সুপারমডেলের ২০ বছরের দ্বৈত জীবন: আর্কটারাসের গুরু ও কাল্টের ফাঁদ
সুপারমডেলের ২০ বছরের দ্বৈত জীবন: আর্কটারাসের গুরু

তথ্যচিত্র ‘ব্রিং মি দ্য বিউটিজ’–এর দৃশ্য

বাইরের দুনিয়ায় তিনি ছিলেন সাফল্যের প্রতীক। বিশ্বের নামকরা ফ্যাশন হাউসগুলোর বিজ্ঞাপনে তাঁর মুখ, কোটি কোটি ডলারের আয়, ব্যক্তিগত বিমানে এক দেশ থেকে আরেক দেশে ছুটে বেড়ানো জীবন। কিন্তু সেই চাকচিক্যের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক ভয়ংকর বাস্তবতা। দিনে তিনি ছিলেন বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় পুরুষ মডেল, আর রাতে ঘুমাতেন একটি রহস্যময় সংগঠনের অ্যাপার্টমেন্টের মেঝেতে বিছানো পাতলা ম্যাটের ওপর। প্রায় দুই দশক ধরে এমনই দ্বৈত জীবন কাটিয়েছেন হোয়েট রিচার্ডস। যিনি একসময় ভার্সাচে, ভ্যালেন্তিনো ও রালফ লরেনের মতো ব্র্যান্ডের মুখ ছিলেন, তিনি নিজের অজান্তেই জড়িয়ে পড়েছিলেন ইন্টারনাল ভ্যালুজ নামের এক রহস্যময় সংগঠনের সঙ্গে। সেই সংগঠনের নেতা ফ্রেডেরিক ভন মিয়েরার্স দাবি করতেন, তিনি পৃথিবীর মানুষ নন; মহাবিশ্বের দূরবর্তী নক্ষত্র আর্কটারাস থেকে আগত এক ভিনগ্রহের দূত। এই অবিশ্বাস্য গল্প নিয়েই নির্মিত হয়েছে এইচবিওর তিন পর্বের তথ্যচিত্র ‘ব্রিং মি দ্য বিউটিজ’। ১ জুন মুক্তি পেয়েছে তিন পর্বের তথ্যচিত্র সিরিজটির প্রথম পর্ব, এর পর থেকেই দুনিয়াজুড়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক। সিরিজটির বাকি দুই পর্ব মুক্তি পাবে ৮ ও ১৫ জুন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এক গ্রীষ্মের বিকেলে শুরু

১৯৭৮ সালের গ্রীষ্ম। তখন হোয়েট রিচার্ডসের বয়স মাত্র ১৬ বছর। পরিবারের সঙ্গে প্রতিবছরের মতো ছুটি কাটাতে গিয়েছিলেন ম্যাসাচুসেটসের ন্যানটাকেট দ্বীপে। দিনের বেশির ভাগ সময় কাটত সমুদ্রসৈকতে। সেখানেই প্রথম দেখা ফ্রেডেরিক ভন মিয়েরার্সের সঙ্গে। বয়সে বড়, আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী, কথা বলায় অদ্ভুত এক সম্মোহনী শক্তি। পূর্বের দর্শন, জ্যোতিষশাস্ত্র, আধ্যাত্মিকতা আর মহাবিশ্বের রহস্য নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতেন মিয়েরার্স। সৈকতের কাছেই প্রায় প্রতি রাতে আয়োজন করতেন পার্টির। কিশোর হোয়েট সেখানে যেতেন বন্ধুদের সঙ্গে, মূলত বিনা মূল্যের বিয়ার আর আড্ডার টানে। কিন্তু তিনি বুঝতে পারেননি, ভন মিয়েরার্স আসলে তাঁকে পর্যবেক্ষণ করছেন। বহু বছর পরে রিচার্ডস উপলব্ধি করেন, তাঁর সবচেয়ে বড় দুর্বলতাটিই ধরতে পেরেছিলেন ভন মিয়েরার্স—স্বীকৃতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। একজন কিশোর হিসেবে তিনি অনুভব করেছিলেন, কেউ তাঁকে গুরুত্ব দিচ্ছে। আর সেখান থেকেই শুরু হয়েছিল নিয়ন্ত্রণের খেলা।

