অ্যান-ভিলদের গল্প: এক নক্ষত্রের আগমন ও পৃথিবীর মুক্তি
অ্যান-ভিলদের গল্প: নক্ষত্রের আগমন ও পৃথিবীর মুক্তি

অলংকরণ: রাকিব

বাগানে বসে আছে সবাই। ‘শোনো জোয়ি,’ জেনিয়া হকিন্স তার ৯ বছরের মেয়েকে বলল, ‘ছটফটানি বন্ধ করো, এবার বাবা তোমাকে একটা গল্প বলবে।’ হ্যামকে গা এলিয়ে দিল জোয়ি। ‘সত্যি গল্প, বাবা?’ ‘সবকিছু ঠিক যেমনভাবে ঘটেছিল, তেমনই বলব তোমাকে,’ জোয়ির লাল টুকটুকে গালটা টিপে দিয়ে বলল ড্রেক হকিন্স। ‘শোনো তবে: আজ থেকে দুই হাজার এগারো বছর আগে, ১৯৮৫ সালে—পৃথিবীর সেই সময়কার ক্যালেন্ডার অনুযায়ী—লুব্ধক নক্ষত্র থেকে একদল প্রাণী পৃথিবীতে হানা দিল।’

অ্যান-ভিলদের আগমন

‘ওই প্রাণীগুলো দেখতে কেমন ছিল, বাবা?’ ‘অনেকটা মানুষের মতোই। তাদেরও দুটি হাত, দুটি পা আর মানুষের শরীরের সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ছিল।’ ‘নক্ষত্রের ওই প্রাণীদের সঙ্গে মানুষের কি কোনোই অমিল নেই, বাবা?’ ‘আছে তো। নতুন আসা ওই আগন্তুকদের প্রত্যেকের কাঁধ থেকে গজিয়েছিল একজোড়া ডানা, যা সবুজ পালকে ঢাকা। আর ছিল লম্বা বেগুনি রঙের লেজ।’ ‘এমন কতগুলো প্রাণী এসেছিল বাবা?’ ‘ঠিক ত্রিশ লাখ একচল্লিশ জন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ আর তিনজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী। এই প্রাণীরা প্রথম পৃথিবীতে দেখা দিল সার্ডিনিয়া দ্বীপে। মাত্র পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে পুরো পৃথিবীর মালিক হয়ে বসল তারা!’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মানুষের প্রতিরোধ

‘পৃথিবীর মানুষেরা কি বাধা দেয়নি, বাবা?’ ‘মানুষেরা ওই আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল বটে; গুলি, সাধারণ বোমা, সুপার অ্যাটম বোমা আর বিষাক্ত গ্যাস ব্যবহার করেছিল।’ ‘সেগুলো আবার কী?’ ‘ওহ, ওসব তো অনেক আগেই দুনিয়া থেকে বিলীন হয়ে গেছে। ওগুলোকে বলা হতো গোলাবারুদ। মানুষেরা ওসব দিয়ে একে অপরের সঙ্গে লড়াই করত।’ ‘আমাদের মতো বুদ্ধি দিয়ে লড়াই করত না বাবা?’ ‘না, বন্দুক দিয়ে করত, যেমনটা তোমাকে বললাম। কিন্তু আক্রমণকারীদের ওপর ওই গোলাবারুদ কোনো কাজ করল না।’ ‘কাজ করল না মানে?’ ‘মানে হলো, ওসব দিয়ে তাদের কোনো ক্ষতি করা গেল না। এরপর মানুষেরা ওই নক্ষত্রের প্রাণীদের ওপর জীবাণু আর ব্যাকটেরিয়া প্রয়োগ করার চেষ্টা করল।’ ‘ওগুলো আবার কী জিনিস?’ ‘খুব ছোট ছোট পোকা। মানুষেরা চেয়েছিল ওই পোকাগুলো আক্রমণকারীদের শরীরে ঢুকিয়ে দিতে, যাতে তারা অসুস্থ হয়ে মারা যায়। কিন্তু ওই পোকাগুলো নক্ষত্রের প্রাণীদের কিছুই করতে পারল না।’

