ইচক দুয়েন্দের এই যে হঠাৎ-ফেঁপে-ওঠা আখ্যান-কাঠামো কিংবা তাঁকে ঘিরে সমকালীন লিটেরারি মার্কেটে যে ধরনের নস্টালজিক বাষ্পীভবন আমরা ইদানীং লক্ষ করছি, তার গোড়ার গলদটা ধরতে হলে প্রথমেই আমাদের অ্যাকাডেমিক বুদ্ধিজীবী মহলের সেই চিরকালীন সেফ-জোন বা আরামদায়ক নন্দনতাত্ত্বিক ডিসকোর্সটিকে একটু সজোরেই ঝাঁকুনি দেওয়া দরকার। আমরা যখন কোনো টেক্সটকে 'প্রান্তিক' বা 'বিকল্প' তকমা দিয়ে নিজেদের প্রগতিশীলতার কোটা পূরণ করতে চাই, তখন আসলে আমরা সেই টেক্সটের ভেতরের আসল সাবভার্সিভ বা অন্তর্ঘাতমূলক রাজনীতিটাকেই এক ধরনের পরিশীলিত বুর্জোয়া মোড়কে বন্দি করে ফেলি।
ক্ষমতার জ্যামিতির গালে চপেটাঘাত
দুয়েন্দে তাঁর গদ্যে এই প্রাতিষ্ঠানিক ‘পাওয়ার স্ট্রাকচার’ বা ক্ষমতার জ্যামিতির গালে এমন এক চপেটাঘাত করেছেন, যা আমাদের ঢাকা কিংবা কলকাতা-কেন্দ্রিক সফিস্টিকেটেড মধ্যবিত্তীয় শ্লীলতাবোধের জন্য দারুণ অস্বস্তিকর। তিনি এমন এক মফস্বলীয়, প্রায়-লুম্পেনাইজড স্পেস থেকে তাঁর চরিত্রদের কুড়িয়ে আনেন, যা কোনো সুনির্দিষ্ট সমাজতাত্ত্বিক জরিপের খতিয়ানে কিংবা এনজিও-মার্ক্সবাদী ফ্রেমওয়ার্কে সহজে থিতু হতে চায় না।
অবহেলিত মানুষের জীবনযাপনের চিরাচরিত ডিসকোর্সে ভাঙন
বাংলা কথাসাহিত্যে অবহেলিত মানুষের জীবনযাপনের যে একটা চিরাচরিত ডিসকোর্স চালু আছে, যেখানে শোষিত চরিত্রদের এক ধরনের কৃত্রিম রেডিকেলিদমের পান্ডা বানিয়ে ফেলার একটা কালচারাল টেন্ডেন্সি দেখা যায়, দুয়েন্দে সেখানে হাঁটেননি। তাঁর চরিত্ররা কোনো মহান আদর্শের ঝান্ডা ধরে না; তারা অত্যন্ত কর্কশভাবে লজ্জিত, প্রবৃত্তির কাছে পরাজিত এবং এক ধরনের প্রাত্যহিক অস্তিত্ববাদী সংকটের ভেতর দিয়ে যাওয়া খণ্ডিত অবয়ব। আর এই পরাজয় বা গ্লানিকে তিনি কোনো মেটাফিজিক্যাল বা দার্শনিক উচ্চতায় নিয়ে গিয়ে পাঠককে সস্তা আত্মিক আনন্দ বা ‘ক্যাথারসিস’ উপহার দেন না, পাঠককে টেনে হিঁচড়ে নামিয়ে আনেন জীবনের সেই সমস্ত নগ্ন ও পিচ্ছিল খানাখন্দে, যেখানে সাহিত্য আর দৈনন্দিন টিকে থাকার লড়াইয়ের ঘাম, থুতু ও লালা একদম সমান্তরাল রেখায় এসে মিশে যায়।
ভাষিক প্রকৌশলের বৈপ্লবিক ব্যবহার
এই যে টেক্সটের ভেতরের অস্বস্তি বা ডিসকমফোর্ট, একে দৃশ্যমান করার জন্য দুয়েন্দে যে ভাষিক প্রকৌশল বা লিংগুইস্টিক স্ট্র্যাটেজি ব্যবহার করেন, তা এক কথায় বৈপ্লবিক। তিনি বাংলা গদ্যের সেই চিরাচরিত অলংকারপ্রিয়তা কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাকরণের চেনা হেজেমনি বা আধিপত্যকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করছেন। তাঁর