনা এবং সেরা শব্দ পরিকল্পনা বিভাগেও পুরস্কার অর্জন করে।
পাঁচ মিনিটের অ্যানিমেশনে মানববিলুপ্তির পরের পৃথিবী
মাত্র ৫ মিনিট ৫ সেকেন্ড দৈর্ঘ্যের কম্পিউটার অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র ‘আফটার আস’ প্রযোজনা করেছে কানাডার ন্যাশনাল ফিল্ম বোর্ড। মানুষের বিলুপ্তির পরের এক পৃথিবীকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই চলচ্চিত্রে দেখা যায়, একটি একাকী নেকড়ে ও একটি উলভারিন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া পৃথিবীতে অন্য জীবিত প্রাণের খোঁজে যাত্রা শুরু করে। উত্তরাঞ্চলের অরোরার আলোর নিচে তাদের সেই অভিযাত্রায় উঠে আসে জলবায়ু সংকট, প্রকৃতির পুনর্জাগরণ, টিকে থাকার সংগ্রাম এবং আশার গল্প।
নির্মাতার প্রতিক্রিয়া: শৈশবের সান্ত্বনা পুরস্কারের স্মৃতি
পুরস্কার জয়ের প্রতিক্রিয়ায় ওয়াহিদ ইবনে রেজা শৈশবের একটি মজার স্মৃতির কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, জীবনে কখনো কোনো পুরস্কার পাননি। একবার পারিবারিক বনভোজনে কোনো খেলায় না জিতলেও তার মা সান্ত্বনা পুরস্কার হিসেবে একটি খেলনা গিটার দিয়েছিলেন। কিন্তু কাজিনদের আপত্তির মুখে সেটিও ফিরিয়ে নিতে হয়েছিল। সেই স্মৃতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “পুরস্কারের কথা মনে হলেই কেন জানি আমার শুধু এই গল্পটাই মনে পড়ে!”
বর্তমান অর্জনের প্রসঙ্গ টেনে ওয়াহিদ ইবনে রেজা বলেন, “কী করে কী করে যেন পৃথিবীর এই প্রান্তে ফিল্ম মেকিং নিয়ে আমি টুকটাক ছোটখাট পুরস্কার পাই। তার ধারাবাহিকতায় এবার লিও অ্যাওয়ার্ডসে আমাদের ফিল্ম ‘আফটার আস’ সেরা অ্যানিমেশন প্রোগ্রামের পুরস্কার জিতে নেয়। আমরা চারটা ক্যাটাগরিতে নমিনেশন পেয়েছিলাম, জিতি তিনটিতে। নিজেকে তাই বলতেই পারি—নট ব্যাড, নট ব্যাড অ্যাট অল!”
ওয়াহিদ ইবনে রেজা: বাংলাদেশি-কানাডীয় নির্মাতার পথচলা
ওয়াহিদ ইবনে রেজা একজন বাংলাদেশি–কানাডীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা, অ্যানিমেশনকর্মী, চিত্রনাট্যকার এবং ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস প্রযোজনা ব্যবস্থাপক। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে যন্ত্রকৌশলে স্নাতক সম্পন্ন করার পর তিনি কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় চলচ্চিত্র নির্মাণ বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নেন। কর্মজীবনে তিনি ‘রিক অ্যান্ড মর্টি’, ‘গেম অব থ্রোনস’, ‘ডক্টর স্ট্রেঞ্জ’, ‘ব্ল্যাক প্যান্থার’, ‘গার্ডিয়ানস অব দ্য গ্যালাক্সি’ এবং ‘হোটেল ট্রান্সিলভানিয়া’-এর মতো আন্তর্জাতিক প্রযোজনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এর আগে তার মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র ‘সারভাইভিং ৭১’ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত হয়েছিল।
বাংলাদেশের অ্যানিমেশন শিল্পের জন্য মাইলফলক
বাংলাদেশি নির্মাতাদের আন্তর্জাতিক অ্যানিমেশন অঙ্গনে উপস্থিতি এখনও সীমিত। সেই বাস্তবতায় লিও অ্যাওয়ার্ডসে ‘আফটার আস’-এর এই সাফল্য শুধু ওয়াহিদ ইবনে রেজার ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বাংলাদেশের সৃজনশীল অ্যানিমেশন শিল্পের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।



