রজব আলীর একটা নাকচ্যাপটা ফক্সওয়াগন গাড়ি আছে। ১৯৫৬ মডেলের, সেই ডাইহাটসু যুগের গাড়ি। তার বাবার কেনা; উত্তরাধিকারসূত্রে তিনি পেয়েছেন। বেশ ঝরঝরে গাড়িই বলা যায়। এই গাড়ির হর্ন ছাড়া মোটামুটি সবই বাজে। মাঝখানে তিনি একজন ড্রাইভার রাখতে চেয়েছিলেন। তবে কোনো ড্রাইভারই জীবনের ঝুঁকি নিতে ঠিক রাজি হয় নাই। বেতন যতই হোক, জীবনটা তো আগে। বাধ্য হয়ে তিনি নিজেই চালাতেন। কিন্তু এখন গাড়ি গ্যারেজবন্দী। যাকে বলে একবারে গ্যারজের ভেতর ফিক্সড ডিপোজিট হয়ে আছে যেন। কারণ...তেলসংকট। অকটেন, পেট্রল, ডিজেলের মহামারি চলছে। গাড়িওয়ালারা সবাই মশারির মার্কেটে ভিড় করেছেন। কারণ, রাতে তেলের লাইনে মশারি খাটিয়ে শুতে হয় যে।
ঘোড়া কেনার পরিকল্পনা
বন্ধুরা বুদ্ধি দিল এই গাড়ি বিক্রি করে একটা ঘোড়া কিনে ফেল। হাসিঠাট্টা করেই বলা। কিন্তু ভেতরে–ভেতরে রজব আলী বিষয়টা সিরিয়াসলি নিলেন। এই গাড়ি কদিন পর এমনিতেই সের দরে ভাঙারির কাছে বিক্রি করতে হবে। এর চেয়ে বরং একটা ঘোড়া কিনে ফেললে কেমন হয়? তাঁদের গ্রামের বাড়িতে একসময় ঘোড়ার বেশ চল ছিল। তাঁর নিজের দাদাকে তিনি ঘোড়ায় চড়ে বাজারসদাই করতে দেখেছেন। স্মৃতি হাতড়ালে মনে হয়, তাঁর মনে পড়ে যেতে পারে যে তিনিও দাদার সঙ্গে ঘোড়ার সওয়ারি হয়েছেন। তার মানে তাঁর রক্তে ঘোড়া ব্যাপারটা আছে।
বন্ধুদের বাধা
বন্ধুরা যখন টের পেল রজব আলী সত্যি সত্যি গাড়ি বিক্রি করে ফেলেছে এবং ঘোড়া কেনার জন্য খোঁজ খবর লাগাচ্ছে, তখন তারা আবার হা হা করে ছুটে এল। রজব আলী বললেন, কী হলো, তোরাই না বললি ঘোড়া কিনতে। বন্ধুরা বলল, খবরদার এ কাজ করবি না। কেন? কেন আবার, খবরের কাগজ পড়িস না? কদিন আগেই না ঘোড়ার মাংস বিক্রি করার জন্য ডজনখানেক মানুষকে পুলিশ জেলে ঢোকাল। রজব আলী বললেন, আরে মর জ্বালা, মাংস বিক্রি করার জন্য ঘোড়া কিনছি নাকি? আমি ঘোড়া কিনছি ঘোড়ায় চড়ে অফিস করব। এ ছাড়া আর উপায়ই–বা কী? বন্ধুরা বলল, না না, খবরদার, এখন সব ঘোড়াওয়ালা পুলিশের নজরদারিতে আছে। তুই বরং গাধা কিন।
গাধা কেনার সিদ্ধান্ত
রজব আলীর চোয়াল ঝুলে পড়ল। বন্ধুরা বলল, অবশ্যই গাধা কিনবি? তুই কি মনে করিস ঘোড়া চালিয়ে রাস্তায় টেসলার সাথে পাল্লা দিতে পারবি? বরং গাধা নিরাপদ। তুই তো আবার দুনিয়ার ফাইলপত্র নিয়ে অফিস করিস। তোর জন্য গাধাই ঠিক আছে। গাধা ভারবাহী পশু, তা ছাড়া অতি সম্প্রতি মস্কো চিড়িয়াখানার এক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে গাধা প্রাণিকুলে অন্যতম বুদ্ধিমান প্রাণী। রজব আলী অনড় থেকে বললেন, অসম্ভব! গাধা কিনব না! বন্ধুরা বলল, কেন, অসুবিধা কী? পৃথিবীর বড় বড় লোকেরা সব গাধায় চড়তেন—নাসিরুদ্দিন হোজ্জা, নাসির হোকা, নাসির মাহমুদ, আফেন্দি... রজব আলী বললেন, আরে ধুর ধুর! এঁরা সব একই মানুষ। একেক দেশে তাঁর একেক নাম। তবে তিনি যে গাধায় চড়ে চলাফেরা করতেন, এটা সত্য। তবে সত্যি কথা বলতে কি গাধার আসল গুণটাই তোরা বলিসনি। আরেক বন্ধু পাশ থেকে বলে, কী সেটা? বন্ধুটি বলল, গাধাই একমাত্র প্রাণী যে কিনা সাত রকম সাঁতার জানে! পানিতে পড়লে সাত রকমভাবে সে ভেসে উঠতে পারে। আর তোর অফিসের পাশে যে বিশাল লেক, একবার পা পিছলে পড়লে...দেখিস গাধাই কিন্তু তোকে বাঁচাবে।
গাধায় চড়ে অফিস
শেষ পর্যন্ত রজব আলী বন্ধুদের কথাই রাখলেন; গাধাই কিনলেন একটা। গাধায় চড়ে অফিস করা রজব আলীর বেশ ভালোই চলছিল। দু–একজন আশপাশ থেকে আওয়াজ দিলেও তিনি পাত্তা দিলেন না। ছোটবেলায় ‘পাছে লোকে কিছু বলে’ যাঁর পড়া আছে, তাঁর এসবে কান দিলে চলে? (স্ত্রী অবশ্য গ্যারেজে গাড়ির বদলে গাধা দেখে বাপের বাড়ি চলে গেছেন অনির্দিষ্টকালের জন্য)
বৃষ্টির দিনে বিপত্তি
তবে একদিন সত্যিই সমস্যা হলো। দিনটা ছিল বৃষ্টিভেজা একটা দিন। রাস্তাঘাট যথেষ্ট পিচ্ছিল হয়ে আছে। ছাতি হাতে লেকের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ একটা টেসলা হুড়মুড় করে তাদের ওপর একরকম ইসরায়েলি ব্যালিস্টিক মিসাইল স্টাইলে হামলে পড়লই বলা যায়। তবে বুদ্ধিমান গাধা তার আগেই বাউলি কেটে সোজা পাশের লেকে ডাইভ দিয়েছে। গাধা সাতরকম সাঁতার জানে কথাটা সত্যি, তবে পানিতে পড়লে ভুলে যায় ঠিক কয় নম্বর কায়দায় সাঁতরে ভেসে উঠতে হবে তাকে! এ জন্যই নাকি গাধা...গাধা। বিষয়টা শুভাকাঙ্ক্ষী বন্ধুরা রজব আলীকে জানায়নি কেন কে জানে।