আখ্যানের সিনট্যাক্স বা বাক্যগঠনগুলো লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সেগুলো অনবরত খণ্ডিত হচ্ছে, তোতলামির মতো হঠাৎ থমকে যাচ্ছে, কিংবা অসমাপ্ত অবস্থায় এক ধরনের কুয়াশাচ্ছন্ন আবহ তৈরি করছে। এই যে ভাষার ভেতরের ভাঙচুর, এটা কোনো নান্দনিক খামখেয়ালিপনা বা ফ্ল্যানারসুলভ বিলাসিতা নয়; চরিত্রের অবদমিত মনস্তাত্ত্বিক ট্রমা আর পারিপার্শ্বিক ক্লান্তিকেই গদ্যের শরীরে খোদাই করার এক জটিল পদ্ধতি।
কথ্য ভাষার কর্কশ স্ল্যাং ও আঞ্চলিক উচ্চারণ
দুয়েন্দে যখন কথ্য জীবনের কর্কশ স্ল্যাং বা আঞ্চলিক উচ্চারণগুলোকে তাঁর গদ্যের কেন্দ্রে নিয়ে আসেন, তখন তা কোনো সস্তা ‘লোকাল কালার’ দেওয়ার সদিচ্ছা থেকে আসে না; তা আসে প্রমিত ভাষার সেই বুর্জোয়া ডিসকোর্সকে আক্রমণ করার জন্য, যা দীর্ঘদিন ধরে প্রান্তিক মানুষের আসল কণ্ঠস্বরকে এক ধরনের ল্যাবরেটরি-পরিশোধিত মোড়কে বন্দি করে রেখেছে। তাঁর সংলাপের ভেতরের যে অসমাপ্তি কিংবা হঠাৎ-ফেটে-পড়া বিষণ্ন রসিকতা, তা পাঠককে এক গভীর নন্দনতাত্ত্বিক সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করায়, যা মগ্নপাঠ ছাড়া অনুধাবন করা কোনোমতেই সম্ভব নয়।
‘লাল ঘর’ ও ‘টিয়াদুর’-এ স্থানের রাজনীতি
আমরা যদি তাঁর বহুল চর্চিত অথচ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উপেক্ষিত টেক্সট ‘লাল ঘর’-এর দিকে তাকাই, তবে দেখব সেখানে স্পেস বা স্থানের যে পলিটিক্স, তা কীভাবে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বন্দিত্বের রূপক হয়ে উঠেছে। এই আখ্যানটি কোনো রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক কারাগারের গল্প ফাঁদে না, তা মানুষের নিজস্ব স্মৃতি, যৌন অবদমন, তীব্র অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা এবং এক ধরণের অস্তিত্ববাদী আতঙ্কের একাকার হয়ে যাওয়া এক ব্ল্যাকহোল। চরিত্ররা এই স্পেস থেকে অনবরত এসকেপ করতে বা পালাতে চায়, কিন্তু তাদের অবচেতনের ভেতরে এমন কিছু অদৃশ্য মেকানিজম সক্রিয় থাকে, যা তাদের ক্রমাগত সেই আদিম ভয়ের কেন্দ্রবিন্দুতেই আছড়ে ফেলে।
বিষণ্নতার দৈহিক ও মূর্ত উপস্থাপনা
দুয়েন্দে মানুষের এই ক্ষয় বা ডিকাই-কে কোনো বিমূর্ত কাব্যিক চাদরে ঢাকেন না; তাঁর গদ্যে বিষণ্নতা কোনো রোমান্টিক ধারণা নয়, তা সরাসরি মাংসপেশির খিঁচুনি, পেটের ক্ষুধা আর অনিদ্রার মতো অত্যন্ত দৈহিক ও মূর্ত সংকটের সাথে যুক্ত। অন্যদিকে, ‘টিয়াদুর’ গ্রন্থে বাস্তবতার যে বিনির্মাণ বা ফ্র্যাগমেন্টেশন ঘটে, তা আমাদের এক ধরনের অ্যাবসার্ড ডাইমেনশনের