‘বিশেষ’ হওয়ার প্রলোভন

পরবর্তী দুই দশকে ভন মিয়েরার্স ধীরে ধীরে গড়ে তোলেন ইটারনাল ভ্যালুজ নামের সংগঠন। তাঁর লক্ষ্য ছিল মডেল, তরুণ পেশাজীবী ও নিউইয়র্কের উচ্চবিত্ত সমাজের সদস্যদের আকৃষ্ট করা। তিনি কাউকে জোর করে টানতেন না। বরং প্রশংসা করতেন, গুরুত্ব দিতেন, বোঝাতেন—তারা সাধারণ মানুষ নয়; মহাবিশ্বের বিশেষ পরিকল্পনার অংশ। এভাবেই মানুষ তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করত। এরপর শুরু হতো আরও গভীর নিয়ন্ত্রণ। মানসিক চাপ, প্রকাশ্যে অপমান, আত্মসমর্পণের দাবি—সবকিছু মিলিয়ে ধীরে ধীরে সদস্যদের স্বাধীন চিন্তার জায়গা সংকুচিত হয়ে যেত।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এদিকে মডেলিং দুনিয়ায় উত্থান

একই সময়ে রিচার্ডসের ক্যারিয়ার আকাশছোঁয়া। প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করার পর মডেলিং জগতে প্রবেশ করেন তিনি। খুব দ্রুতই হয়ে ওঠেন বিশ্বের সবচেয়ে বেশি চাহিদাসম্পন্ন পুরুষ মডেলদের একজন। প্রথম সারির ব্র্যান্ডের প্রচারণায় কাজ করেছেন। প্রভাবশালী আলোকচিত্রী রিচার্ড অ্যাভেডন ও হেলমুট নিউটনের ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছেন। ফ্যাশন দুনিয়ায় তাঁর সাফল্য ছিল ঈর্ষণীয়। কিন্তু সেই অর্থের বড় অংশ চলে যেত ইন্টারনাল ভ্যালুজের তহবিলে। শুধু অর্থই নয়, জীবনের প্রায় ২০ বছরও তিনি উৎসর্গ করেছিলেন এই সংগঠনকে।

ব্রুকস ব্রাদার্সের পোশাকে ‘গুরু’

তথ্যচিত্রে রিচার্ডস ভন মিয়েরার্সকে বর্ণনা করেছেন ‘গুরু’ হিসেবে। তিনি ছিলেন এমন এক গুরু, যিনি প্রচলিত আধ্যাত্মিক নেতাদের মতো নন। পরিপাটি পোশাক, অভিজাত ভঙ্গি, সামাজিক পরিশীলন—সব মিলিয়ে যেন নিউইয়র্কের উচ্চবিত্ত সমাজেরই প্রতিনিধি। ন্যানটাকেটের গ্রীষ্মকাল পেরিয়ে যখন রিচার্ডস প্রিন্সটনে ভর্তি হলেন, তখন নিউইয়র্কের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ বাড়ল। ভন মিয়েরার্সের সঙ্গে সম্পর্কও গভীর হতে লাগল। শুরুতে যেটি ছিল পরামর্শদাতা ও অনুসারীর সম্পর্ক, সেটি ধীরে ধীরে অন্য কিছুতে রূপ নিল—যার নাম তখনো রিচার্ডস জানতেন না। ভন মিয়েরার্স তাঁর অনুসারীদের বলতেন, তারা সবাই আর্কটুরাস থেকে পৃথিবীতে এসেছে। আর্কটুরাস হলো সূর্য থেকে প্রায় ৩৭ আলোকবর্ষ দূরের একটি নক্ষত্র। তাঁর মতে, সেটিই ছিল মহাবিশ্বের আধ্যাত্মিক কেন্দ্র। তিনি দাবি করতেন, পৃথিবীতে আসন্ন এক মহাবিপর্যয়ের জন্য তাদের নির্বাচিত করা হয়েছে। ১৯৯৯ সালে ঘটবে ‘পোল শিফট’—পৃথিবীর চৌম্বক মেরু বদলে গিয়ে ধ্বংস হয়ে যাবে সভ্যতা। সাধারণ মানুষ মারা যাবে, কিন্তু ইন্টারনাল ভ্যালুজের সদস্যরা বেঁচে থাকবে। উত্তর ক্যারোলিনার স্মোকি মাউন্টেন এলাকায় ইতিমধ্যে সেই জমিও নির্বাচন করা হয়েছে, যেখানে একদিন ভিনগ্রহের মহাকাশযান এসে অবতরণ করবে এবং নির্বাচিতদের নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যাবে। আজ এসব কথা অবিশ্বাস্য শোনায়। কিন্তু তখন রিচার্ডস সেগুলো বিশ্বাস করেছিলেন। ‘আমি ভেবেছিলাম, এটি একটি অসাধারণ আধ্যাত্মিক আন্দোলন,’ টাইমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন তিনি। ‘এটি আসলে কী ছিল, তা বুঝতে আমার ২০ বছর লেগেছে,’ আরও যোগ করেন রিচার্ডস।

