ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জনবহুল দক্ষিণ ভারতীয় রাজ্য তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে সম্প্রতি এক নতুন যুগের সূচনা হয়েছে। গত রোববার (১০ মে) ৫১ বছর বয়সি জনপ্রিয় চলচ্চিত্র তারকা থেকে রাজনীতিতে আসা থালাপতি বিজয় ওরফে চন্দ্রশেখর জোসেফ বিজয় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন। তামিলনাড়ুর ইতিহাসে তিনিই প্রথম খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে এই দায়িত্ব নিলেন।
নির্বাচনী ফলাফল ও সরকার গঠন
বিজয়ের নবগঠিত দল তামিলাগা ভেট্টি কাজাগাম বা ‘তামিল ভিক্টরি পার্টি’ (টিভিকে) বিধানসভার ২৩৪টি আসনের মধ্যে ১০৮টিতে জয়লাভ করেছে। এর পর কয়েকদিনের নাটকীয়তা শেষে বামপন্থী ও কমিউনিস্ট দল এবং ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লীগের সমর্থনে সরকার গঠন করতে সক্ষম হন তিনি। এই ফলাফলের মাধ্যমে তামিলনাড়ুতে গত প্রায় ছয় দশক ধরে দুই রাজনৈতিক দল ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে-এর পর্যায়ক্রমিক ক্ষমতার ধারার অবসান ঘটল।
পরিচয় ও আদর্শ
জনপ্রিয়ভাবে ‘থালাপতি’ (সেনাপতি) নামে পরিচিত বিজয় প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক এস.এ. চন্দ্রশেখর এবং গায়িকা শোভা চন্দ্রশেখরের সন্তান। তিনি ক্যাথলিক হিসেবে বেড়ে উঠেছেন। তবে নির্বাচনি প্রচারণায় ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে জনকল্যাণমূলক কাজের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। তিনি তার আদর্শিক পথপ্রদর্শক হিসেবে সমাজ সংস্কারক পেরিয়ার ই.ভি. রামাসামি, সি.এন. আন্নাদুরাই, কে. কামরাজ এবং সংবিধান প্রণেতা বি.আর. আম্বেদকরের নাম উল্লেখ করেন।
ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তি
ক্যাথলিক প্রকাশনা দ্য নিউ লিডার-এর সম্পাদক ফাদার চার্লস অ্যান্থনিস্বামী বিধানসভা নির্বাচনে বিজয়ের দলের এই জয়কে ‘প্রকৃতপক্ষে ঐতিহাসিক’ বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, নির্বাচনি প্রচারণায় ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) বিজয়ের ধর্মীয় পরিচয়কে লক্ষ্যবস্তু করায় সংখ্যালঘুদের ভোট একীভূত হতে সাহায্য করেছে। তবে বিজয় নিজে সব ধর্মের উপাসনালয় পরিদর্শন করে একটি ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তি বজায় রেখেছেন।
দলিত খ্রিস্টানদের অধিকার
বিজয়ের দল আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েছে। সেটা হলো তারা ‘দলিত খ্রিস্টান’দের জন্য তফসিলি জাতি মর্যাদার দাবিকে সমর্থন করেছেন। বর্তমানে ভারতীয় আইন অনুযায়ী কেবল হিন্দু, শিখ এবং বৌদ্ধ ধর্মের দলিতরা সরকারি চাকরিজীবী এবং শিক্ষায় এই সংরক্ষণ সুবিধা পান। বিজয় এই সুবিধা খ্রিস্টান ধর্মান্তরিতদের জন্যও বাড়ানোর পক্ষে সোচ্চার।
ভারতে ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রেক্ষাপট
এমন এক সময়ে বিজয়ের এই উত্থান ঘটল যখন ভারতে খ্রিস্টানদের ওপর সহিংসতার হার ক্রমাগত বাড়ছে। ইউনাইটেড খ্রিস্টান ফোরামের তথ্যমতে, ২০২১ সালে ভারতে এই সহিংসতার ঘটনা ছিল ৪৮৬টি। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৩৪টিতে এবং গত বছর এই সংখ্যা প্রায় ৯০০-তে পৌঁছেছে। সিনিয়র সাংবাদিক জন দয়াল উল্লেখ করেছেন, বিজয় ভারতের প্রথম খ্রিস্টান মুখ্যমন্ত্রী নন (উত্তর-পূর্ব ভারতে এমন নজির রয়েছে), তবে তামিলনাড়ুর মতো বড় রাজ্যে তার এই বিজয় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
প্রসঙ্গত, মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বিজয়ের এই জয়যাত্রা কেবল তারকার জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভর করছে না, বরং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং জনকল্যাণমুখী প্রশাসনের প্রত্যাশাকে সামনে নিয়ে এসেছে।



