মেট গালা ২০২৬-এ ভারতীয় তারকারা লাল গালিচায় হাজির হন নানা ধরনের শিল্পকর্মে মোড়ানো পোশাকে। তাদের সাজে ফুটে ওঠে ভারতীয় ঐতিহ্য, কারুশিল্প ও আধুনিকতার মিশেল।
করণ জোহরের রাজা রবি বর্মা অনুপ্রেরণা
বলিউড পরিচালক করণ জোহর প্রথমবার মেট গালায় অংশ নেন। তিনি পরেছিলেন মণীশ মালহোত্রার ডিজাইন করা বিশেষ পোশাক, যা চিত্রশিল্পী রাজা রবি বর্মার কাজ থেকে অনুপ্রাণিত। করণ জোহর ইনস্টাগ্রামে লেখেন, “রাজা রবি বর্মার কাজ আমার খুব প্রিয়, কারণ তিনি ছবিতে যেমন অনুভূতি ফুটিয়ে তুলতেন, আমিও সিনেমায় সেটাই করতে চাই।” পোশাকে ছিল হাতে আঁকা নকশা, জারদৌজি কাজ, পদ্ম, রাজহাঁস ও স্তম্ভের ডিজাইন। পুরো পোশাকটি ৮৬ দিনে ৫ হাজার ৬০০ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে তৈরি করা হয়েছে।
অনন্যা বীরলার নিরীক্ষাধর্মী লুক
লাল গালিচায় উদ্যোক্তা অনন্যা বীরলা নজর কেড়ে নেন তাঁর নিরীক্ষাধর্মী লুকের কারণে। রবার্ট উনের ডিজাইন করা স্ট্রাকচার্ড কালো কতুর পোশাকে দেখা যায় তাঁকে। স্টাইলিং করেছেন রিয়া কাপুর। তাঁর পোশাকের মূল আকর্ষণ ছিল শিল্পী সুবোধ গুপ্তের তৈরি ধাতব মুখোশ।
জয়পুরের রাজপরিবার
জয়পুরের রাজপরিবারকেও লাল গালিচায় দেখা যায়। হালকা গোলাপি রং বেছে নেন এই আয়োজনে। গৌরবী কুমারী তাঁর দাদি গায়ত্রী দেবীর ভিনটেজ শিফন শাড়ি বেছে নেন, তবে সেটিকে রূপ দেন ফ্লুইড গাউনে। গলায় ছিল হীরার মালা। অন্যদিকে সাওয়াই পদ্মনাভ সিংহ পরেছিলেন ঐতিহ্যবাহী সিলুয়েটের ওপর ভেলভেট কোট।
সুধা রেড্ডির ‘ট্রি অব লাইফ’
৫ মে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত মেট গালা ২০২৬-এ ভারতীয় বিলিয়নিয়ার সমাজসেবী সুধা রেড্ডি লাল গালিচায় হাজির হন মণীশ মালহোত্রার ডিজাইন করা পোশাকে। ‘ট্রি অব লাইফ’ নামের এই পোশাকটি দক্ষিণ ভারতের ঐতিহ্যবাহী কলমকারি শিল্প থেকে অনুপ্রাণিত। এটি তৈরি করতে ৯০ জনের বেশি কারিগরের ৩ হাজার ৪৫৯ ঘণ্টার বেশি সময় লেগেছে। পোশাকটির মূল নকশা ছিল ‘ট্রি অব লাইফ’ বা জীবনের বৃক্ষ—যা বৃদ্ধি ও সম্পর্কের প্রতীক। এতে তেলেঙ্গানার কিছু প্রতীকও ব্যবহার করা হয়েছে, যেমন পাখি, গাছ, ফুল, পাশাপাশি সূর্য ও চাঁদের নকশা। গাঢ় নীল রঙের এই পোশাকে ভেলভেট, সিল্ক ও টুল কাপড় ব্যবহার করা হয়েছে। সোনালি সূচিকর্ম এবং লম্বা ট্রেইন ও স্বচ্ছ কেপের পেছনে একটি ধাতব নকশাও যুক্ত ছিল। সুধা রেড্ডি নিজের সংগ্রহের গয়না পরেন, যার মধ্যে ছিল বড় টানজানাইট পাথরের নেকলেস ও ডায়মন্ড আংটি। তাঁর সাজ ছিল খুবই সহজ—হালকা মেকআপ ও সাধারণ চুলের স্টাইল।
মণীশ মালহোত্রার শ্রদ্ধা কারিগরদের প্রতি