শুরুটা ছিল স্বাস্থ্যচর্চা, শেষটা মানসিক বন্দিত্ব

প্রথম দিকে ইটারনাল ভ্যালুজকে অনেকের কাছেই স্বাস্থ্য ও আত্মোন্নয়নের আন্দোলন বলে মনে হয়েছিল। সদস্যদের ফল ও সবজিভিত্তিক খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করতে হতো। নিয়মিত রোদে বসতে হতো। মাদক ও অ্যালকোহল থেকে দূরে থাকতে বলা হতো। প্রেম ও যৌনসম্পর্কও নিষিদ্ধ ছিল। শুনতে বিষয়গুলো অস্বাভাবিক নয়। বরং আজকের ‘ওয়েলনেস কালচার’-এর সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যায়। তথ্যচিত্রটির নির্মাতা ক্রিস স্মিথও বলেন, সংগঠনটি অনেক বিষয়ে সময়ের চেয়ে এগিয়ে ছিল। স্বাস্থ্যসচেতনতা ও আত্মশৃঙ্খলার যে ধারণাগুলো এখন জনপ্রিয়, সেগুলোর কিছু তখনই তারা চর্চা করত। কিন্তু সেই নিয়মের আড়ালেই ছিল নিয়ন্ত্রণের জাল। ভন মিয়েরার্স সদস্যদের নিয়ে করতেন ‘লাইফ রিডিং’। প্রায় ৯০ মিনিট ধরে চলা এই সেশনে তিনি জ্যোতিষশাস্ত্রের চার্ট ব্যবহার করে একজন মানুষের ব্যক্তিত্ব বিশ্লেষণ করতেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল দুর্বল জায়গাগুলো খুঁজে বের করা। একসময় সদস্যরা নিজেদের বিচার করার ক্ষমতাও হারাতে শুরু করেন। হোয়েট রিচার্ডস পরে বলেন, ‘আমার মনে হতো আমি আরও উন্নত, আরও ভালো মানুষ হয়ে উঠছি।’ ভন মিয়েরার্সের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর গল্প বলার ক্ষমতা। তিনি দাবি করতেন, একসময় তাঁর শরীরে আর্কটুরাস নক্ষত্র থেকে আসা এক সত্তা প্রবেশ করেছে। সেই সত্তা তাঁকে জানিয়েছে, পৃথিবী ধ্বংসের দিকে এগোচ্ছে। প্রশ্ন উঠতে পারে—শিক্ষিত, সফল মানুষ এসব বিশ্বাস করল কীভাবে? এর উত্তরও ছিল ভন মিয়েরার্সের হাতে। তাঁর দাবি শুধু মুখের কথা ছিল না। নিউ এজ আন্দোলনের জনপ্রিয় লেখক ও গুরু রুথ মন্টগোমারির বই ‘এলিয়েনস অ্যামং আস’-এ ভন মিয়েরার্সকে ‘আর্কটারাস’-এর হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। এতে তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতা আরও বেড়ে যায়। পরে সংগঠনটি একটি বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যে পরিণত হয়। আলটিমেট ফিটনেস অপরচুনিটিজ বা ইউএফও নামে নিবন্ধিত এই প্রতিষ্ঠানের অধীনে বিক্রি হতো প্রশিক্ষণ কোর্স, খাদ্যপরিপূরক, ব্যায়ামের সরঞ্জাম, জ্যোতিষ পরামর্শ এবং দামি রত্নপাথর।

