যুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় ইরানের চলচ্চিত্র ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের গভীর সংকট
ইরানের চলচ্চিত্র অঙ্গনে যুদ্ধ ও রাজনৈতিক সংকটের প্রভাব

ইরানের চলচ্চিত্র ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে যুদ্ধ ও রাজনৈতিক সংকটের প্রভাব

চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ইরানের চলচ্চিত্র ও সাংস্কৃতিক অঙ্গন গভীর সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। সিনেমা নির্মাণ, মুক্তি এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড—সব ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও শিল্প সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে জানা গেছে। এই সংকটের প্রভাবে ইরানি সিনেমা ও সংস্কৃতি জগতে এক ধরনের বিভাজন ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

সিনেমা মুক্তি ও প্রদর্শনীতে উল্লেখযোগ্য পতন

ইরানে সর্বশেষ উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয় ২০২৬ সালের ফজর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে। সেখানে নতুন কিছু ইরানি চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হলেও দেশটির ভেতরে বাণিজ্যিক মুক্তি আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। অনেক নির্মাণ এখন উৎসবনির্ভর হয়ে পড়েছে, যা শিল্পের বাণিজ্যিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের প্রভাবে ইরানের সাংস্কৃতিক অঙ্গন এখন তিনটি ধারায় বিভক্ত—দেশের ভেতরে নিয়ন্ত্রিত ও সীমিত কাজ, প্রবাসে স্বাধীন নির্মাণ, এবং আন্তর্জাতিক উৎসবনির্ভর প্রদর্শনী।

শিল্পীদের মধ্যে তিন ধরনের অবস্থান

চলমান পরিস্থিতিতে ইরানের নির্মাতা, শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের অবস্থান তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। একাংশ যুদ্ধ ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নিচ্ছেন। এদের মধ্যে জাফর পানাহি অন্যতম, যিনি দীর্ঘদিন ধরে সেন্সরশিপ ও রাষ্ট্রীয় বিধিনিষেধের মধ্যেও কাজ করে যাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তিনি বলেছেন, “বর্তমান পরিস্থিতিতে সিনেমা শুধু শিল্প নয়, এটি নীরব প্রতিবাদের একটি ভাষা।”

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অন্যদিকে আজগর ফরহাদি বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে ইঙ্গিত দিয়েছেন, যুদ্ধ ও রাজনৈতিক চাপের কারণে গল্প বলার স্বাধীনতা সংকুচিত হচ্ছে এবং শিল্পীরা ক্রমশ সীমিত পরিসরে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। তিনি বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানি সিনেমা ও সমাজের জটিল বিষয়গুলো আরও গভীরভাবে উঠে আসছে, কারণ এগুলো খুবই বাস্তব ও কঠিন।” তবে, দর্শকদের তিনি কোন বার্তা দিতে চাননি। বরং ভাবতে অনুরোধ করেছেন। তিনি বলেন, “আমি মনে করি দর্শকদের এক বাক্যে কোনো বার্তা দেওয়া ঠিক নয়। বরং তাদের ভাবতে দেওয়াই জরুরি।”

তৃতীয় একটি বড় অংশের নির্মাতা, অভিনেতা ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা প্রকাশ্যে কোনো রাজনৈতিক মন্তব্য করছেন না। তাদের অনেকেই পেশাগত ঝুঁকি, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং সেন্সরশিপের কারণে “নীরব অবস্থান” বেছে নিয়েছেন। একাধিক শিল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রের মতে, এই অংশটিই সংখ্যায় সবচেয়ে বড়।

শিল্পীদের তিন ধরনের বাস্তবতা

অনেক শিল্পী বর্তমানে তিন ধরনের বাস্তবতায় আছেন:

  • কেউ দেশের ভেতরে সীমিত অনুমতির মধ্যে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন
  • কেউ প্রবাসে গিয়ে তুলনামূলক স্বাধীনভাবে কাজ করছেন
  • কেউ দীর্ঘ সময় ধরে কোনো প্রজেক্টে যুক্ত হতে পারছেন না

এর ফলে ইরানের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক ধরনের বিভক্ত বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবগুলোতে—কান চলচ্চিত্র উৎসব, ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসব, বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব এবং লোকার্নো চলচ্চিত্র উৎসব—ইরানি সিনেমার উপস্থিতি অব্যাহত রয়েছে। তবে এসব কাজের বড় অংশ এখন প্রবাসে নির্মিত বা বিদেশে সম্পাদিত।

ইরানি সিনেমার পরিবর্তিত পরিচয়

চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের প্রভাবে ইরানের সাংস্কৃতিক অঙ্গন এখন তিনটি ধারায় বিভক্ত—দেশের ভেতরে নিয়ন্ত্রিত ও সীমিত কাজ, প্রবাসে স্বাধীন নির্মাণ, এবং আন্তর্জাতিক উৎসবনির্ভর প্রদর্শনী। এর ফলে ইরানি সিনেমা একক ভৌগোলিক পরিচয় হারিয়ে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে থাকা সাংস্কৃতিক কণ্ঠে পরিণত হচ্ছে। সব মিলিয়ে যুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে ইরানের সিনেমা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গন এখন এক গভীর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে—যেখানে শিল্পীরা একই সঙ্গে সৃষ্টি, নীরবতা এবং প্রতিরোধের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজছেন।