শৈশবের বন্ধুদের পুনর্মিলনী: স্মৃতির সমুদ্রে ডুব
শৈশবের বন্ধুদের পুনর্মিলনী: স্মৃতির সমুদ্রে ডুব

শৈশবের বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হয় না বহুদিন। পেশাগত জীবনের ব্যস্ততা, নাগরিক কোলাহল আর সাংসারিক জীবনের হাজারো চাপ আমাদের গ্রাস করে নিয়েছে। কতজন যে জীবিকার টানে আজ প্রবাসী। কতজনের সঙ্গে যোগাযোগটাই হারিয়ে গেছে। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অবাস্তব জগতেও আর খোঁজ মেলে না অনেকের।

অথচ একটা সময় ছিল, যখন জীবন এতটা জটিল ছিল না। হৃদয়ের সবটুকু আকুলতাজুড়ে আজ কেবলই মিশে আছে সেই ফেলে আসা দিনগুলো—সেই চেনা ক্লাসরুম, স্কুলের বিশাল সবুজ মাঠ আর মাথার ওপর উন্মুক্ত উদার আকাশ। যেখানে জীবনের শিকড় গ্রথিত হয়েছিল, যেখানে আমরা পেয়েছিলাম মানুষ হওয়ার দীক্ষা। আজ বড় বেশি মনে পড়ে সেই বন্ধুদের, যাদের সঙ্গে কোনো শর্ত ছাড়া মন খুলে হাসা যেত।

স্বপ্ন থেকে বাস্তবতা

কিন্তু চাইলেই কি আর অতীতে ফেরা যায়? বাস্তবতার শিকল ভেঙে সেই সোনালি অতীতে ফিরে যাওয়া অসম্ভব জেনেও, মনের ভেতরের অদ্ভুত আকুলতা থেকে জন্ম নিল এক নতুন স্বপ্ন। হৃদয়ে বোনা সেই স্বপ্নই ধীরে ধীরে রূপ নিল এক বিশাল মহিরুহে। কয়েক ঘণ্টার জন্য হলেও সেই হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোকে ছোঁয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা থেকেই আয়োজন করা হলো আমাদের পুনর্মিলনী।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সব ব্যস্ততা, ক্লান্তি আর কোন্দল এক পাশে সরিয়ে রেখে আমরা আমাদের গ্রামের মির্জারচর উচ্চবিদ্যালয় থেকে প্রায় আড়াই শ পুরোনো বন্ধু একত্র হলাম। গন্তব্য—ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বাঞ্ছারামপুরের বুক চিরে জেগে ওঠা এক নৈসর্গিক কানন, ‘স্বপ্নদ্বীপ’। চারপাশে নদীবেষ্টিত এই দ্বীপ নিখাদ প্রাকৃতিক মমতায় ঘেরা। ঠিক যেন আমাদের শৈশবের মতোই শান্ত ও পবিত্র।

জলযাত্রা ও স্মৃতিচারণ

লঞ্চে করে তিন ঘণ্টার সেই জলযাত্রা ছিল আসলে এক জাদুর নৌকা, যা আমাদের বর্তমান থেকে নিয়ে যাচ্ছিল সুদূর অতীতে। যখন আমরা স্বপ্নদ্বীপে পা রাখলাম, মনে হলো আমরা আসলে ফেলে আসা এক মায়াবী কৈশোরে এসে দাঁড়িয়েছি। পুরোনো বন্ধুদের চেনা মুখগুলো দেখে মনে হলো, মাঝখানের এতগুলো বছর এক নিমেষেই ভোজবাজির মতো মিলিয়ে গেছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আবারও শুরু হলো সেই পুরোনো ক্লাসরুমের মতো খুনসুটি, আড্ডা, তামাশা আর কৌতুক। বাতাসে ভেসে বেড়াতে লাগল চেনা গানের সুর আর অন্তহীন গল্পগুজব। হারিয়ে যাওয়া সহপাঠীদের নতুন করে ফিরে পেয়ে আমরা একে একে সবাই আবেগাপ্লুত, অভিভূত হয়ে পড়লাম।

সময়ের স্রোতে

জীবন সত্যিই কত ছোট, কত দ্রুত বয়ে যায়! কত সহজেই না আমরা কৈশোরের গণ্ডি পেরিয়ে যৌবনে পা রেখেছিলাম। আর আজ যৌবনের সীমানা ডিঙিয়ে উপনীত হচ্ছি মধ্যবয়সের চৌকাঠে। সময় আমাদের বয়স বাড়িয়ে দেয়, মনের ভেতরের সেই চঞ্চল কিশোরটি তো কখনো বৃদ্ধ হয় না।

জানি, সেই দিনগুলো চিরতরে হারিয়ে গেছে, কখনো ফিরে আসবে না। তবু এই কয়েকটা ঘণ্টা যেভাবে মন ভরে বাঁচলাম, তা আমাদের আগামী দিনের পথচলার শক্তি হয়ে থাকবে। ফিরতে ফিরতে রাত। ভর জোছনার মায়াবী আলো ঝরছে। মৃদু বাতাসে ওঠা ঢেউয়ে সেই আলো মেঘনার বুকে মিলিয়ে যাচ্ছে। জীবন এভাবেই চলে যাবে। আমরাও হয়তো জীবনের কোনো এক বাঁকে আবারও ফিরে আসব এ রকমই কোনো এক স্বপ্নময় দ্বীপে, পুরোনো বন্ধুদের হাত ধরে, স্মৃতির সমুদ্রে ডুব দিতে।

লেখক: প্রশাসনিক কর্মকর্তা, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, অর্থ মন্ত্রণালয় (এসএসসি ২০০৩ ব্যাচ)