সুপারমডেলের টাকায় গড়া স্বপ্নরাজ্য

এদিকে হোয়েট রিচার্ডসের ক্যারিয়ার তত দিনে শিখরে। তারকাদের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন তিনি। ইউরোপ ও আমেরিকার বড় বড় শহরে কাজ করছেন। কিন্তু তাঁর উপার্জনের বড় অংশই চলে যাচ্ছে সংগঠনের তহবিলে। রিচার্ডসের হিসাব অনুযায়ী, তিনি কয়েক মিলিয়ন ডলার দিয়েছেন সংগঠনটিকে। শুধু তাই নয়, তাঁকে নিজের পরিবার থেকেও বিচ্ছিন্ন হতে বাধ্য করা হয়েছিল। বেশির ভাগ গোপন সংগঠনের মতো ইটারনাল ভ্যালুজও সময়ের সঙ্গে ভয়ংকর রূপ নিতে শুরু করে। সদস্যদের একে অপরের ওপর নজরদারি করতে বলা হতো। কেউ নিয়ম ভাঙলে শুরু হতো ‘স্ল্যামিং সেশন’—সবার সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপমান, গালাগাল ও মানসিক নির্যাতন। কখনো কখনো শারীরিক সহিংসতাও ঘটত। এক সদস্যকে কয়েক দিন খাবার ও পানি ছাড়া একটি ঘরে আটকে রাখা হয়েছিল। পরিস্থিতি আরও অদ্ভুত হয়ে ওঠে যখন ভন মিয়েরার্স সদস্যদের এক্সট্যাসি জাতীয় মাদক সেবন করতে এবং পরস্পরের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করতে উৎসাহ দিতে শুরু করেন। যে সংগঠন একসময় প্রেম ও যৌনতা নিষিদ্ধ করেছিল, তারাই পরে উল্টো পথে হাঁটে। ১৯৯০ সালে ভ্যানিটি ফেয়ার প্রকাশ করে বিখ্যাত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ‘দ্য ফোর্ড মডেলস অ্যান্ড দ্য এলিয়ানস ফ্রম আর্কটারাস।’ প্রতিবেদনটি প্রকাশের মাত্র পাঁচ দিন আগে এইডসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান ভন মিয়েরার্স। মৃত্যুর পর ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে তাঁর প্রকৃত পরিচয়। তিনি আসলে ব্রুকলিনের সাধারণ এক ইহুদি পরিবারে জন্ম নেওয়া ফ্রেডি মিয়ার্স। কোনো ভিনগ্রহের দূত নন। কোনো অলৌকিক সত্তাও নন। নিজের পরিচয় বদলে তিনি ধাপে ধাপে নিউইয়র্কের অভিজাত সমাজে প্রবেশ করেছিলেন।

অদৃশ্য কারাগার

শুরুর দিকে সংগঠনটি সদস্যদের সচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলার শিক্ষা দিত। মাদক ও মদ্যপান নিরুৎসাহিত করা হতো। যৌন সম্পর্ক নিষিদ্ধ ছিল। সামাজিক বন্ধন ছিল খুব শক্তিশালী। একজন আরেকজনের খোঁজ রাখতেন। কিন্তু ধীরে ধীরে এই সম্পর্কই নিয়ন্ত্রণের যন্ত্রে পরিণত হয়। কেউ নিয়ম ভাঙলে শুরু হতো ‘স্ল্যামিং সেশন’। ঘণ্টার পর ঘণ্টা চিৎকার, অপমান ও মানসিক নির্যাতন চালানো হতো। তখন এগুলোকে আধ্যাত্মিক সংশোধন বলে মনে হতো। আজ রিচার্ডস বুঝতে পারেন, সেগুলো ছিল নিছক নিয়ন্ত্রণের কৌশল। ‘এখন ফিরে তাকিয়ে বলতে পারি, আমি একটা মানসিক কারাগারে ছিলাম। কিন্তু তখন সেটাকে কারাগার মনে হয়নি। মনে হয়েছিল, এটাই আমার জীবনের ভিত্তি,’ বলেন তিনি। সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি ছিল, সেই কারাগার তিনি নিজেই অর্থ দিয়ে তৈরি করেছিলেন।

কেউই নিরাপদ নয়

তথ্যচিত্রটির নির্মাতা ক্রিস স্মিথ প্রথমে অন্য একটি প্রকল্পে কাজ করার সময় রিচার্ডসের সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলেন। কথা বলতে বলতে হঠাৎ এই গল্প বেরিয়ে আসে। একদিন নয়, চার-পাঁচ দিন ধরে সাক্ষাৎকার চলার পর স্মিথ উপলব্ধি করেন, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ তথ্যচিত্র হওয়ার মতো গল্প। তাঁর মতে, এই গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—রিচার্ডস কোনোভাবেই সেই প্রচলিত ‘কাল্ট সদস্য’-এর ছকে পড়েন না। তিনি শিক্ষিত, আত্মবিশ্বাসী, সুস্থ পারিবারিক পরিবেশে বড় হওয়া একজন সফল মানুষ। ছয় ভাই–বোনের পরিবার, ন্যানটাকেটে ছুটি কাটানো, সামনে প্রিন্সটনের মতো বিশ্ববিদ্যালয়—সব মিলিয়ে তাঁর জীবন ছিল আদর্শ আমেরিকান স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি। তবু তিনি ফাঁদে পড়েছিলেন। কারণ তিনি ছিলেন ১৬ বছরের এক কিশোর, যে নিজের চেয়ে বড় কোনো কিছুর অংশ হতে চেয়েছিল। আর ভন মিয়েরার্স তাকে সেই অনুভূতিটাই দিয়েছিলেন।

