অ্যালেন গিন্সবার্গ: চিরযৌবনশীল কবির শতবর্ষে বাংলাদেশের স্মৃতি
অ্যালেন গিন্সবার্গের শতবর্ষ: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান

অ্যালেন গিন্সবার্গের খোলামেলা জীবনযাপন তাঁকে এমন এক ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছিল, যেন তাঁর যৌবন কখনো ফুরোবে না। কবিতায় কাঁচা আবেগ, অকপট জীবনাচার এবং মানুষের মুক্তির জন্য বিশুদ্ধ ক্ষোভের বিস্ফোরণে তিনি ছিলেন যৌবনের প্রতীক। ৩ জুন এই চিরযৌবনশীল কবির জন্মের এক শতক পূর্ণ হলো, কিন্তু তাঁর যৌবনময়তা এখনও অবিশ্বাস্য রকম সংক্রামক।

বিট জেনারেশনের পথিকৃৎ

বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে এমন কবি খুব কমই আছেন, যিনি একই সঙ্গে কবি, প্রতিবাদী বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক বিদ্রোহী এবং মানবিক বিবেকের প্রতীক হয়ে উঠতে পেরেছেন। অ্যালেন গিন্সবার্গের নাম উচ্চারণ করলেই বিট জেনারেশন, ‘হাউল’ এবং ভিয়েতনামবিরোধী আন্দোলনের কথা মনে পড়ে। বাংলাদেশের মানুষের কাছে তিনি চিরজীবিত ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতার জন্য, যা মুক্তিযুদ্ধের ময়দানে লেখা।

জন্ম ও প্রাথমিক জীবন

অ্যালেন গিন্সবার্গ ১৯২৬ সালের ৩ জুন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা লুই গিন্সবার্গ ছিলেন শিক্ষক ও কবি, আর মা নাওমি গিন্সবার্গ—দুজনেই কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় কর্মী। মা তাঁকে কিশোর বয়সে পার্টির বৈঠকে নিয়ে যেতেন, ফলে ছোটবেলা থেকেই শ্রেণিবৈষম্য, শ্রমজীবী মানুষের দুর্দশা ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের মতো বিষয় তাঁকে প্রশ্নমুখর করে তোলে। পরবর্তী জীবনে তিনি মার্কিন ধনতন্ত্র, যুদ্ধবাদ, যৌন রক্ষণশীলতা ও রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্রের প্রবল সমালোচক হয়ে ওঠেন। কৈশোরে তিনি দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-সহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে রাজনৈতিক চিঠি লিখতেন। যৌবনে তিনি এক সাহিত্য আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী যুক্তরাষ্ট্রের অনুগত মধ্যবিত্ত সংস্কৃতির বিরুদ্ধে আমূল বিদ্রোহ ঘোষণা করে—বিট জেনারেশন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সাহিত্যিক ভাষা ও ভঙ্গিমা

জ্যাক কেরুয়াক ও উইলিয়াম বারোজদের সঙ্গে গিন্সবার্গ গড়ে তোলেন এক নতুন সাহিত্যিক ভাষা ও ভঙ্গিমা। সাহিত্য তাঁদের কাছে ছিল জীবনযাপনেরই সম্প্রসার—অকপট, ঝুঁকিপূর্ণ, কখনো বিশৃঙ্খল, কিন্তু জীবন্ত। গিন্সবার্গ নিজেও জীবন যাপন করতেন সাদামাটা—ছোট অ্যাপার্টমেন্টে থাকতেন, পুরোনো কাপড় পরতেন। কিন্তু তাঁর চিন্তা ও কণ্ঠ ছিল ক্ষমতার সব প্রতিষ্ঠানের প্রতি বিস্ফোরক ও বিপজ্জনক।

‘হাউল’ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা

১৯৫৬ সালে প্রকাশিত দীর্ঘ কবিতা ‘হাউল’ যুক্তরাষ্ট্রের সাহিত্যে ভূমিকম্প সৃষ্টি করে। এতে মার্কিন ধনতন্ত্র, যান্ত্রিকতা, যুদ্ধোন্মাদনা ও মানুষের আত্মিক বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে তীব্র, কাঁচা ও রুক্ষ ভাষায় আক্রমণ করা হয়। রক্ষণশীল সমাজ বিক্ষুব্ধ হয়ে পুলিশ কবিতার কপি বাজেয়াপ্ত করে এবং তাঁর বিরুদ্ধে অশ্লীলতার মামলা হয়। আদালত শেষ পর্যন্ত ‘হাউল’ অশ্লীল নয় বলে রায় দেয়। বিচারক ক্লেটন ডব্লিউ হর্ন প্রশ্ন তোলেন, ‘নিজের শব্দভান্ডার গুটিয়ে এনে কাউকে যদি কেবলই নিরীহ, নিষ্প্রাণ ও লুকোচুরির ভাষা ব্যবহার করতে বাধ্য করা হয়, তাহলে গণমাধ্যমের ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বলে কি আর কিছু থাকবে?’ এই মামলা গিন্সবার্গকে বিশ্বজোড়া খ্যাতি এনে দেয় এবং যুক্তরাষ্ট্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

