বরেণ্য চিত্রশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই, বয়স হয়েছিল ৯০ বছর
বরেণ্য চিত্রশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই

বরেণ্য চিত্রশিল্পী, নির্মাতা ও পাপেট আন্দোলনের পথিকৃৎ মুস্তাফা মনোয়ার সোমবার সকালে রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। দীর্ঘদিন ধরে নিউমোনিয়া ও প্রোস্টেট ক্যানসারে ভুগছিলেন তিনি। চলতি মাসের মাঝামাঝি থেকে তিনি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন ছিলেন।

শৈল্পিক জীবন ও পরিচিতি

মুস্তাফা মনোয়ারকে ‘বাংলাদেশের পাপেটম্যান’ ও শিশুদের প্রিয় ‘মীনা’ চরিত্রের স্রষ্টা হিসেবে পরিচিত। তার সৃষ্টি ‘পারুল’ চরিত্র দেখে ইউনিসেফের র্যাচেল কার্নেগি অনুপ্রাণিত হন, যা থেকে জন্ম নেয় দক্ষিণ এশিয়ার কোটি শিশুর পরিচিত চরিত্র ‘মীনা’। চিত্রশিল্পী হিসেবে আন্তর্জাতিক খ্যাতি ছিল তার; আর্ট কলেজে পড়ার সময় জলরঙে তার কাজের প্রশংসা করেছিলেন কিংবদন্তি নির্মাতা সত্যজিৎ রায়।

জীবনদর্শন

২০১৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর নিজের জন্মদিনে চ্যানেল আইয়ের অনুষ্ঠান ‘তারকা কথন’-এ অতিথি হয়ে মুস্তাফা মনোয়ার বলেছিলেন, ‘বয়সটা দুই রকম। একটা অঙ্কের ব্যাপার, আরেকটা মনের তৃপ্তির ব্যাপার। পৃথিবীকে দেখার ব্যাপার, পৃথিবীকে ভালোবাসার ব্যাপার। সেইখানে বয়স বাড়ে না।’ তিনি আরও বলেছিলেন, ‘জন্মদিন মানেই একটা বছর বেড়ে যাওয়া। ছোটবেলায় খুব ভালো লাগত। একসময় দেখলাম বড় হওয়া তো ভালো না, ছোট থাকাই ভালো।’

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সাংস্কৃতিক অবদান

ভাষা আন্দোলনের সময় স্কুলে পড়ার সময় ভাষা আন্দোলন নিয়ে কার্টুন এঁকে এক মাস কারাবন্দী হয়েছিলেন। পরে চারুকলার শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে পাকিস্তান টেলিভিশনের ঢাকা কেন্দ্রে যোগ দেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনের ইতিহাসে তার অবদান অনন্য; রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রক্তকরবী’, মুনীর চৌধুরীর ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’ ও শিশু-কিশোরদের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘নতুন কুঁড়ি’—সবখানেই ছিল তার সৃজনশীলতার ছাপ।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গানের প্রতি ভালোবাসা

গান ছিল মুস্তাফা মনোয়ারের আরেক ভালোবাসা। কলকাতায় ওস্তাদ ফাইয়াজ খাঁর শিষ্য সন্তোষ রায়ের কাছে তালিম নিয়েছিলেন। শিল্পী নির্মলেন্দু চৌধুরীর দলে তিন বছর গান করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় ওয়াহিদুল হক ও সনজীদা খাতুনের উদ্যোগে গড়ে ওঠা সাংস্কৃতিক দলের সঙ্গে দেশাত্মবোধক গান গেয়ে বিভিন্ন স্থানে ঘুরেছেন। তবে শেষ পর্যন্ত গান ছেড়ে দেন। কয়েক বছর আগে প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘অনেক চর্চা করতে হয়। তা ছাড়া বাঁধাধরা জিনিস ভালো লাগে না। গানে তাল আছে। বড় ওস্তাদেরা টান দিয়ে তালে ফিরতে পারেন। আমি পারতাম না।’

শেষ জীবন ও মৃত্যু

মুস্তাফা মনোয়ার সব ছেড়ে আজ সকালে চিরবিদায় নিয়েছেন। কিন্তু তার বলা একটি কথাই যেন তার জীবনকে সবচেয়ে সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করে—‘পৃথিবীকে ভালোবাসার বয়স বাড়ে না।’ সম্ভবত এ কারণেই মুস্তাফা মনোয়ার কখনো সত্যিকার অর্থে বৃদ্ধ হননি। বয়সের হিসাবে তিনি ৯০; কিন্তু শিল্পের ভুবনে তিনি চিরকালই রয়েছেন এক কৌতূহলী, স্বপ্নবাজ, শিশুমনের মানুষ।