অ্যান-ভিলদের প্রভুত্ব

‘তারপর কী হলো, বাবা? ওই প্রাণীরা তো পুরো পৃথিবী দখল করে নিল। এরপর বলো।’ ‘তোমাকে বুঝতে হবে, ওই নবাগতরা পৃথিবীর মানুষের চেয়ে অনেক বেশি বুদ্ধিমান ছিল। আসলে এই নক্ষত্রমণ্ডলীর মধ্যে তারাই ছিল সর্বশ্রেষ্ঠ গণিতবিদ।’ ‘নক্ষত্রমণ্ডলী কী? আর গণিতবিদ মানেই-বা কী?’ ‘প্রথমটা আমাদের এই ছায়াপথ। আর গণিতবিদ হলো তারা, যারা হিসাব-নিকাশ, ওজন আর মাপে খুব ওস্তাদ। মানে সংখ্যা নিয়ে খেলা করতে পারে আরকি।’ ‘তাহলে বাবা, ওই আক্রমণকারীরা কি সব মানুষকে মেরে ফেলল?’ ‘সবাইকে নয়। অনেককে মারল ঠিকই, কিন্তু বাকিদের দাস বানিয়ে রাখল। মানুষ যেমন ঘোড়া আর গবাদিপশুকে ব্যবহার করত, ওই নবাগতরাও মানুষকে সেভাবেই ব্যবহার করতে শুরু করল। কাউকে দিয়ে কাজ করাত, আবার কাউকে খাবারের জন্য জবাই করত।’ ‘বাবা, ওই নক্ষত্রের প্রাণীরা কোন ভাষায় কথা বলত?’ ‘খুব সহজ একটা ভাষা, কিন্তু মানুষ সেটা কখনোই শিখতে পারল না। আক্রমণকারীরা ছিল অনেক বেশি বুদ্ধিমান, তাই খুব সহজেই পৃথিবীর সব কটি ভাষা দখল করে নিল ওরা।’ ‘পৃথিবীর মানুষ ওই আক্রমণকারীদের কী নামে ডাকত, বাবা?’ ‘অ্যান-ভিল। অর্ধেক ফেরেশতা, আর অর্ধেক শয়তান।’

সবজান্তার পরিকল্পনা

‘তাহলে বাবা, অ্যান-ভিলরা যখন মানুষকে দাস বানিয়ে ফেলল, তারপর কি পৃথিবীতে সব শান্তি ফিরে এসেছিল?’ ‘অল্প কিছুদিনের জন্য এসেছিল। তারপর সবজান্তা নামের এক লোকের নেতৃত্বে সাহসী কিছু মানুষ গ্রিনল্যান্ডের গহিন ভেতরে পালিয়ে গেল। এই সবজান্তা ছিল একজন মনোবিজ্ঞানী, পৃথিবীর সেরা মনোবিজ্ঞানীদের একজন।’ ‘মনোবিজ্ঞানী কী, বাবা?’ ‘যিনি মানুষের বুদ্ধি আর ধারণা নিয়ে কারবার করেন।’ ‘তাহলে তো লোকটা খুব বড়লোক ছিল?’ ‘পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মানুষ ছিল লোকটা। অনেক গভীর চিন্তাভাবনা করে সবজান্তা একটা বুদ্ধি বের করল: কীভাবে পৃথিবী থেকে ওই অ্যান-ভিলদের তাড়ানো যায়।’ ‘কীভাবে বাবা?’ ‘একটা বিশেষ পদ্ধতি বের করল লোকটা, যার নাম দেওয়া হলো সবজান্তা—হিউজ-ইলেনস্কি টেকনিক। এই কৌশলের কাজ ছিল অ্যান-ভিলদের মনের ভেতর মানুষের মতো আবেগ আর অনুভূতি ঢুকিয়ে দেওয়া।’

অ্যান-ভিলদের মধ্যে বিভেদ

‘অনুভূতি ঢুকিয়ে দেওয়া মানে কী?’ ‘অ্যান-ভিলদের মনটাকে মানুষের নানা রকম অনুভূতি দিয়ে ভরিয়ে দেওয়া, যাতে ওরা সেই সব আবেগ বুঝতে পারে।’ জেনিয়া মাঝপথে কথা থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘ড্রেক, তুমি এমন সব কথা বলছ, যা বাচ্চার বোঝার ক্ষমতার বাইরে!’ ‘না মা,’ বলল জোয়ি। ‘বাবা যা বোঝাল, তার সব বুঝতে পেরেছি। এখন তুমি মাঝখানে কথা বোলো না তো।’ ড্রেক আবার বলতে শুরু করল, ‘তো ওই সবজান্তা অ্যান-ভিলদের মনের ভেতর মানুষের মতো ভালোবাসা, ঘৃণা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, হিংসা, বিদ্বেষ, পরশ্রীকাতরতা, হতাশা, আশা, ভয় আর লজ্জার মতো সব অনুভূতি ঢুকিয়ে দিল। খুব জলদি দেখা গেল, অ্যান-ভিলরা ঠিক মানুষের মতো আচরণ করছে। মাত্র ১০ দিনের মাথায় শুরু হলো এক ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ, আর সেই যুদ্ধেই দুই-তৃতীয়াংশ অ্যান-ভিল শেষ হয়ে গেল।’