আধ্যাত্মিক উন্মেষ

গিন্সবার্গের জীবনে আধ্যাত্মিকতার গভীর প্রভাব পড়েছিল। ১৯৪৮ সালে উইলিয়াম ব্লেকের কবিতা পড়তে গিয়ে তাঁর এক দিব্যোন্মাদনার অভিজ্ঞতা হয়, যাকে তিনি ‘ব্লেক ভিশন’ নাম দেন। এই অভিজ্ঞতা তাঁর জীবন ও কবিতাকে বদলে দেয়। ১৯৬০-এর দশকে ভারতে এসে দীর্ঘ সময় কলকাতা ও বারানসিতে কাটান, বৌদ্ধধর্ম ও প্রাচ্যের দর্শনে আকৃষ্ট হন, যা তাঁর কবিতাকে আরও ধ্যানী ও মানবমুখী করে তোলে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’

বাংলাদেশের ইতিহাসে অ্যালেন গিন্সবার্গের নাম উজ্জ্বল হয়ে আছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে তাঁর নিবিড় সংস্পর্শের কারণে। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গণহত্যা ও নিপীড়নের কারণে লাখ লাখ মানুষ ভারতে আশ্রয় নেয়। সেপ্টেম্বর মাসে গিন্সবার্গ কলকাতায় আসেন এবং বনগাঁ-বয়ড়া সীমান্তের শরণার্থীশিবিরে যান। যশোর রোডজুড়ে তিনি দেখেছিলেন মানুষের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ—বন্যা, কলেরা, অনাহার, মৃত্যুপথযাত্রী শিশু, উদ্বাস্তু মানুষের অন্তহীন মিছিল।

গিন্সবার্গকে কলকাতা যাওয়ার টাকা দিয়েছিলেন রোলিং স্টোনসের কিথ রিচার্ডস। যুক্তরাষ্ট্রের সরকার বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে থাকলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে সমর্থনের জোয়ার এনেছিলেন কবি-শিল্পী-অধিকারকর্মীরা। কিথ রিচার্ডস চেয়েছিলেন গিন্সবার্গ ‘গৃহযুদ্ধের ছোবল থেকে পালানো কোটি মানুষের মর্মান্তিক দুর্দশার ছবি তুলে ধরবেন’।

গিন্সবার্গ ৯ সেপ্টেম্বর যশোর রোডে শরণার্থীশিবির দেখতে যান। তাঁর সফরসঙ্গী ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, মার্কিন বৌদ্ধ ছাত্র ও কবি জন গিয়োর্নো এবং কলকাতার বাংলাদেশ মিশনের এক কর্মকর্তা (যাঁর পরিচয় পাওয়া যায়নি)। শিবিরে যাওয়ার অভিজ্ঞতা মধুর ছিল না। সুনীল লিখেছেন, ‘আমরা যখন যাই, তখনো সীমান্তে বিদেশিদের গমনাগমন নিষিদ্ধ হয়নি, কিন্তু বন্যার দাপট চলছে। বনগাঁ শহরের মধ্যে একহাঁটু জল, বয়ড়ার রাস্তায় নৌকা—শিবিরের মধ্যেও জলস্রোত। ওই বেপরোয়া কবি নিরস্ত হননি। ট্যাক্সি ছেড়ে জলের মধ্যে হাঁটতে শুরু করি—পাৎলুন গুটিয়ে, তারপর সর্বাঙ্গ ভিজিয়ে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘুরেছিলাম, কখনো নৌকায়, ডাব ও সিগারেট ছাড়া আর কোনো খাদ্য ছিল না।’

‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতায় গিন্সবার্গ শরণার্থীদের খাদ্যাভাবের বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন এবং প্রশ্ন তুলেছেন, ভিয়েতনামে যুদ্ধ চালানোর টাকা কেন লাখ লাখ নিরাশ্রয় শিশুকে সাহায্যে ব্যয় করা হবে না। কবিতায় জায়গা পেয়েছে শরণার্থীদের দুর্দশা, দেশত্যাগের মর্মন্তুদ বর্ণনা এবং মার্কিন যুদ্ধনীতির কঠোর সমালোচনা।

