আল মাহমুদের ভ্রমণকাহিনি 'তিন শহর তিন আকাশ'
আল মাহমুদের 'তিন শহর তিন আকাশ': ভ্রমণকাহিনির অনন্য সংকলন

'তিন শহর তিন আকাশ' বইয়ের প্রচ্ছদ অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো

নিবিড় পর্যবেক্ষণই ভ্রমণকে প্রকৃত অর্থে পর্যটনে রূপ দেয়। অনেকেই দূরদেশে যান, নানান দৃশ্য দেখেন, কিন্তু তা যদি কেবল চোখের দেখা হয়, অনুভবে ধরা না পড়ে, তবে সে ভ্রমণ অপূর্ণই থেকে যায়। রবীন্দ্রনাথের ভাবনায়: নিজেকে জানা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সেই জানাকে প্রকাশ করাও সমান প্রয়োজনীয়। বাংলা সাহিত্যে সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'পালামৌ' ভ্রমণকাহিনির এক উজ্জ্বল সূচনা। পরবর্তীকালে বহু লেখক ভ্রমণকে শিল্পে রূপ দিয়েছেন।

কবি আল মাহমুদ স্বদেশ বাংলার গ্রামগঞ্জ থেকে শুরু করে বিস্তৃত জনপদে যেমন নিরন্তর ঘুরে বেড়িয়েছেন, তেমনি পৃথিবীর নানা প্রান্তেও ভ্রমণের সুযোগ পেয়েছেন। ১৯৮৮ থেকে ২০০২—এই দীর্ঘ সময়ে আল মাহমুদ ভারত, ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স ভ্রমণ করেন। সেই ভ্রমণের বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন 'কবিতার জন্য বহুদূর', 'কবিতার জন্য সাত সমুদ্র' এবং 'কবিশিল্পীদের মাতৃভূমি প্যারিস' গ্রন্থে। এই তিন ভ্রমণকাহিনি একত্রে সংকলিত হয়ে প্রকাশিত হয়েছে 'তিন শহর তিন আকাশ' নামে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গ্রন্থের বৈশিষ্ট্য

গ্রন্থটির প্রথম পৃষ্ঠা থেকেই পাঠক অনায়াসে লেখকের সঙ্গী হয়ে প্রবেশ করবেন তাঁর ভ্রমণজগতে। তাঁর সূক্ষ্ম ও মনোযোগী পর্যবেক্ষণে উন্মোচিত হয়েছে সেসব অঞ্চলের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার বহুমাত্রিক চিত্র। লন্ডন আর প্যারিসের তুলনা করে তিনি লিখেছেন, 'প্যারিসে গিয়ে এবার শুনেছি সেখানে তরুণ ফরাসি কবিদের জনপ্রিয়তা আগের চেয়ে ক্রমবর্ধমান। উপন্যাস ও ফিকশনের প্রবল প্রতাপ থাকলেও ফরাসিরা এখনো কবিতা পড়ে এবং কবিদের পৃষ্ঠপোষকতা দেয়, যা লন্ডনে সচরাচর দেখা যায় না।'

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্যারিসের প্রতি ভালোবাসা

'কবিশিল্পীদের মাতৃভূমি প্যারিস' অংশে লেখক উল্লেখ করেছেন, প্যারিস না দেখলে ইউরোপের হৃদয়কে স্পর্শ করা সম্ভব নয়। এর আগে যুক্তরাজ্যে মির্জা গালিবের স্মরণোৎসবে একমাত্র বাংলাদেশি হিসেবে অংশগ্রহণ করেছিলেন আল মাহমুদ। তবে তাঁর মনে হয়েছে, তখন ইউরোপ সম্পর্কে তাঁর ধারণা ছিল আংশিক! প্যারিসে এসেই সেই ধারণা পূর্ণতা লাভ করেছে। ফরাসি কবিতা ও প্যারিসের প্রতি ভালোবাসা কৈশোরকাল থেকেই ছিল তাঁর। শার্ল বোদলেয়ার, র্যাঁবো, এলুয়ার, মালার্মে, লা ফর্গ, লুই আঁরাগ প্রমুখ কবির কবিতা পড়ে তিনি ফ্রান্সের প্রতি আগ্রহী হন। সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপায়িত হওয়াই আপ্লুত হয়েছেন তিনি।

