অনুভব সিনহার 'অসসি': সমাজের আয়নায় ধর্ষণের নির্মম প্রতিচ্ছবি
পরিচালক অনুভব সিনহা, যিনি 'মুল্ক' এবং 'থাপ্পড়'-এর মতো সামাজিক বার্তাবহী ছবির জন্য সুপরিচিত, এবার তার নতুন সিনেমা 'অসসি'র মাধ্যমে দর্শকদের সামনে হাজির করেছেন সমাজের এক গুরুতর ও বেদনাদায়ক বিষয়। দিল্লির পটভূমিকায় নির্মিত এই ছবিটি শুধু একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়, বরং সেই সার্বজনীন আতঙ্কের গল্প, যা প্রতিদিন ভারতের নারীরা অনুভব করেন। ছবির নাম 'অসসি' ভারতের প্রতিদিনের ধর্ষণের আনুমানিক সংখ্যার দিকে ইঙ্গিত করে, যা দর্শকদের মনে গভীর রেখাপাত করে।
গল্পের সারসংক্ষেপ: একটি পরিবারের যন্ত্রণা ও আইনের লড়াই
ছবির শুরুতে এক গা শিউরে ওঠা দৃশ্য দেখা যায়, যেখানে দিল্লির একটি মেট্রো স্টেশনের বাইরে থেকে স্কুলশিক্ষিকা পরিমাকে (কানি কুসরুতি) একদল উচ্ছৃঙ্খল যুবক জোরপূর্বক গাড়িতে তুলে নেয়। চলন্ত গাড়ির মধ্যে তারা তাকে অত্যন্ত নির্মমভাবে ধর্ষণ করে, এমনকি তাদের মধ্যে পুরুষত্ব নিয়ে প্রতিযোগিতাও চলে। এরপর তারা তাকে অর্ধনগ্ন অবস্থায় রেললাইনে ফেলে চলে যায়। পরদিন স্থানীয় এক যুবক তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়, যেখান থেকে গল্প অতীতে ফিরে যায়।
পরিমা তার স্বামী বিনয় (মোহাম্মদ জিশান আয়ুব) ও ছেলে ধ্রুবকে নিয়ে সুখে সংসার করছিল, যদিও আর্থিক প্রাচুর্য না থাকলেও ভালোবাসা ও আস্থা ছিল অফুরান। বিনয় স্ত্রীর শারীরিক ও মানসিক ক্ষত সারাতে পুরোদমে চেষ্টা করে, আর ছোট্ট ধ্রুব তার মায়ের সঙ্গে হওয়া অন্যায় বুঝতে পেরে বাবাকে সাহস জোগায়। এরপর তদন্ত শুরু হয়, এবং ধর্ষণকারীদের গ্রেপ্তার করা সহজ হলেও আদালতে তাদের দোষী প্রমাণ করাই হয়ে ওঠে প্রধান চ্যালেঞ্জ।
আইনজীবী রাভির সংগ্রাম ও সমাজের ঘৃণ্য চেহারা
পরিমার পাশে দাঁড়ায় আইনজীবী রাভি (তাপসী পান্নু), যিনি আইনি যুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে সমাজব্যবস্থার আসল ও ঘৃণ্য চেহারার মুখোমুখি হন। কাহিনি যত এগোয়, ততই উঠে আসে পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা, পুলিশি দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সমাজের অসংবেদনশীলতা। ছবির একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যে বিনয় তার ছেলেকে মেয়েদের সম্মান করার শিক্ষা দেয়, যা সংবেদনশীল সমাজ গঠনের বার্তা বহন করে।
অভিযুক্ত যুবকদের একজনের বাবা তার অর্থবল ব্যবহার করে সিস্টেমের সঙ্গে মিলে মামলাকে ভিন্ন খাতে ঘোরানোর চেষ্টা করে, আর রাভিকে উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে বারবার পরাজয়ের মুখে পড়তে হয়। ক্ষমতার কাছে ন্যায়বিচার যেন মাথা নত করে, কিন্তু আদালতের ভেতর কিছু সত্য সামনে আসে, যা সবাইকে নাড়া দেয়। এদিকে, রাভির ভগ্নিপতি কার্তিকের (কুমুদ মিশ্রা) সমান্তরাল কাহিনিও এগোয়, যার অন্ধকার অতীত আছে।
অজ্ঞাতনামা ছাতাধারী ও অনিশ্চিত সমাপ্তি
আদালতে রাভির সংগ্রামের মধ্যেই আবির্ভাব হয় এক অজ্ঞাতনামা ছাতাধারী ব্যক্তির, যিনি ধর্ষণকারীদের নির্মমভাবে হত্যা করতে শুরু করেন। ছাতার আড়ালে তিনি একের পর এক অপরাধীকে শেষ করে দেন, যা গল্পে নতুন মাত্রা যোগ করে। ছাতাধারী ব্যক্তি কে, রাভি কি পারবে দোষীদের আইনি সাজা দিতে, আর পরিমা কি পাবে সঠিক বিচার—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে দর্শকদের দেখতে হবে 'অসসি'। এই গল্পটি অনুভব সিনহা ও গৌরব সোলাঙ্কি লিখেছেন, যা বাস্তব ঘটনার অনুপ্রেরণায় নির্মিত।
অভিনয় ও পরিচালনার মূল্যায়ন
দীর্ঘদিন পর তাপসী পান্নু একটি শক্তিশালী চরিত্রে বড় পর্দায় ফিরেছেন এবং তিনি রাভির ভূমিকাটি দক্ষতার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন। মোহাম্মদ জিশান আয়ুবের চরিত্রে গভীরতা থাকলেও কোথাও কোথাও তার আবেগ কম মনে হয়েছে। কানি কুসরুতি এক ধর্ষিতা নারীর যন্ত্রণা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে প্রকাশ করেছেন, আর কুমুদ মিশ্রার জটিল চরিত্রও প্রশংসনীয়। তবে, নাসিরুদ্দিন শাহর মতো অভিজ্ঞ অভিনেতাকে আরও ভালোভাবে ব্যবহার করা যেত।
কাহিনি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দর্শককে বেঁধে রাখে, কিন্তু কিছু অংশ বিক্ষিপ্ত ও অস্পষ্ট মনে হয়েছে, এবং কিছু চরিত্রের সম্পর্ক স্পষ্টভাবে খোলাসা করা হয়নি। অনুভব সিনহার পরিচালনা দক্ষ হলেও আরও পরিষ্কার গল্প বলার আশা ছিল।
শেষ কথা: নারী নিরাপত্তার জ্বলন্ত প্রশ্ন
'অসসি' শুধু বিনোদনের জন্য নয়, এটি ভারতে নারী নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে। ছবিটি জিজ্ঞাসা করে, কবে নারীরা নিরাপদে ও স্বাধীনভাবে শ্বাস নিতে পারবে? ভারতে প্রতি ২০ মিনিটে একটি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়—এই সত্যটি ছবিজুড়ে দর্শককে স্মরণ করিয়ে দেয়। অনুভব সিনহার এই কাজ নারী-পুরুষ সবার অন্তরাত্মাকে নাড়িয়ে দেবে, এবং এটি সমাজের কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরে চলচ্চিত্রের শক্তিকে কাজে লাগায়। 'অসসি' ২০ ফেব্রুয়ারি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে, এবং এটি দর্শকদের জন্য একটি চিন্তা-উদ্রেককারী অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে।
