কান চলচ্চিত্র উৎসবে আন্তর্জাতিক নির্মাতাদের দাপট, হলিউডের অনুপস্থিতি
বিশ্ব সিনেমার অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ আসর কান চলচ্চিত্র উৎসবের এবারের আসর ঘিরে ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ। আজ বাংলাদেশ সময় বিকেল চারটার দিকে উৎসব কর্তৃপক্ষ মনোনীত সিনেমার নাম ঘোষণা করেছেন। এবারের লাইনআপে চোখে পড়ছে এক ভিন্ন প্রবণতা—হলিউডের ঝলমলে উপস্থিতির বদলে জায়গা করে নিয়েছেন বিশ্বজুড়ে খ্যাতিমান নির্মাতারা, যাঁদের কাজ মূলত গল্পনির্ভর ও শিল্পঘেঁষা।
প্রতিযোগিতা বিভাগে আন্তর্জাতিক নির্মাতাদের প্রাধান্য
এবারের প্রতিযোগিতা বিভাগে রয়েছেন ইরানের অস্কারজয়ী নির্মাতা আসগর ফরহাদি, স্পেনের পেদ্রো আলমোদোভার, জাপানের হিরোকাজু কোরে–এদা, রিউসুকে হামাগুচি, পোল্যান্ডের পাওয়েল পাওলিকোভস্কি, হাঙ্গেরির লাসজলো নেমেসের মতো খ্যাতনামা পরিচালকরা। তাঁদের নতুন সিনেমা ঘিরে দর্শক ও সমালোচকদের প্রত্যাশা বরাবরের মতোই তুঙ্গে। গত বছর যেখানে ‘মিশন: ইমপসিবল–দ্য ফাইনাল রেকনিং’ কিংবা স্পাইক লির ‘হায়েস্ট টু লোয়েস্ট’–এর মতো বড় হলিউড প্রযোজনা ছিল, সেখানে এবার কান উৎসব যেন ফিরে যাচ্ছে তার নিজস্ব শিকড়ে—স্বাধীন ও আন্তর্জাতিক সিনেমার দিকে।
হলিউডের সীমিত উপস্থিতি ও ফরাসি ভাষার ছবির আধিক্য
প্রতিযোগিতা বিভাগে একমাত্র মার্কিন নির্মাতা হিসেবে জায়গা পেয়েছেন ইরা স্যাক্স, যাঁর ‘দ্য ম্যান আই লভ’ ছবিটি আশির দশকের নিউইয়র্কের এইডস সংকটকে কেন্দ্র করে নির্মিত একটি মিউজিক্যাল ফ্যান্টাসি। এতে অভিনয় করেছেন রামি মালিক। তবে প্রতিযোগিতার বাইরে আঁ সার্তে রিগা বিভাগে একাধিক মার্কিন সিনেমা থাকছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘টিনএজ সেক্স অ্যান্ড অ্যাট ক্যাম্প মাইসমা’।
এবারের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো ফরাসি ভাষার ছবির আধিক্য। প্রতিযোগিতা বিভাগে বেশ কয়েকটি ফরাসি ভাষার ছবি রয়েছে, যার মধ্যে কিছু আবার বিদেশি নির্মাতাদের পরিচালনায়। একই সঙ্গে তিনজন ফরাসি নারী নির্মাতার ছবিও জায়গা পেয়েছে মূল প্রতিযোগিতায়—যা নারী পরিচালকদের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতির ইঙ্গিত দেয়।
উৎসব পরিচালকের বক্তব্য ও চলচ্চিত্র জমার পরিসংখ্যান
উৎসব পরিচালক থিঁয়োরি ফ্রেমো জানিয়েছেন, এবারের আসরে ২ হাজার ৫৪১টি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র জমা পড়েছে—যা এক দশক আগের তুলনায় প্রায় এক হাজারটি বেশি। ১৪১টি দেশ থেকে আসা এই বিপুলসংখ্যক চলচ্চিত্র প্রমাণ করে, বিশ্ব সিনেমার পরিসর কতটা বিস্তৃত হচ্ছে। হলিউডের তুলনামূলক অনুপস্থিতি প্রসঙ্গে ফ্রেমো বলেন, বড় স্টুডিওগুলো এখন আগের মতো অট্যরধর্মী বা ভিন্নধারার সিনেমা তৈরি করছে না। তবে এটিকে স্থায়ী প্রবণতা হিসেবে দেখছেন না তিনি। তার মতে, স্টুডিওর বাইরেও যে শক্তিশালী এক চলচ্চিত্রধারা রয়েছে, এবারের কান সেই বাস্তবতাই সামনে আনবে।
উৎসবের সময়সূচি ও মূল প্রতিযোগিতার সিনেমা তালিকা
আগামী ১২ মে শুরু হতে যাওয়া এবারের আসরের উদ্বোধনী ছবি ‘দ্য ইলেকট্রিক কিস’, যা নির্মাণ করেছেন পিয়েরে সালভাদোরি। আর জুরিবোর্ডের সভাপতিত্ব করবেন দক্ষিণ কোরিয়ার বিখ্যাত পরিচালক পার্ক চান–উক। ৭৯তম কান উৎসবের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে জায়গা পাওয়া সিনেমাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
- ‘অল অব আ সাডেন’, রিউসুকে হামাগুচি
- ‘দ্য বিলাভাড’, রদ্রিগো সরোগোয়েন
- ‘বিটার ক্রিসমাস’, পেদ্রো আলমোদোভার
- ‘দ্য ব্ল্যাক বল’, হাভিয়ের আমব্রোসি ও হাভিয়ের কালভো
- ‘কাওয়ার্ড’, লুকাস দন্ত
- ‘দ্য ড্রিমড অ্যাডভেঞ্চার’, ভ্যালেস্কা গ্রিসবাখ
- ‘ফাদারল্যান্ড’, পাওয়েল পাওলিকোভস্কি
- ‘ফিওড’, ক্রিশ্চিয়ান মুঙ্গিউ
- ‘গারঁস’, ঝান অঁরি
- ‘জেন্টল মনস্টার’, মারি ক্রাউজার
- ‘হোপ’, না হং–জিন
- ‘মিনোটর’, আন্দ্রে জাভ্যাগিনসেভ
- ‘মলিন’, লাসজলো নেমেস
- ‘দ্য ম্যান আই লভ’, ইরা স্যাক্স
- ‘নাগি ডায়েরি’, কোজি ফুকাদা
- ‘নোত্র সাল্যু’, ইমানুয়েল মারে
- ‘প্যারালাল টেলস’, আসগর ফরহাদি
- ‘শিপ ইন দ্য বক্স’, হিরোকাজু কোরে-এদা
- ‘স্টোরিজ অব দ্য নাইট’, লিয়া মাইসিয়াস
- ‘দ্য আননোন’, আর্থার হারারি
- ‘আ ওম্যানস লাইফ’, শার্লিন বুর্জোয়া-তাকুয়েভ
এই তালিকা থেকে স্পষ্ট যে, কান উৎসব এবার বিশ্ব সিনেমার বৈচিত্র্য ও গুণগত মানকে প্রাধান্য দিচ্ছে, যা চলচ্চিত্রপ্রেমীদের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।



