অভিনেতা সিয়ামের অভিনয়সত্তার মধ্যে আদিম–উদ্ভ্রান্ত এক প্রেমিকসত্তা প্রবলভাবে কাজ করে। চাক্ষুষ দক্ষ–উদ্ভ্রান্ত সত্তা, সেটি যেকোনো নাটক বা চলচ্চিত্রের রূপসজ্জাশিল্পীরা ফুটিয়ে তোলেন। একটি সার্থক চলচ্চিত্র নির্মাণে পোশাকশিল্পী থেকে শুরু করে রূপসজ্জাশিল্পী—প্রত্যেকেরই যথেষ্ট অবদান থাকে; কিন্তু শুধু বাইরের দেখায় একটি চরিত্র পরিস্ফুটিত হয় না। ভালোবাসা দিয়ে অত্যন্ত যত্নে পরিশীলিত অভিনয়সত্তার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে হয়। এই যে লুঙ্গি পরা এক উদ্ভ্রান্ত যুবক বাসায় ঢুকে সোফার ওপরে উল্টে শুয়ে পড়ছে, লুঙ্গির ওপরে পশ্চাদ্দেশ চুলকাচ্ছে—এটিও একটি সার্থক অভিনয়ের মুদ্রা। বাস্তবে যেমনটি হয়, অভিনয়েও তেমন। এগুলো মনন–মেধা–সৃষ্টিশীলতা ও অনবরত অনুশীলনের মাধ্যমে আয়ত্ত করতে হয়।
আবার এ ধরনের উদাসীন–উদ্ভ্রান্ত প্রেমিকদের প্রেমিকারা খুব ভালোবাসেন। জীবন পোড়া মানুষের বিষণ্ণতাকে ঠিক এভাবেই পরম আদরে হৃদয়ে টেনে নেওয়া, মানুষ হয়ে মানুষের কর্তব্যও বটে। এখানে যেমন নূপুর চরিত্রে দীঘি, জনি চরিত্রের সিয়ামের নাকের ওপর চুমু আঁকে; ঠিক সেভাবে গালে বা সরাসরি ঠোঁটে চুম্বন আঁকলেও ক্ষতি ছিল না।
এ ধরনের বদমেজাজি আদিম–উদ্ভ্রান্ত প্রেমিকসত্তারা চুমুকাতর হয়, প্রেমিকার চুম্বন পেলে কেমন যেন ফণা নামিয়ে গলে যায়। মানব শরীরে মানবীর স্পর্শ এক শক্তিশালী ‘ঔষধি’ও বটে। যদিও কাহিনি অনুসারে নূপুর ভালোবাসার বিশ্বাস রাখেনি। তাঁর ক্ষণিকের চুম্বনটিও হয়তো মিথ্যা ছিল বা নিতান্তই ছিল ছেলেখেলা। তাই চুম্বন গিয়ে ঠেকেছে দংশনের মতো। জীবনের প্রতি জীবনের এই বিশ্বাসঘাতকতায় পিষ্ট জনি হয়ে উঠেছে ‘জংলি’। যদিও ঘটনার ঘনঘটায় এই জংলির উত্তরণ ঘটতে থাকে। এমন কিছু মুহূর্ত ও পরিস্থিতির মুখোমুখি আমরা হয়ে উঠি—সভ্য সমাজে কে বনমানুষ বা জংলি; আর কে আবরণে জংলি হয়েও ভেতরে একজন পরিপূর্ণ মানুষ, তা আমাদের সামনে পরিষ্কার হয়ে যায়।
জংলির জীবনে প্রেমের পাখি
জংলির জীবনে প্রেম হয়ে এসেছে একটি ছোট্ট পাখি। এই পাখি আবার ঘর থাকা সত্ত্বেও গৃহহীন। কারণ, দাম্পত্য কলহ নামের এক ভয়ানক পারিবারিক সন্ত্রাস তার শৈশব নষ্ট করে দিয়েছে। স্বামী–স্ত্রীর গৃহযুদ্ধ যে সন্তানের জীবনে কতটা মারাত্মক প্রভাব ফেলে, বর্তমান সমাজব্যবস্থার তার একটি জীবন্ত উদাহরণ উঠে এসেছে এই চলচ্চিত্রে। ঘরের পাখি এখানে বনে উন্মুক্ত হয়; আর বনের পাখি একজন জংলিকে মানুষ করে তোলে। তিথি নামের এক তরুণ চিকিৎসক চরিত্রে বুবলীর ভালোবাসায় সেই জংলিকে কানায় কানায় পরিপূর্ণ করে দেন। অর্থাৎ ভালোবেসে প্রত্যাখ্যাত হলে মানুষ উদ্ভ্রান্ত, পাগল, মাতাল ও ধ্বংসকামী হয়। আবার কারও জীবনের হৃদয় উপচে পড়া পাগল পাগল ভালোবাসা একজন মানুষকে সৃষ্টিশীল প্রেমিক করে তোলে। বুবলীর মতো চিকিৎসক বা উন্নত পেশার মানুষও সমাজে থাকেন, যাঁরা নিজের পেশার বা আরও ভালো চাকরি করা জীবনসঙ্গী খোঁজেন না। খোঁজেন একজন প্রিয় মানুষ। সেই মানুষের চালচুলো না–ও থাকতে পারে, তবে ভেতরে একটা প্রবল প্রেমিকসত্তা আছে। কানে স্টেথোস্কোপ রেখে এভাবে অনেকেই মানুষের হৃদয়ের কথা শুনতে পান।
