আব্বার শেষ জন্মদিন: ৬৬ বছরে চলে যাওয়ার আগে শেষ কথোপকথন
আব্বার শেষ জন্মদিন: ৬৬ বছরে চলে যাওয়ার আগে শেষ কথোপকথন

পাঁচ বছর আগে ১ জুন আমার প্রিয় আব্বার জন্মদিন ছিল। সেই দিনটি এখনো স্পষ্ট মনে আছে। ঘুম থেকে উঠে প্রথম কাজ ছিল আব্বাকে ‘হ্যাপি বার্থডে’ বলা। আব্বা প্রগতিশীল ছিলেন, জন্মদিনের শুভেচ্ছা সানন্দে গ্রহণ করতেন।

শেষ জন্মদিনের কথোপকথন

১ জুন ২০২১। আমি আব্বাকে বললাম, ‘আব্বা, হ্যাপি বার্থডে! তুমি তো বুড়া হয়ে গেলা আব্বা! আজ তোমার ৬৬ বছর হয়ে গেল!’ আব্বা হেসে বললেন, ‘অনেক ধন্যবাদ মা! এক তুমি ছাড়া কেউ মনে রাখে না মা!’ আমি বললাম, ‘আপু তো এখনো ঘুম থেকে ওঠেনি মনে হয়!’ তারপর যোগ করলাম, ‘আব্বা, আমি দোয়া করি তুমি শতায়ু হও। তোমার নাতি-নাতনিরা ডাক্তার হবে, তুমি দেখে যাবে।’ আব্বার তীব্র ডাক্তারপ্রীতি ছিল, কিন্তু আমরা দুই বোন কেউই ডাক্তার হতে পারিনি।

আব্বা আমাকে অবাক করে দিয়ে ‘ইনশা আল্লাহ’ বললেন না; বরং বললেন, ‘ওত দিন কি আর আমি বাঁচব মা?’ ইদানীং মনে হয়, আব্বা হয়তো তখনই বুঝতে পেরেছিলেন। কারণ, সেই বছরের সেই মাসেরই শেষ দিন, ৩০ জুন, আব্বা পৃথিবীর জীবনের পাঠ চুকিয়ে যাত্রা করলেন অনন্ত জীবনে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

১৩ নম্বরের তাৎপর্য

আব্বা প্রায়ই বলতেন, ১৩ তাঁর জন্য লাকি নাম্বার। ১৩ অক্টোবর তাঁর বিবাহবার্ষিকী। ১৩ নভেম্বর আমার দাদার ইন্তেকালের দিন। ১৩ জানুয়ারি তাঁর ছোট আম্মার জন্মদিন। আর আব্বার বহুল প্রত্যাশিত পদোন্নতিও তিনি পেয়েছিলেন ১৩ তারিখেই।

হাসপাতালের শেষ দিনগুলো

৩০ জুন সকালে আব্বা আমাকে বললেন, ‘আজ কত দিন হলো আমি এই হাসপাতালে আছি?’ তারপর নিজেই আঙুল গুনে হিসাব করলেন, ‘শুক্রে শুক্রে আট দিন, আর শনি, রবি, সোম, মঙ্গল, আজ বুধ—পাঁচ দিন। আজ ১৩ দিন আমি হাসপাতালে। ওরা আমার চিকিৎসা করে না মা, ডাক্তারও দেখে না!’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আব্বা করোনার ডেলটা ধরনে আক্রান্ত ছিলেন, যার কারণে ৯৫% ফুসফুস বিকল হয়ে গিয়েছিল, সঙ্গে ছিল উচ্চমাত্রার ডায়াবেটিস ও স্থূলতা। তিনি আইসিইউতে ঘণ্টায় ৮০ লিটার অক্সিজেন নিচ্ছিলেন। ডিউটি ডাক্তার আপুকে বলে দিয়েছিলেন ‘আপনার বাবার হাতে সর্বোচ্চ আর দুই দিন সময় আছে।’ তবু আব্বার শেষ ইচ্ছার কথা ভেবে আপু হাসপাতাল পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিলেন। নতুন হাসপাতালে আব্বা মাত্র ত্রিশ মিনিট ছিলেন, তা–ও লাইফ সাপোর্টে।

আক্ষেপ ও ভালোবাসা

আমার মনে হচ্ছিল, কেউ যেন আমাকে বেঁধে রেখে আমার বুকের ভেতর থেকে কলিজাটা ছিঁড়ে নিয়ে যাচ্ছে। বারবার মনে হচ্ছিল, এখন থেকে আমার জন্য তাহাজ্জুদের সেজদায় কেঁদে কেঁদে দোয়া করবে কে? আমি কেন আব্বার শেষ সময়ে সারাক্ষণ পাশে থাকতে পারলাম না? কেন একটি রাতও তাঁর সেবা করে কাটাতে পারলাম না?