জালিবারের আবির্ভাব

‘তাহলে বাবা, শেষ পর্যন্ত অ্যান-ভিলরা কি একে অপরকে মেরেই ফেলল?’ ‘প্রায় মেরেই ফেলেছিল, কিন্তু তখনই জালিবার নামের এক সত্তার আবির্ভাব ঘটল। লোকটা ছিল খুব সাধু প্রকৃতির, কথা দিয়ে মানুষকে ভোলানোর অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল তার। জালিবার সব অ্যান-ভিলের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বাণী প্রচার করতে লাগল। আক্রমণকারীরা খুব দ্রুত বদলে গেল, নিজেদের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি বন্ধ করে দিল ওরা। আর তার ফল হলো এই যে পৃথিবীর মানুষ আরও বেশি করে দাসে পরিণত হলো।’ ‘ওহ বাবা, গ্রিনল্যান্ডে সবজান্তা আর তার সঙ্গীরা কি খুব মন খারাপ করেছিল? এমনটা হবে তো ওরা ভাবেনি।’

চূড়ান্ত কৌশল

কিছুক্ষণ তো মন খারাপ ছিলই। তারপর সবজান্তা তার শেষ চালটা চালল। ‘শেষ চাল? তুমি কি কোনো খেলার কথা বলছ, বাবা?’ ‘হ্যাঁ, অনেকটা তেমনই। তুরুপের শেষ তাস বলতে পারো। অন্য সবকিছু যখন বিফল হয়, তখন ব্যবহারের জন্য এই বুদ্ধি লোকটা তুলে রেখেছিল।’ ‘বুঝতে পেরেছি, বাবা। এমন একটা বুদ্ধি, যা অন্য সবকিছুকে হার মানিয়ে দেবে। সেটা কী ছিল?’ ‘সবজান্তা অ্যান-ভিলদের মনের ভেতর গৃহকাতরতা ঢুকিয়ে দিল!’ ‘নস্টালজিয়া কী?’ ‘নিজের বাড়ির জন্য মন কেমন করা।’ ‘ওহ্‌ বাবা, সবজান্তা তো দারুণ বুদ্ধিমান! তার মানে, অ্যান-ভিলদের সবার মনে এখন সেই নক্ষত্রে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা জাগল, যেখান থেকে ওরা এসেছিল?’ ‘একদম তা–ই। একদিন এক বিশাল বাহিনী নিয়ে সব অ্যান-ভিল উত্তর আমেরিকার ব্ল্যাক হিলসে জড়ো হলো। বড় বড় সবুজ ডানা ঝাপটাতে লাগল ওরা। তারপর একটা সংকেত পেতেই সবাই মিলে পৃথিবী ছেড়ে ওপরের দিকে উড়াল দিল। আর পৃথিবীর সব মানুষ সমস্বরে গেয়ে উঠল, “জয় হোক, জয় হোক, আমাদের মুক্তির দিন এসেছে!”’

জিজো ও জিজা

‘তাহলে বাবা, সব অ্যান-ভিল কি পৃথিবী ছেড়ে চলে গেল?’ ‘সবাই নয়। দুটো বাচ্চা অ্যান-ভিল ছিল, একটা ছেলে আর একটা মেয়ে। ওদের বয়স ছিল মাত্র দুই বছর, জন্ম হয়েছিল এই পৃথিবীতেই।’ ‘বাকি সব অ্যান-ভিলের সঙ্গে ওরাও আকাশের দিকে উড়াল দিয়েছিল। কিন্তু যখন ওরা স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারের একদম ওপরের স্তরে পৌঁছাল, তখন কেমন যেন ইতস্তত করতে লাগল। তারপর লেজ ঘুরিয়ে ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে আবার পৃথিবীতেই ফিরে এল ওরা। ওদের নাম ছিল জিজো আর জিজা।’ ‘তারপর জিজো আর জিজার কী হলো, বাবা?’ ‘বাকি সব অ্যান-ভিলের মতো ওরাও গণিতে খুব পাকা ছিল। তাই ওরা সংখ্যায় বাড়তে লাগল।’ ‘ওহ, বাবা,’ খিলখিল করে হেসে উঠল জোয়ি, উত্তেজনায় নিজের ডানা ঝাপটাতে লাগল। গল্পটা খুব সুন্দর ছিল!

*লেখাটি ২০২৬ সালে বিজ্ঞানচিন্তায় ফ্রেব্রুয়ারি সংখ্যায় প্রকাশিত