নির্মাণশৈলী ও অভিনয়ের প্রশংসা
সমাজে প্রতিনিয়ত ঘটে চলা বাস্তব সত্য গল্পের টুকরা টুকরা ঘটনাকে মিলিয়ে এভাবেই সুন্দর, সংবেদনশীল একটি গল্প বুনেছেন আজাদ খান। ‘জংলী’ নামকরণে এই মানবিক গল্পকে অসামান্য চলচ্চিত্রায়িত করেছেন পরিচালক এম রাহিম। যেকোনো প্রেমের চলচ্চিত্রে আমরা বরাবর নায়ক–নায়িকার রসায়ন কতটা জমে উঠল, সেদিকে নজর দিই; কিন্তু এই নায়ক–নায়িকার রাসায়নিক বিক্রিয়ার পেছনে যে গবেষণাগারে একজন রসায়নবিদ, গবেষক ও বিজ্ঞানীর বড় অবদান থাকে, তা ভুলে যাই। জংলির কাহিনি ত্রিভুজ প্রেমের গল্প হয়ে উঠতে পারত; সে ক্ষেত্রেও দীঘি–সিয়াম–বুবলী রসায়ন কেমন জমে উঠেছে, সেদিকে নজর পড়ত; কিন্তু এই গল্প ত্রিভুজ প্রেমে বাজিমাত করতে চায়নি, আবার শুধু সিয়াম-বুবলীর রসায়নেও আমাদের আটকে রাখেনি।
নৈঋতা হাসিন রৌদ্রময়ী নামের ছোট্ট অভিনেত্রী পাখি চরিত্রে এসে চলচ্চিত্রের মানবিক প্রেমের চিরাচরিত চিন্তাধারাকে আমূল বদলে দিয়েছে। এখানে সে হয়ে উঠেছে যাবতীয় ক্রিয়া–বিক্রিয়ার অনুঘটক। গল্পের চাবিকাঠি আর প্রেমের এই বহুমুখী ধারার ক্রিয়া–বিক্রিয়ার একজন সার্থক রসায়নবিদ বিজ্ঞানী হয়ে উঠতে পেরেছেন পরিচালক এম রাহিম।
বুবলীর মতো শিশুশিল্পী নৈঋতার সুন্দর অভিনয় বহুদিন মনে থাকবে। এই শিশুশিল্পীকে বুবলীর অতীত বা বুবলীকে এই শিশুশিল্পীর ভবিষ্যৎ হিসেবেও ভাবা যেতে পারে। আবার সিয়ামের সঙ্গে নৈঋতার সখ্য দৃশ্য সত্যজিৎ রায়ের ‘অপুর সংসার’ চলচ্চিত্রের সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে শিশুশিল্পী অলক চক্রবর্তীর কালজয়ী ঐতিহাসিক সখ্যমুহূর্ত দৃশ্য মনে করিয়ে দেয়।
সামাজিক বার্তা ও চরিত্রায়ন
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন আমাদের সবার হাতে এনে দিয়েছে নিজস্ব প্রচার মিডিয়া। সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে যেকোনো প্রকারে ভাইরাল হওয়ার ইঁদুরদৌড়। এই সহজলভ্য প্রচারমাধ্যম বা ভাইরাল হওয়ার নেশাকে আমরা ভালো কাজেও ব্যবহার করতে পারি, আবার খারাপ কাজেও লাগাতে পারি। সাম্প্রতিক সময়ের তেমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র এখানে নিয়ে আসা হয়েছে ‘সুজন শাহ’। প্রথম দিকে সে খারাপ কাজ করলেও শেষ মুহূর্তে পাখিকে বাঁচাতে যেভাবে সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে সামাজিক আবেদন সৃষ্টি করল, তা অসাধারণ। এই অসামান্য চরিত্রটিকে যথাযথভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন অভিনেতা রাশেদ মামুন অপু। আইনজীবী শরাফত চৌধুরী চরিত্রে শহীদুজ্জামান সেলিম এখানেও নজরকাড়া অভিনয় করলেন। আইন–আদালত মানুষের রক্ষাকর্তা; কিন্তু আমাদের বিচার বরাবরই যুক্তি ও প্রমাণসাপেক্ষ। এ ক্ষেত্রে বড় আইনজীবীরা যে যুক্তির জাল সাজিয়ে বড় মিথ্যাকেও সত্য বলে জাহির করতে পারেন, বিচারব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করতে পারেন, সেই দৃষ্টান্ত উঠে এসেছে। যদিও জনতার আদালতে শেষ পর্যন্ত মিথ্যা ধোপে টেকেনি।