গিন্সবার্গ তখন কবিতা লিখছিলেন অদ্ভুত উপায়ে—টেপরেকর্ডারে ধরে রাখছিলেন সব। বিট সাহিত্য গবেষক টনি ট্রিজিলিও জানান, ‘কবির তাৎক্ষণিক ভাবনা বলা হয়ে যাচ্ছিল টেপরেকর্ডারে, সঙ্গে চারপাশের আওয়াজ ও গাড়ির রেডিওর খবর।’ সুনীলও লিখেছেন, ‘অ্যালেনের সর্বক্ষণ টেপরেকর্ডার খোলা থাকত, যেকোনো ব্যাপারে তাঁর প্রতিক্রিয়া রেকর্ড হতো।’ টেপে শরণার্থীশিবিরের অভিজ্ঞতার বর্ণনায় গিন্সবার্গ বলছিলেন, ‘খড়ের মতো দোকানপাট দিনভর খাদ্যের জন্য ঠায় দাঁড়িয়ে। বাতাসে বিষ্ঠা, খাবার ও বিড়ির গন্ধ। ঝুম বৃষ্টি, মহামারি, কলেরা। অনেক ফলকওয়ালা বর্শাহাতে লোক রাস্তায় দাঁড়িয়ে। দরিদ্র বাসিন্দা ও শরণার্থীদের মধ্যে উত্তেজনা।’

কলকাতা থেকে ফিরে গিন্সবার্গ সাইরাক্যুসে জন লেনন ও ইয়োকো ওনোর অ্যাপার্টমেন্টে যান এবং ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ পড়ে শোনান। লেননের দুচোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়লে গিন্সবার্গ বুঝতে পারেন কবিতাটি ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেছে।

গিন্সবার্গ শুধু কবিতা লিখেই থেমে থাকেননি। তিনি নিউইয়র্কে একটি কবিতার আসরের আয়োজন করেন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের কবি গিন্সবার্গ ও রুশ কবি আন্দ্রেই ভজনেসেনস্কি মধ্যমণি হন। ২০ নভেম্বর সেন্ট জর্জেস এপিস্কোপাল চার্চে ‘আমেরিকানস ফর বাংলাদেশ’-এর আয়োজনে এই আসরে গিন্সবার্গ তাঁর কবিতা পড়েন এবং যোগ দেন বিট দলের কবি-বন্ধুরা—গ্রেগরি করসো, অ্যান ওয়াল্ডম্যান, পিটার অর্লভস্কি, কেনেথ কচ, এড স্যান্ডার্স, মাইকেল ব্রাউনস্টাইন, ডিক গ্যালাপ ও রন প্যাজেট। আয়োজনের উদ্দেশ্য ছিল ‘বাংলাদেশ সম্পর্কে সবাইকে জানানো এবং ত্রাণ তহবিল গড়ে তোলা’।

একাধিক পত্রিকায় প্রকাশিত ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ ব্যাপক সাড়া ফেলে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেই ভারতে কবিতাটি ব্যবহার করে একটি পোস্টার বের করা হয়, যার দামের জায়গায় লেখা ছিল, ‘বাংলাদেশের শরণার্থীদের পুনর্বাসনে অংশ নিতে স্বেচ্ছায় যতটা সম্ভব সহযোগিতা করুন।’ বিক্রি থেকে পাওয়া টাকা শরণার্থীদের তহবিলে জমা পড়ে।

গিন্সবার্গ নিজেও কবিতাটির প্রেমে পড়েছিলেন। নানা আসরে তিনি এটি পড়েছেন, পরে সুর দিয়েছেন এবং বাদ্যযন্ত্রসহ পরিবেশন করেছেন। কোনো কোনো আসরে তাঁর সঙ্গে যোগ দিয়েছেন বব ডিলান। বাংলায় অনুবাদ করে গানে বাঁধা হয়েছে—মৌসুমী ভৌমিক তারেক মাসুদ পরিচালিত ‘মুক্তির গান’ ছবির জন্য আংশিক অনুবাদ করেন, আর প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ করেন অকালপ্রয়াত কবি খান মোহাম্মদ ফারাবী।

অ্যালেন গিন্সবার্গের জীবন বিতর্কে ভরা হলেও তাঁর কবিতার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল নিপীড়িত মানুষের পক্ষে দাঁড়ানোর দুর্মর আকাঙ্ক্ষা। তিনি বুঝেছিলেন, কবিতা শুধু কোমল অনুভূতি নয়; এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা, মানবিকতার পক্ষে সাক্ষ্যের ভাষা। বাংলাদেশ তাঁকে বিশেষভাবে মনে রাখবে সেই কবি হিসেবে, যিনি মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে সক্রিয় একটি দেশের নাগরিক হয়েও একাত্তরের বাঙালির আর্তিকে নিজের কণ্ঠে ধারণ করেছিলেন।