ইডেন কলেজের ছাত্রী জান্নাতুল তাজরিয়া অরার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের মামলায় গায়ক জাহিদ অন্তু কারাগারে
ঢাকার একটি আলোচিত ঘটনায়, ইডেন কলেজের ছাত্রী ও অভিনেত্রী জান্নাতুল তাজরিয়া অরার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে তরুণ গায়ক আবু জাহিদ ওরফে জাহিদ অন্তুকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। বুধবার (১ এপ্রিল) তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসান শাহাদাত তাকে কারাগারে প্রেরণের আদেশ দেন। এরপর জান্নাতুল তাজরিয়া অরা একটি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দেন, যা সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ
জান্নাতুল তাজরিয়া অরা সংবাদ সম্মেলনে বলেন, "আমার নাম জান্নাতুল তাজরিয়া অরা। আমি একজন অভিনেত্রী, পাশাপাশি স্টুডেন্ট। তার নাম আবু জাহিদ ওরফে জাহিদ অন্তু। আপনারা সবাই কমবেশি তাকে চেনেন। সে একজন গায়ক। তা ছাড়া একজন তরুণ ব্যবসায়ীও বলতে পারেন। সে বেশকিছু প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করছে। তার ড্রেসের এবং প্রোডাক্টের কিছু শুট হয়।"
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, সম্প্রতি প্রোডাক্ট শুটের জন্য জাহিদ অন্তু তাকে নক করেছিল এবং তার বাসায় আসার অনুরোধ জানায়, যেখানে তার স্টুডিও ও অফিস অবস্থিত। অরা বলেন, "সে অ্যাগ্রো ফরেস্ট নামের নতুন একটা প্রজেক্টে কাজ করছে। সঙ্গে তার পোশাকের ব্যবসাও আছে। সেই উদ্দেশে আমি তার বাসায় গিয়েছিলাম। প্রোডাক্ট শুট করার জন্য গিয়েছিলাম।"
কিন্তু কাজের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনার সময় জাহিদ অন্তু হঠাৎ করে আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। অরা বর্ণনা করেন, "একটা পর্যায়ে সে বলল যে প্রোডাক্ট শুট তো ঠিক আছে, এখন তো ড্রেস আসেনি। ১০-১২ দিন লাগবে। এসব বলার পর সে আমার প্রতি ফিজিক্যাল হ্যারাসমেন্ট শুরু করল এবং সেটাকে বলতে পারেন যৌন নিপীড়ন বা যৌন অত্যাচার।"
নিপীড়নের চিত্র
জান্নাতুল তাজরিয়া অরা বলেন যে তিনি বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও জাহিদ অন্তু তাকে মারাত্মকভাবে আঘাত করে। "আমি এটা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলাম। সেখান থেকে সে আমার উপরে অত্যাচার শুরু করল এবং আমাকে দেখতেই পারছেন যে কীভাবে জখম করা হয়েছে। সে বারবার আমার গলা চেপে ধরছিল বিছানার মধ্যে এবং দরজা বন্ধ করে আমাকে অনেকগুলো থাপ্পড় দিয়েছে, চুল ধরে টেনেছে।"
তিনি আরও যোগ করেন, "আমি বারবার ওখান থেকে পালিয়ে আসার চেষ্টা করেছি। কিন্তু সে বারবার দরজা বন্ধ করছিল এবং বারবার মারছিল বলে আমি এখান থেকে খুব সহজে বের হতে পারছিলাম না। তারপরও একটা সময় যে আমি কোনোভাবে ওখান থেকে বের হয়ে আসি।"
পূর্বের সম্পর্কের ইতিহাস
জান্নাতুল তাজরিয়া অরা প্রকাশ করেন যে তাদের মধ্যে আগে থেকেই একটি সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। "কয়েকদিন না, আসলে তার সঙ্গে আমার আগে থেকে সম্পর্ক ছিল। তার সঙ্গে আমার প্রেম-ভালোবাসার সম্পর্কই ছিল। সেটা দেখা যায় যে অনার্স ফার্স্ট ইয়ারে যখন আমি পড়ি তখন থেকেই। তখন তার কাছে আমার গিটার শেখা হতো। মূলত সেখান থেকে আমাদের পরিচয়টা হয়েছিল।"