মুখোমুখি দাঁড় করায়, যেখানে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা আর সামাজিক অবক্ষয় একই সাথে ক্রিয়াশীল। এখানকার চরিত্ররা এতটাই ফ্র্যাকচার্ড বা ছিন্নভিন্ন যে, তারা নিজেরা যে ভাষা উচ্চারণ করছে, তার সত্যতা নিয়েও তাদের মনে সংশয় তৈরি হয়, ফলে তাদের আইডেন্টিটি বা আত্মপরিচয়ের ধারণাটি ক্রমাগত এক লিকুইড বা তরল অবস্থায় রূপান্তরিত হতে থাকে। স্বপ্ন এবং দুঃস্বপ্নের এই যে ইন্টারসেকশন, তা দুয়েন্দের গদ্যকে এমন এক পলিফোনিক বা বহুমাত্রিক রূপ দেয়, যা কোনো একরৈখিক বা দ্রুত পাঠের মাধ্যমে বোঝা অসম্ভব।
যৌনতার উপস্থিতি: ক্ষমতাহীনতা ও আত্মঘৃণার রূপক
এই আখ্যানবিশ্বে কাম বা যৌনতার যে উপস্থিতি, তাকেও আমাদের প্রথাবদ্ধ ফ্রয়েডীয় বা লিবাইডিনাল তত্ত্ব দিয়ে বিচার করতে যাওয়াটা হবে চরম বোকামি। দুয়েন্দে যখন নর-নারীর সম্পর্কের শরীরী দিকগুলো উন্মোচিত করেন, তখন সেখানে কোনো রোমান্টিক মহিমা বা সস্তা পর্নোগ্রাফিক উত্তেজনার উপাদান থাকে না। তাঁর চরিত্রদের যৌন আচরণ আসলে এক ধরনের ক্ষমতাহীনতা, গভীর ফ্রাস্ট্রেশন এবং আত্মঘৃণার মেটাফোর বা রূপক হিসেবে কাজ করে। বুর্জোয়া সমাজ যে নৈতিক মুখোশ পরে নিজেকে সবসময় পরিচ্ছন্ন ও সভ্য হিসেবে জাহির করতে চায়, তার নিচে যে অবদমিত আদিম ক্ষুধা ও হিংস্রতা লুকিয়ে আছে, দুয়েন্দে তাকে অত্যন্ত নির্মম ও ক্লিনিক্যাল নিপুণতায় ব্যবচ্ছেদ করেন। বাংলা সাহিত্যের অনেক তাত্ত্বিক যেখানে যৌনতাকে এক ধরনের কৃত্রিম রেডিকেলিদমের প্রতীক বানাতে চেয়েছেন, দুয়েন্দে সেখানে শরীরকে তার সমস্ত ব্যাধি, পচন ও কদর্যতাসহ উপস্থাপন করেন, যার ফলে যৌনতা এখানে কোনো আলাদা প্রদর্শনী না হয়ে, মানুষের সার্বিক অস্তিত্ব সংকটের সমার্থক হয়ে ওঠে।
মধ্যবিত্তীয় পারিবারিক কাঠামোর পচন
এর পাশাপাশি, মধ্যবিত্তীয় ফ্যামিলি স্ট্রাকচার বা পারিবারিক কাঠামোর ভেতরে যে গোপন পচন ও প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি রয়েছে—যেমন শিক্ষিত যুবকের বেকারত্বজনিত গ্লানি, সামাজিক লজ্জার ভয়, কিংবা পারিবারিক সম্পর্কের ভেতরের শীতল দূরত্ব—তাকে তিনি অত্যন্ত সূক্ষ্মতার সাথে টেক্সটভুক্ত করেছেন। তাঁর এই যে পলিটিক্যাল স্ট্যান্স বা রাজনৈতিক অবস্থান, তা কোনো নির্দিষ্ট দলীয় মতাদর্শ বা ইশতাহারের চর্বিতচর্বণ হয় না, তা মানুষের প্রাত্যহিক যাপনের একেবারে তলানি থেকে উঠে আসা এক ধরনের অবাধ্য অভিজ্ঞতা।
সাংস্কৃতিক পুঁজির রাজনীতি ও সাহিত্যিক একাকিত্ব