আমাদের সমাজের গাঢ় অন্ধকার দিককে শিল্পায়িত করে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন পরিচালক। মূল বিচারক চরিত্রে আফসানা মিমিকে ভালো মানিয়েছে। বিচারককে একদিকে যেমন কঠোর হতে হয়, আবার মায়াবী নরম মনের সংবেদনশীলও হতে হয়। মিমির মুখে সেই ছাপ আছে। আসামিপক্ষের উকিল চরিত্রে অভিনেতা শিবলুকে আরেকটু ভালোভাবে ব্যবহার করা যেতে পারত। শহীদুজ্জামান সেলিমের চরিত্রটিকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে তাঁর ভাগে সময় এবং যথাযথ সংলাপ কম এসেছে। বুবলীর দাদির চরিত্রে দিলারা জামানকে ভালো লাগে। বুবলীকেও দেখতে বেশ ভালো লেগেছে। পাখির হারিয়ে যাওয়ার দৃশ্য বড় বেদনাদায়ক। সব সম্পর্কের যখন জোড়া লাগার সময় এসেছে, তখন সবার মধ্যে মানবতাবোধ জাগিয়ে তুলে হারিয়ে গেছে পাখি।
শিশু নির্যাতন ও সামাজিক শিক্ষা
শিশুদের ওপর শারীরিক নির্যাতনের বিষয়টা নিয়ে এসে পরিচালক সময়োপযোগী আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন। আবার কন্যাশিশুকে কোনটা ‘গুড টাচ’ এবং কোনটা ‘বেড টাচ’ এবং কীভাবে আত্মরক্ষা করা যাবে, তা শেখানোর চেষ্টা করা একটা অতি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক শিক্ষা। বাণিজ্যিক ধারার চলচ্চিত্র এভাবে শিক্ষণীয় বিষয়বস্তু উপস্থাপন করতে পারে; এবং তা করলে তার আবেদন সুদূরপ্রসারী হবে তা বলাইবাহুল্য।
ঘরের ভেতরে এক মাতাল ও শিশুকন্যার লুকোচুরির দৃশ্য বেশ আনন্দদায়ক। এই দৃশ্যগুলোর বুনন ও কারিগরি দক্ষতা বিদেশি চলচ্চিত্রের কথা মনে করিয়ে দেয়। আবার লুঙ্গি পরা নায়ক খাঁটি বাংলাদেশের নায়কের পরিচয় বহন করেন। মারপিটের দৃশ্যের মধ্যেও নতুনত্ব আছে। যখন মনে হচ্ছিল নায়ক হাতের ক্রিকেট ব্যাট দিয়ে সবাইকে পেটাবে, তখন ব্যাট ব্যবহার না করেও সে সক্রিয় থেকেছে। অর্থাৎ নায়ক অস্ত্র ছাড়াও মগজঅস্ত্র ব্যবহার করেও লড়তে পারে। ফুটবল খেলার মাঠে টাইব্রেকারে আমাদের যেমন মনে হয় খেলোয়াড় ডান দিকে কিক করবেন, গোলকিপার সেভাবে প্রস্তুত; কিন্তু দেখা গেল—গোলকিপার ও দর্শক সবাইকে ভেলকি দিয়ে বাঁ দিকে গোল ঢুকিয়ে দিয়েছে। আর আমরা জানি, চলচ্চিত্রে মারপিটের দৃশ্য বিশ্বাসযোগ্য করে সাজানোর জন্যও আড়ালে ফাইট মাস্টার, উপযুক্ত দৃশ্যধারক ও সম্পাদক থাকেন।
সঙ্গীত, আবহ ও শেষাংশ
বাংলাদেশের এখনকার চলচ্চিত্র কোনো দিক থেকেই পিছিয়ে নেই। ছবির সংগীত পরিচালনা করেছেন প্রিন্স মাহমুদ। গানগুলো ভালো লাগে। আবহ সুর ও রংবিন্যাস ভালো লাগে। সর্বশেষ অংশে সবাই মিলে যে একটি বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা খুলে মানুষের সেবায় ব্রতী হয়ে উঠেছে, এই সামাজিক আবেদনও অতি উত্তম। পাখি ও জংলির জীবন থেকে অনুপ্রেরণা পেয়ে একজন মা নিজের নবজাত সন্তানকে মাতৃত্বের পরিচয়ে মানুষ করার শপথ নিচ্ছেন—যিনি কিনা এই শিশুকে ডাস্টবিনে ফেলে রেখে এসে বাঁচতে চেয়েছিলেন।
এই চলচ্চিত্রের গল্প তাই শুধু সিয়াম–বুবলীর চরিত্রের প্রেমের গল্প নয়, এই গল্প মানবিকতার ও প্রেমের বহুমুখী ধারায় বেঁচে থাকার, বেঁচে ওঠার, বাঁচিয়ে রাখার—সবাইকে নিয়ে সুন্দর সমাজ গড়ে তুলতে চাওয়ার গল্প। পাখির জন্য সবার চোখের জল দিয়ে সবাই একটি আকাশ ছুঁয়ে ফেলল, এক আকাশের নিচে আনন্দাশ্রুর মাটি খুঁজে পেল।