যখন পৃথিবী ধ্বংস হলো না

১৯৯০ সালে মারা যান ভন মিয়েরার্স। এর কিছুদিন পর ভ্যানিটি ফেয়ারে প্রকাশিত হয় ইটারনাল ভ্যালুজ নিয়ে বিখ্যাত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। কিন্তু সংগঠনটি তখনো টিকে ছিল। পরে তারা নাম বদলে লোটাস গ্রুপ হয়ে যায়। তবে সবচেয়ে বড় আঘাত আসে ১৯৯৯ সালে। যে মহাপ্রলয়ের ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল, সেটি ঘটল না। রিচার্ডস তখন প্যারিস, লন্ডনসহ বিশ্বের বিভিন্ন শহরে কাজ করতেন। চারপাশে তাকিয়ে তিনি দেখলেন, পৃথিবী একেবারেই স্বাভাবিক আছে। তখন প্রথমবারের মতো তাঁর মনে সন্দেহ জাগে।

মুক্তির পথে প্রেম

এ সময় গোপনে ডোনা নামের এক নারীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান তিনি। চার বছর ধরে সম্পর্কটি লুকিয়ে রাখেন। অবশেষে যখন সত্য প্রকাশ করেন, তখন কাল্টের সদস্যরা তাঁকে নির্মমভাবে অপমান করে। টানা ৯ সপ্তাহ ধরে চলে মানসিক নির্যাতন। তাঁকে তুচ্ছ কাজ করতে বাধ্য করা হয়। মাথা ন্যাড়া করে দেওয়া হয়। মডেলিং ক্যারিয়ার কার্যত ধ্বংস হয়ে যায়। অপমানের ভার আর সহ্য করতে না পেরে একদিন একটি চিঠি লিখে সংগঠন ছেড়ে বেরিয়ে আসেন।

ফিরে পাওয়া জীবন

২০০২ সালে ইটারনাল ভ্যালুজ আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত হয়। তত দিনে রিচার্ডসের মা ক্যানসারে আক্রান্ত। ১২ বছর পর মায়ের কাছে ফিরে যান তিনি। কেমোথেরাপির কারণে চুল হারিয়ে উইগ পরা মাকে দেখে তাঁর বুক ভেঙে যায়। মায়ের জীবনের শেষ সময়টুকু তাঁর সেবাযত্নেই কাটে। পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলনই হয়ে ওঠে তাঁর আরোগ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আজ প্রায় ২৫ বছর ধরে রিচার্ডস নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলছেন। তাঁর মতে, এটি শুধু ধর্মীয় সংগঠন ছিল না। যেকোনো সম্পর্কই এমন কিছুতে পরিণত হতে পারে, যদি সেখানে একজন মানুষ অচেতনভাবে নিজের ক্ষমতা অন্য কারও হাতে তুলে দেয়। ‘মানুষ আপনাকে প্রশংসা করে, মনোযোগ দেয়, ভালোবাসার অনুভূতি দেয়। আপনি ধীরে ধীরে সেটার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। আর তখনই ফাঁদ তৈরি হয়,’ বলেন তিনি। আগামী সেপ্টেম্বরে তিনি বিয়ে করবেন ডোনাকে—যাঁর সঙ্গে সম্পর্কের কারণে একসময় তাঁকে অপমানিত হতে হয়েছিল। আর আজ তাঁর সবচেয়ে বড় বার্তা হলো, কেউই এই ধরনের প্রভাব থেকে পুরোপুরি নিরাপদ নয়। কারণ বিপদ অনেক সময় ভয়ংকর মুখ নিয়ে আসে না। কখনো কখনো তা আসে আকর্ষণ, প্রশংসা আর আপন করে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে। আর সেখানেই লুকিয়ে থাকে সবচেয়ে বড় বিপদ।