বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে আবৃত্তির স্বতন্ত্র বিভাগ বিলোপ: ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্রের আত্মহননের শঙ্কা
আবৃত্তির স্বতন্ত্র বিভাগ বিলোপ: ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্রের আত্মহনন

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে আবৃত্তির স্বতন্ত্র বিভাগ বিলোপ: ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্রের আত্মহননের শঙ্কা

যখন একটি স্বাধীন রাষ্ট্র তার সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারে হাত দেয়, তখন প্রত্যাশা থাকে তা হবে শেকড়মুখী ও যুগোপযোগী। কিন্তু বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির নতুন সংশোধিত অধ্যাদেশ ২০২৬-এ 'আবৃত্তি' মাধ্যমটিকে স্বতন্ত্র বিভাগের মর্যাদা থেকে সরিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত কেবল হতাশাজনক নয়, বরং জাতীয় পরিচয়ের সাথে সাংঘর্ষিক।

প্রশাসনিক রদবদল নাকি সাংস্কৃতিক আত্মহনন?

কর্তৃপক্ষের দাবি, আবৃত্তিকে বাদ দেওয়া হয়নি, বরং 'পারফর্মিং আর্ট' বা পরিবেশনা শিল্পের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, অধ্যাদেশে আবৃত্তি শব্দটিই উল্লেখ নেই, যা প্রশাসনিক নথিতে একটি কাঠামোগত রদবদল মনে হলেও ভাষাভিত্তিক সংগ্রামের দেশে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও চর্চার জন্য মারাত্মক আঘাত।

আবৃত্তির স্বাতন্ত্র্য বিলোপের যুক্তি হিসেবে বলা হচ্ছে, এটি একটি পারফর্মিং আর্টের অংশ। কিন্তু এই যুক্তি জ্ঞানতাত্ত্বিক দীনতা প্রকাশ করে। পারফর্মিং আর্টের ছাতার নিচে নাটক, সংগীত, নৃত্য থাকলেও সেগুলো আলাদা বিভাগ হিসেবে টিকে আছে। আবৃত্তিরও নিজস্ব প্রশিক্ষণ বিজ্ঞান, ব্যাকরণ ও প্রকাশভঙ্গি রয়েছে, যা সংগীত বা নাটক থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আবৃত্তির স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব

আবৃত্তি কোনো চরিত্রের অভিনয় নয়; এটি শব্দের ধ্বনিমাধুর্য, প্রমিত উচ্চারণ, ছন্দতত্ত্ব ও কবির দর্শনকে কণ্ঠে ধারণ করে দর্শকের সাথে আত্মিক যোগাযোগ স্থাপন করে। এর ভিত্তি ভাষাবিজ্ঞান, ধ্বনিতত্ত্ব ও পাঠ বিশ্লেষণ, যা একে একটি স্বতন্ত্র শিল্প ও বিজ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও গণঅভ্যুত্থানে কবিতা ও আবৃত্তি প্রধান অস্ত্র হিসেবে কাজ করেছে। যে শিল্পমাধ্যম স্বাধিকার সংগ্রামে প্রভাবকের ভূমিকা রেখেছে, তার প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি কেড়ে নেওয়া চরম অকৃতজ্ঞতার শামিল।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তৃণমূল পর্যায়ে সংকট ও ভবিষ্যতের হুমকি

ঢাকা-কেন্দ্রিক চিন্তার বাইরে গিয়ে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের শিল্পকলা একাডেমিগুলোর দিকে তাকালে এই সিদ্ধান্তের ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়। দেশজুড়ে হাজার হাজার শিশু-কিশোর ও তরুণ আবৃত্তি প্রশিক্ষণের সাথে যুক্ত। কেন্দ্রীয়ভাবে স্বতন্ত্র বিভাগ না থাকলে জেলা পর্যায়ে বাজেট, প্রশিক্ষক ও কারিকুলাম ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাবে, মানসম্মত আবৃত্তিশিল্পী তৈরির পথ রুদ্ধ হবে এবং প্রমিত বাংলার চর্চা ব্যাহত হবে।

সাংস্কৃতিক মেরুদণ্ড রক্ষার আহ্বান

বাংলাদেশের সংবিধান রাষ্ট্রকে ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণের দায়িত্ব দিয়েছে। আবৃত্তি কেবল একটি শিল্প নয়, এটি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পাহারাদার। প্রশাসনিক ব্যয় সংকোচনের দোহাই দিয়ে এই মৌলিক শাখাকে দুর্বল করা রাষ্ট্রীয় চেতনার পরিপন্থী।

আমরা সংস্কারের বিরোধী নই, কিন্তু 'সংস্কার'-এর নামে শেকড় কর্তন মেনে নেওয়া যায় না। আবৃত্তির স্বাতন্ত্র্য বিলোপ বাংলা ভাষার শক্তিকে অস্বীকার করার সমান। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোরালো দাবি, অবিলম্বে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির অধ্যাদেশে আবৃত্তিকে পূর্ণ স্বাতন্ত্র্যসহ আলাদা বিভাগ হিসেবে পুনর্বহাল করতে হবে। সংস্কৃতির শেকড় কেটে দিয়ে কখনো ডালপালার বিস্তার সম্ভব নয়—এই সত্য দ্রুত অনুধাবন করা জরুরি।