তিনি বলেন, "তারপর একটা সময় পর তার সঙ্গে আমার একটা প্রেমের সম্পর্ক হয়। কিন্তু প্রেমের সম্পর্ক প্রথমে হয় না। সে তার বাসায় আমাকে ডেকেছিল। কারণ আমি গিটার শিখতাম এবং বাসায়ও গিটার শেখার নামে এবং গল্প আড্ডা নামে সে আমাকে বাসায় ডাকে এবং আমি যাই। যাওয়ার পরে সে আমাকে কোনোকিছু না বলেই সে আমার সঙ্গে ইন্টিমেট হয়। এটা আমার অনিচ্ছায়, এটা একটা রেপ ছিল।"
অরা আরও উল্লেখ করেন যে জাহিদ অন্তু তাকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু পরে তা অস্বীকার করে। "যার কারণে আমি সেটা নিয়ে পরে কথা বলি যে এটার পরিণতি কী? আসলে এক্ষেত্রে আমি বিয়ে করতে চাই বা একটা সম্পর্ক থাকুক। সে আমাকে একটা প্রতিশ্রুতি দেয়, একটা বিয়ের প্রতিশ্রুতি দেয়, একটা সম্পর্কের নিশ্চয়তা দেয়। সেখান থেকে আমাদের মধ্যে আস্তে আস্তে একটা প্রেম-ভালোবাসার সম্পর্কে যায়।"
সম্পর্কের অবনতি ও বর্তমান ঘটনা
সম্পর্কটি ধীরে ধীরে খারাপ হতে থাকে, এবং জাহিদ অন্তু বিয়ে করতে অসম্মতি জানায়। অরা বলেন, "এটা চলতে থাকে। তারপরও একটা পর্যায়ে সে সম্পর্কটাকে অস্বীকার করা শুরু করে, সে বিয়ে করতেও চায় না এবং এই সম্পর্কটাকেও আর এভাবে গুরুত্ব দিচ্ছিল না। তারপর মিউচুয়ালি আমি এখান থেকে মুভ অন করার চেষ্টা করেছি যে ইটস ওকে।"
তিনি আরও বলেন, "মিউচুয়ালি আমরা কথা বলা অফ করে দিয়েছিলাম। আমিও তার সঙ্গে রেসপন্স করতাম না। সেও নক করত না। কিন্তু সে মাঝে মাঝে তার মনে পড়লে আমাকে নক করতো বা তার বাসায় আসার প্রলোভনা দেখাতো। বিভিন্ন কারণে কখনো প্রোডাক্ট শুটের নামে বা আপনার কিছু জিনিস আমার বাসায় রয়ে গেছে, এসব বলে আমাকে আসতে বলতো।"
সাম্প্রতিক যোগাযোগের প্রসঙ্গে অরা বলেন, "তারপর সম্প্রতি তার সঙ্গে আমার আবার যোগাযোগ হয়। প্রোডাক্ট শুটের যে বিষয়টা বললাম। আমি যেহেতু একটা গ্যাপ স্টার্ট করে ফেলেছি, যেহেতু সে বিয়ে কিংবা সম্পর্কের নিশ্চয়তা দিতে চাচ্ছে না, তাই আমিও তার সঙ্গে সেরকম কোনো সম্পর্ক রাখতে চাচ্ছিলাম না।"
তিনি শেষ করেন, "যেহেতু এখন সে ব্যবসা শুরু করছে এবং আমি বাইরে মডেলিং এবং অভিনেত্রী হিসেবে কাজ করছি, তার কারণে প্রোডাক্ট শুটের বিষয় আমাদের একটা প্রফেশনের জায়গা থেকে কাজ করার কথা ছিল একসঙ্গে। একটা গুড রিলেশন আগে তো ছিল সেটা এবং মডেলিংয়ের খাতিরে। কিন্তু সে আসলে প্রোডাক্ট শুটের নামে, কোনো প্রোডাক্ট শুট না করে, সেই আগের যে ঘটনাগুলোরই সে পুনরাবৃত্তি করে। আমি নিজেকে রক্ষা করতে চেয়েছিলাম, যার কারণে আজকে সে আমাকে এভাবে আঘাত করে।"
এই ঘটনায় আইনী প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে, এবং কর্তৃপক্ষ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য তদন্ত চালাচ্ছে। সামাজিক মাধ্যম ও গণমাধ্যমে এই মামলা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে, যা যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে সচেতনতা বাড়াতে ভূমিকা রাখছে।