ইচক দুয়েন্দের এই যে সাহিত্যিক একাকিত্ব বা নিঃসঙ্গ পরিভ্রমণ, একে সমকালীন কালচারাল ক্যাপিটাল বা সাংস্কৃতিক পুঁজির রাজনীতির প্রেক্ষাপটে রেখে বিচার করা দরকার। তিনি এমন এক সময়ে সাহিত্যচর্চা করেছেন, যখন মিডিয়া, কর্পোরেট পুঁজি আর পুরস্কারের রাজনীতি সাহিত্যের মানদণ্ড নির্ধারণের মূল নিয়ামক হয়ে উঠেছে। দুয়েন্দে এই সমস্ত প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার বলয় থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ দূরে রেখেছিলেন। এই যে স্বেচ্ছায় বেছে নেওয়া আইসোলেশন বা মার্জিনালাইজেশন, এটাই তাঁর লেখাকে আরও বেশি তীক্ষ্ণ, আপোশহীন ও বিপজ্জনক করে তুলেছিল। বাংলাদেশের ছোট কাগজ বা লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের যে আদি ও অকৃত্রিম স্পিরিট—যা মূলধারার বাজার সংস্কৃতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে টিকে থাকতে চায়—দুয়েন্দে ছিলেন সেই ধারার এক নিঃসঙ্গ পথিক। তিনি চরিত্রের অন্ধকার দিকগুলোকে কোনো নৈতিক অনুশাসনের অধীনে এনে শোধন বা মহিমান্বিত করার চেষ্টা করেননি, যা আমাদের বহু চেনা জনপ্রিয় লেখক পাঠকপ্রিয়তা হারানোর ভয়ে প্রতিনিয়ত করে থাকেন। এই যে মানুষের ভেতরের কদর্যতাকে তার নিজস্ব নগ্নতায় মেনে নেওয়ার সততা, এটাই সমকালীন অন্য সব সাহিত্যিক ডিসকোর্স থেকে তাঁকে সম্পূর্ণ আলাদা করে এক অনন্য উচ্চতায় স্থাপন করে।
উত্তর-সত্য যুগে দুয়েন্দের প্রাসঙ্গিকতা
আজকের এই উত্তর-সত্য বা পোস্ট-ট্রুথ যুগে, যখন চারদিকে সাফল্যের চরম প্রচার, সেলফ-প্রমোশন, এবং ভোগবাদী সংস্কৃতির একচ্ছত্র আধিপত্য, তখন দুয়েন্দের সাহিত্য আমাদের এক ভিন্ন ও অস্বস্তিকর বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। তাঁর আখ্যানবিশ্ব আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সমাজের একটি বিশাল অংশ এখনও বেঁচে আছে তীব্র অনিশ্চয়তা, ক্ষুধা, অপমান আর ক্ষয়ে যাওয়া স্বপ্নের ভেতর দিয়ে, যা আমাদের প্রতিদিনের জিডিপি বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির খতিয়ানে কখনো দৃশ্যমান হয় না। ইচক দুয়েন্দের গদ্য আমাদের বিনোদন বা সস্তা আনন্দ দেওয়ার জন্য তৈরি হয়নি, তা তৈরি হয়েছে আমাদের চেতনার ভেতরের সেই গোপন ও অবদমিত ক্ষতগুলোকে স্পর্শ করার জন্য। সেই স্পর্শ হয়তো অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক ও অস্বস্তিকর, কিন্তু সমকালীন বাংলা কথাসাহিত্যের ইতিহাসে তা এক দীর্ঘস্থায়ী, অনিবার্য এবং অনপনেয় চিহ্ন হিসেবে চিরকাল থেকে যাবে, যা আমাদের সাহিত্যিক অসাড়তাকে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করতে থাকবে।



