ধ্বংসস্তূপে 'আলো'র প্রদর্শনী: মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বার্তা ছড়াচ্ছে কারওয়ান বাজার
ধ্বংসস্তূপে 'আলো'র প্রদর্শনী: মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বার্তা

ধ্বংসস্তূপে 'আলো'র প্রদর্শনী: মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বার্তা ছড়াচ্ছে কারওয়ান বাজার

রাজধানীর কারওয়ান বাজারে পুড়িয়ে দেওয়া প্রথম আলো ভবনে পঞ্চম দিন ধরে চলছে ব্যতিক্রমী শিল্পকর্ম প্রদর্শনী 'আলো'। সংঘবদ্ধ উগ্রবাদীদের হামলার শিকার এই ভবনের ধ্বংসাবশেষকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এই প্রদর্শনীতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা। পুড়ে যাওয়া কম্পিউটার, ভাঙা আসবাব, বইপত্রের ধ্বংসস্তূপ দেখে অনেকেই আবেগতাড়িত হয়ে পড়ছেন, যা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার গুরুত্বকে নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে।

বিদেশি নাগরিক ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি

আজ রোববার প্রদর্শনী দেখতে আসেন বাংলাদেশে বসবাসরত যুক্তরাজ্যের নাগরিক গ্রেহাম জাড। প্রথম আলোর পোড়া ভবন দেখে তিনি বলেন, 'মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকা খুব জরুরি। কারও মতামত পছন্দ না হলে হামলা করা বা ধ্বংস করার মানসিকতা খুব ভয়ানক, যা গণতন্ত্রকে হুমকির মুখে ফেলে।' গ্রেহাম জাড মনে করেন, ধ্বংসস্তূপের মাঝে 'আলো' নামের এই শিল্পকর্ম একটি শক্তিশালী বার্তা বহন করে, যা প্রথম আলোর পুনর্জাগরণকে ফুটিয়ে তুলেছে।

এছাড়াও, শিক্ষামূলক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে প্রদর্শনী পরিদর্শনে এসেছেন ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের (ইউল্যাব) ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের একদল শিক্ষার্থী। তাঁদের মধ্যে ছিলেন মৌমিতা হালদার, রুহুল আমিন, শিমুল আর্থ, আবরার ইকবাল, হাসনাইন আব্বাস ও সাদাত জাহান। শিক্ষার্থী হাসনাইন আব্বাস বলেন, 'ধ্বংসযজ্ঞ দেখে বোঝা যায় এই ভবনে একটা মারাত্মক বিপর্যয় ঘটে গেছে। মানুষ তার ক্ষোভ জানাতে এমন ধ্বংসযজ্ঞ চালায়, এটা না দেখলে উপলব্ধি করা যায় না। তবে এটা কোনো সুস্থ মানুষের কাজ নয়।'

শিল্পকর্মের বিবরণ ও সময়সূচি

শিল্পী মাহবুবুর রহমানের তৈরি 'আলো' শীর্ষক এই প্রদর্শনী শুরু হয় ১৮ ফেব্রুয়ারি। প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে ১টা এবং বেলা ৩টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত প্রদর্শনী সবার জন্য উন্মুক্ত থাকছে। প্রদর্শনী চলবে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত, যেখানে ধ্বংসাবশেষের মাধ্যমে শিল্পের নতুন রূপ উপস্থাপন করা হচ্ছে।

স্কুল শিক্ষার্থী ও ব্যক্তিগত স্মৃতি

প্রদর্শনী দেখতে স্কুলের শিক্ষার্থীরাও আসছেন। আজ বাবা পার্থ শঙ্করের সঙ্গে প্রদর্শনী দেখতে এসেছে হলি ক্রস স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্রী ধ্রুপদী দাস রঙ। সে জানিয়েছে, প্রথম আলোর সঙ্গে তার পুরোনো স্মৃতি আছে এবং এর আগে প্রথম আলোতে তার একটি গল্পও ছাপা হয়েছিল। ধ্বংসযজ্ঞ দেখে ধ্রুপদী দাস বলেছে, 'মনে হচ্ছে কোনো পুরোনো জাদুঘরে এসেছি। প্রদর্শনীটি স্মৃতির মতো মনে থাকবে।'

গত ১৮ ডিসেম্বর প্রথম আলো ভবনে আগুন দেওয়ার রাতে সারা রাত জেগে থাকার অভিজ্ঞতা শেয়ার করে ধ্রুপদী দাস যোগ করেছে, 'সারা রাত নির্ঘুম ছিলাম। কিন্তু কিছুই করার ছিল না। এখন দেখছি সব পুড়ে গেছে। আগুন লাগার ঘটনা কষ্ট দিয়েছিল আমাকে।'

মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বার্তা

প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণকারীরা একবাক্যে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তাঁদের মতে, দ্বিমত প্রকাশের জন্য প্রয়োজনে বিতর্ক হতে পারে, সৃজনশীল কাজের বিপরীতে সৃজনশীলতা থাকতে পারে, কিন্তু হামলা করে বা আগুন দিয়ে প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করা অমানবিক। এই শিল্প-আয়োজন শুধু ধ্বংসের চিহ্নই নয়, বরং প্রতিরোধ ও পুনরুত্থানের একটি জীবন্ত দলিল হয়ে উঠেছে, যা সমাজে আলোড়ন সৃষ্টি করছে।