কবিতার প্রতি অনুরাগ

একজন কবি বলেই কবিতার হালহকিকত, কবিতাচর্চা আল মাহমুদকে উদ্বেলিত করে। লন্ডন আর প্যারিসের তুলনা করে তিনি লিখেছেন, 'প্যারিসে গিয়ে এবার শুনেছি সেখানে তরুণ ফরাসি কবিদের জনপ্রিয়তা আগের চেয়ে ক্রমবর্ধমান। উপন্যাস ও ফিকশনের প্রবল প্রতাপ থাকলেও ফরাসিরা এখনো কবিতা পড়ে এবং কবিদের পৃষ্ঠপোষকতা দেয়, যা লন্ডনে সচরাচর দেখা যায় না। যদিও ব্রিটিশ কাউন্সিল তরুণ ইংরেজ কবিদের কবিতার বই মাঝেমধ্যে বের করে ইংরেজি কবিতার ধারাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করে।' এ ছাড়া এ গ্রন্থে কবিতাযাত্রার সূত্র ধরেই তাঁর ব্যক্তিগত বিতর্কগুলোর আংশিক ছায়াপাত করেছেন লেখক।

যুক্তরাজ্যের মুশায়েরা

গ্রন্থটির 'কবিতার জন্য সাত সমুদ্র' অংশ থেকে জানা যায়, ১৯৯৬ সালের আগস্ট বা সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে যুক্তরাজ্যের ওল্ডহাম মেট্রোপলিটন ব্যুরো আল মাহমুদকে আমন্ত্রণ জানায়। ২৯ সেপ্টেম্বর, ওল্ডহামের ঐতিহ্যবাহী কুইন এলিজাবেথ হলে অনুষ্ঠিত হয় 'আন্দাজ-এ-বয়ান ঔর'—আ মাদার টাং কনফারেন্স অ্যান্ড মুশায়েরা। সেদিন আল মাহমুদ প্রথমে আবৃত্তি করেন 'ভারতবর্ষ' কবিতাটি, এরপর আরও কিছু কবিতা পাঠ করেন। শেষকৃত কবিতাটি ছিল 'নোলক', যার শেষ পঙ্‌ক্তি 'আমার মায়ের সোনার নোলক হারিয়ে গেল শেষে' উচ্চারণ করতেই সারা হল বাঙালি শ্রোতাদের উল্লাসধ্বনিতে কেঁপে ওঠে। উর্দু ও ইংরেজির আধিপত্যের মাঝেও বাংলা ভাষার মাধুর্য ও উচ্ছ্বাস শ্রোতাদের হৃদয় স্পর্শ করে। পাঠকও গ্রন্থটি পাঠ করে আলোকিত ও আলোড়িত হতে পারেন।

নবনীতা দেবসেনের সঙ্গে আলাপচারিতা

'কবিতার জন্য বহুদূর' অংশটি উপভোগ্য হয়ে ওঠে নবনীতা দেবসেন ও আল মাহমুদের চিন্তার ভিন্নতা ও অম্লমধুর আলাপচারিতায়। তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল আন্তরিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ। আল মাহমুদ নিরাপদে ভোপাল পৌঁছানোয় নবনীতা খুশি ছিলেন; কিন্তু খানিকটা অনুযোগ করেই বলেন, 'ধার্মিক হওয়া ভালো, তবে মৌলবাদী হওয়া ভালো নয়।' এর জবাবে আল মাহমুদ জানান, ধর্মের মৌলিক বিষয়গুলো পরিত্যাগ করে কেউ সত্যিকার ধার্মিক হতে পারে না। তাঁদের এই সংলাপ তাদের ভাবনাচিন্তা ও আত্মবিশ্বাসের গভীরতার পরিচয় দেয়। গদ্যের কারুকাজে নিজের ধর্মবিশ্বাস, জীবন ও জগৎ সম্বন্ধে ভাবনাচিন্তা প্রকাশ করেছেন লেখক।