আম্মার মুখে শুনেছি, ছোটবেলায় একবার দুষ্টুমি করতে গিয়ে আমার সামনের দুটি দাঁত একসঙ্গে মাড়ির ভেতরে ঢুকে গিয়েছিল। আব্বা একটি বের করতে পারলেও আরেকটি পারেননি। পরে ডেন্টিস্টের সহযোগিতায় সেটি বের করা হয়। সেদিন মাড়ির রক্তক্ষরণ আর ব্যথায় আমি সারা দিন দুধও খেতে পারিনি। সারা দিনের ধকলের পরও সেই পুরো রাত আব্বা সজাগ ছিলেন... তাঁর ক্ষুধার্ত মেয়ের জন্য। চামচের ডগায় ফোঁটা ফোঁটা করে দুধ দিয়ে সারা রাতে এক ফিডার দুধ খাইয়েছিলেন আব্বা!

আমি কেবলই ভাবি, এই ঋণ কীভাবে শোধ করব! আমি তো আব্বার জন্য তেমন কিছুই করতে পারিনি। আইসিইউতে অ্যাটেনড্যান্টের অনুমতি না থাকায় আমাদের তো আব্বা সব আক্ষেপ বয়ে বেড়ানো থেকে দায়মুক্ত করে গেছেন। একটা রাতও জেগে থাকতে হয়নি তাঁর জন্য! একরাশ আক্ষেপ দিয়ে আব্বা চলে গেলেন আল্লাহর মেহমান হয়ে।

আব্বার দোয়া ও ভালোবাসা

আমি খুব মিস করি, আমার সব মুশকিল আসান করে দেওয়া সব সময় দোয়া করা আব্বাকে। আব্বার দোয়ার প্রতি আমার অটল বিশ্বাস ছিল, আব্বার যেমন ছিল তাঁর অঙ্কের প্রতি! অঙ্ক সমাধান করলে, আব্বা উত্তরমালা দেখার আগেই বলতেন, ‘রাখ বেটি! তোর বাপ অঙ্কের জন্ম দেয়! মিলবে না মানে, ওর বাপ মিলবে!’ আসলেই সব মিলত! আব্বার দোয়াও ছিল তেমনি অব্যর্থ! আব্বা দোয়া করেছেন, অথচ তা কবুল হয়নি—এমন কিছু আমার মনে পড়ে না।

আমার আক্‌দের দিন উপস্থিত এক ভাই বলেছিলেন, ‘লিয়া, তোমার আব্বা কেমন মানুষ ছিলেন, তোমাদের বিয়ের মোনাজাতে তাঁর কান্না দেখেই তা বোঝা যায়।’ সত্যিই, আমার বিয়ের মোনাজাতে দুজন মানুষ কেঁদেছিল আব্বা আর আমি।

আমার আব্বা ছিলেন একজন সহজ–সরল, সত্যবাদী, অল্পতে তুষ্ট ভালো মানুষ। মেহমান দেখলেই খুব খুশি হতেন; খেতে ভালোবাসতেন, খাওয়াতে ভালোবাসতেন! উপহার পছন্দ করতেন! উদ্‌যাপনও পছন্দ করতেন! আমার ভেতরের যতটুকু ভালোবাসা আছে, তার সবটাই আমি পেয়েছি আব্বার কাছ থেকে।

আমি আব্বার সঙ্গে কাটানো আমার দুর্দান্ত শৈশব আর কৈশোরের নানা রঙের দিনগুলো প্রচণ্ড মিস করি। আবার আব্বাকে দেখার প্রত্যাশায় আমার তৃষ্ণার্ত চোখ আজও তাঁকেই খুঁজে বেড়ায়। সবাই আমার আব্বার জন্য দোয়া করবেন। আল্লাহ যেন তাঁকে অনন্ত জীবনে সর্বোত্তম শান্তি ও মর্যাদা দান করেন। আর আমাকেও যেন তাঁর সান্নিধ্যের যোগ্য বানান, যেন আবারও তাঁকে জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানাতে পারি!