শুধু তারকাদের জন্য পোশাক তৈরি করাই নয়, এই ডিজাইনার নিজেও নিজের নকশা করা পোশাক পরে এই আয়োজনে জাঁকজমকপূর্ণভাবেই উপস্থিত হন। মেট গালা ২০২৬-এর লাল গালিচায় মণীশ মালহোত্রা যেন ভারতীয় কারুশিল্পকে নতুনভাবে তুলে ধরলেন। তাঁর পরনে ছিল দৃষ্টিনন্দন একটি বন্ধগলা ও সূচিকর্ম করা কেপ, যেখানে ছিল তাঁর কারিগরদের নাম ও স্বাক্ষর। তাঁর পুরো লুকটি যেন মুম্বাই, স্মৃতি আর সম্মিলিত শিল্পচর্চার প্রতি এক গভীর শ্রদ্ধা।
ইশা আম্বানির ভাস্কর্যের আদলে তৈরি কেপ
ভারতীয় ব্যবসায়ী ইশা আম্বানি লাল গালিচায় হাজির হন গৌরব গুপ্তার ডিজাইন করা শাড়ি এবং ভাস্কর্যের আদলে তৈরি করা কেপ পরে, যেটা কারিগররা খাঁটি সোনার সুতো দিয়ে বুনেছেন। স্টাইলিং করেছেন অনাইতা শ্রফ আদাজানিয়া। শাড়িটিতে প্রাচীন ভারতীয় ফ্রেস্কো চিত্রের প্রভাব দেখা যায়। পাড়জুড়ে ছিল হাতে আঁকা পিচওয়াই অনুপ্রাণিত নকশা। এই শাড়িতে আরও যোগ হয়েছে—জারদৌজি, আরি কাজ ও রিলিফ এমব্রয়ডারির মিশেল। ৫০ জনের বেশি কারিগর ১ হাজার ২০০ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে তৈরি করেছেন। ব্লাউজে পরিবারের হীরার সংগ্রহকে কতুরে রূপ দেওয়া হয়েছে। নীতা আম্বানির ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে নেওয়া ২০০টিরও বেশি পুরোনো কাটের হীরা হাতে সেলাই করে বসানো হয়েছে এই বডিস বা ব্লাউজে। গলায় ছিল দুটি স্তরের হীরার নেকলেস, যার মোট ওজন ২৫০ ক্যারেটের বেশি। হাতে ছিল হাতফুল আর কোমরে হীরার কোমরবন্ধ—যা শাড়ির ভাঁজ বরাবর নেমে এসেছে। লুকটি সম্পূর্ণ করতে অনাইতা শ্রফ আদাজানিয়া ব্যবহার করেছেন জুঁই ফুলের অনুপ্রাণিত একটি হেয়ার স্কাল্পচার, যা মোগরা ও গাজরার ধাঁচে তৈরি। ব্রুকলিনভিত্তিক শিল্পী সৌরভ গুপ্ত ১৫০ ঘণ্টার বেশি সময় নিয়ে কাগজ, তামা ও পিতল দিয়ে প্রতিটি জুঁই কুঁড়ি আলাদাভাবে গড়েছেন, পরে ভারতীয় রঙে রাঙিয়েছেন। হাতে রাখা সুবোধ গুপ্তের তৈরি আমের ভাস্কর্যটি যেন বিশেষভাবে নজড় কাড়ছিল।
নাতাশা পুনাওয়ালার অর্কিড পেক্টোরাল
মেট গালায় লাল গালিচায় ভারতীয় সমাজসেবী ও ব্যবসায়ী নাতাশা পুনাওয়ালা হাজির হন এক ভিন্নধর্মী লুকে। ব্রিটিশ ভিজ্যুয়াল শিল্পী মার্ক কুইনের তৈরি ‘অর্কিড পেক্টোরাল’ নামের ভাস্কর্যধর্মী আর্ট পিসটি পরেছিলেন বুকজুড়ে। এর সঙ্গে ছিল ডলচে অ্যান্ড গাব্বানার সাদা কতুর গাউন। নাতাশা ভোগ ম্যাগাজিনকে বলেন, “মার্ক কুইনের স্টুডিওতে প্রথম গেলে তাঁর কাজের বিশালতা আমাকে আকর্ষণ করে। তখনই মনে হয়েছিল—এমন কিছু কি পোশাক হিসেবে পরা যায় না?” সাদা হালকা রেজিন দিয়ে তৈরি অর্কিডটি সামনে–পেছনে ছড়িয়ে গিয়ে যেন এক ধরনের বর্মের অনুভূতি দিচ্ছিল। গাউনের কোমলতা পুরো লুকে এনে দেয় ভারসাম্য। হালকা কাপড়ের গাউনটি পেছনে লম্বা হয়ে নেমে এসেছে স্বচ্ছন্দভাবে। সঙ্গে ছিল বড় হীরার দুল ও আউটহাউস জুয়েলারির একটি ক্রিস্টাল আংটি। মেকআপ ছিল স্বাভাবিক ন্যুড, চোখে হালকা বাদামি শেড। চুল উঁচু করে বাঁধা ছিল পাফ বান স্টাইল।