ভ্রমণের সৃষ্টিশীল প্রভাব

এসব ভ্রমণে তিনি অজস্র কবি-শিল্পী-মানুষের সাক্ষাৎ পেয়েছেন। কবিতাই যেন তাঁর পথের দিশারি হয়ে তাঁকে দেশ থেকে দেশান্তরে নিয়ে গেছে, আর সেই ভ্রমণগুলো তাঁর সৃষ্টিশীলতাকে দিয়েছে নতুন মাত্রা। 'তিন শহর তিন আকাশ' নতুন বিন্যাসে, নতুন আবেদনে পাঠককে মোহিত করবে।

দুর্দান্ত কাব্যিক গদ্যে লিখেছেন, 'খাবার টেবিলে এসে দেখি দুসারিতে খাবার সাজানো। ভেজিটেরিয়ান ও নন-ভেজিটেরিয়ান। যদিও আমি মাংসরুচির মানুষ কিন্তু এখানে হালাল-হারামের কথা চিন্তা করে নিরামিষাশীদের সারিতে দাঁড়িয়ে গেলাম। এতে দেখলাম ভারতীয় লেখকগণ খুব আনন্দ পেলেন।...নিরামিষ, পনির, দই ও ঝাল-টক মিলিয়ে আহারপর্বটা বেশ মজাদারই মালুম হলো। নানারূপ টকের মাধুর্য জীবনে এই প্রথম চাখলাম।' গদ্যে লেখা হলেও গ্রন্থটির কাব্যসৌন্দর্য একটুও ব্যাহত হয়নি।

গ্রন্থের গুরুত্ব

গ্রন্থের শুরুতে লেখক উল্লেখ করেছেন, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্‌র 'চাঁদের অমাবস্যা'র পর তাঁর 'কালো নৌকা' গল্পটি দ্বিতীয় বাংলা গল্প হিসেবে ফরাসিতে অনূদিত হয়। ওয়ালীউল্লাহ্‌র মতো ভ্রমণের মাধ্যমে মুক্তি লাভ করেছিলেন কিনা বা আল মাহমুদ পুরো জগৎটাকে নিজের করে তুলতে পেরেছিলেন কিনা, তা জানার জন্য পাঠককে অবশ্যই এই গ্রন্থ পড়তে হবে। সেখানে তাঁর যাত্রাপথের অনুভব ও অন্বেষণ এক অনন্য বয়ন রচনা করেছে। তাঁর এই বিদেশযাত্রাগুলোর বেশির ভাগই ছিল কবিতাপাঠের আমন্ত্রণকে কেন্দ্র করে। আর এসব ভ্রমণে তিনি অজস্র কবি-শিল্পী-মানুষের সাক্ষাৎ পেয়েছেন। কবিতাই যেন তাঁর পথের দিশারি হয়ে তাঁকে দেশ থেকে দেশান্তরে নিয়ে গেছে, আর সেই ভ্রমণগুলো তাঁর সৃষ্টিশীলতাকে দিয়েছে নতুন মাত্রা। 'তিন শহর তিন আকাশ' নতুন বিন্যাসে, নতুন আবেদনে পাঠককে মোহিত করবে।

...তিন শহর তিন আকাশ

আল মাহমুদ

প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন

প্রকাশ: জানুয়ারি ২০২৬

প্রচ্ছদ: মাসুক হেলাল

পৃষ্ঠা: ১২৮; মূল্য: ৩৪০ টাকা

প্রথম আলোর খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

বইপত্র থেকে আরও পড়ুন

শিল্প ও সাহিত্য

সাহিত্য

বইপত্র-অন্য আলো

বই

বই আলোচনা