বাঙালি অল্পতেই সন্তুষ্ট বলে একটা কথা আছে। মাওলানা ভাসানী এক ভাষণে বলেছিলেন, ‘এ দেশের মানুষ দুবেলা ডালভাত খেতে পারলেই খুশি।’ মাওলানা রাজনীতি করতে গিয়ে হাটে-মাঠে-ঘাটে ঘুরেছেন, মানুষের সঙ্গে মিশেছেন। দেখেছেন, দুবেলা সামান্য ডালভাতও জোটে না অনেকের। দেশে খাদ্যসংকট ছিল। আর ছিল অব্যবস্থাপনা। বছরজুড়েই থাকত নীরব দুর্ভিক্ষ। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের সভাপতি ‘শেরেবাংলা’ নামে খ্যাত আবুল কাশেম ফজলুল হক জনসভায় ভাষণ দিতে গিয়ে বলতেন, নির্বাচনে জিতলে তাঁরা সবার জন্য ডালভাতের ব্যবস্থা করবেন। সাধারণ মানুষ ম্যানিফেস্টো পড়ে না, দফার রাজনীতি বোঝে না। তারা ডালভাতের আশায় যুক্তফ্রন্টকে ভোট দিয়েছিল। এর বিপরীত চিত্রটিও আছে। ‘দুই বিঘা জমি’ রবীন্দ্রনাথের একটি বিখ্যাত কবিতা। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘এ জগতে হায় সেই বেশি চায় আছে যার ভূরি ভূরি/ রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি।’ কারও পেটে পান্তা জোটে না, কারও হাতে অঢেল সম্পদ থাকা সত্ত্বেও তার খাঁই মেটে না।
বেঁচে থাকার জন্য মানুষ কী না করে। কেউ উদয়াস্ত খেটে দিনের খাবার জোগাড় করতে পারে না। আবার কেউ অন্যের শ্রমে-ঘামে উপার্জন করা টাকা কিংবা সম্পদ দখল করতে মরিয়া। এটা করতে গিয়ে সে অনেক মানুষের ওপর চড়াও হয়, হামলা করে, এমনকি খুন পর্যন্ত করে ফেলে। যাদের ওপর দেশের নাগরিকদের দেখভাল করার দায়িত্ব, তাদের অসতর্কতা কিংবা অবহেলার কারণে কত লোকের যে প্রাণ যায়, তার হিসাব কে রাখে। বলা যায়, ব্যক্তি যেমন ব্যক্তিকে মারে, তেমনি রাষ্ট্র মারে তার নাগরিকদের।
আমি গত সোমবারের প্রথম আলো দেখছিলাম। শুধু মন খারাপ করা খবর। প্রতিবেদক শিশির মোড়ল জানাচ্ছেন, হামে আরও ১১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে হামের উপসর্গ ও হামে ৪০৯ জনের মৃত্যুর খবর দিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সম্প্রতি হামের সংক্রমণ বেড়ে গেছে। বেরিয়ে আসছে টিকা নিয়ে অবহেলার খবর। এ নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর দায় চাপানো হচ্ছে। বর্তমান সরকার আগের সরকারের ওপর দায় চাপিয়ে বসে থাকবে, এটিও গ্রহণযোগ্য নয়। আসলে কি আমাদের স্বাস্থ্য অবকাঠামো এ ধরনের ব্যাপক সংক্রমণ সামলানোর ক্ষমতা রাখে? আমাদের কর্তারা তো হাঁচি উঠলেই চিকিৎসার জন্য বিলেতে যান! হামের সংক্রমণ ও মৃত্যু ঠেকাতে সরকার দেশজুড়ে টিকার ক্যাম্পেইন শুরু করেছে। টিকাদান পরিস্থিতি দ্রুত যাচাই পদ্ধতি (আরসিএম) থেকে ইউনিসেফ বলছে, এখনো শহর এলাকায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ এবং গ্রাম এলাকায় ১৫ শতাংশ শিশু টিকা পায়নি।
মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার আলোকদিয়া এলাকায় যমুনা নদীতে খননযন্ত্র দিয়ে বালু উত্তোলন নিয়ে দ্বন্দ্বে আবারও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এর আগে গত ৩ এপ্রিল যমুনা নদীতে বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে দ্বন্দ্বে আলোকদিয়া এলাকায় তেওতা বালুমহাল ইজারাদার প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক মিরাজুল ইসলামকে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। রাষ্ট্রের ভুল বা অব্যবস্থাপনার কারণে পথে-ঘাটে যেসব ‘হত্যাকাণ্ড’ ঘটছে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর, আমরা তার নাম দিয়েছি ‘সড়ক দুর্ঘটনা’। এসব দুর্ঘটনায় প্রতিবছর হাজার হাজার লোক মারা যায়, অনেকেই চিরতরে পঙ্গু হয়ে যায়। সড়ক দুর্ঘটনা তো নৈমিত্তিক ব্যাপার। সোমবারের (১১ মে) খবরে দেখলাম, দুর্ঘটনা ঘটেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, বগুড়া, কুমিল্লা, হবিগঞ্জ ও রাজবাড়ী জেলায়। কেউ মরেছে ট্রাকে চাপা পড়ে, কেউ প্রাণ হারিয়েছে মোটরবাইক চালাতে গিয়ে। ২০১৮ সালে একবার নিরাপদ সড়ক আন্দোলন হয়েছিল। তখনকার সরকার এটিকে দেখেছিল বাঁকা চোখে। আন্দোলনকারী স্কুলছাত্রদের মধ্যে তারা আবিষ্কার করেছিল ষড়যন্ত্রের কিস্সা। পথচারী ও যাত্রীর জন্য সড়ক নিরাপদ রাখার মতো একটি নিরীহ ও ন্যায্য দাবি নিয়েও হয়েছে অপরাজনীতি।
সামান্য একটা জিনিস ছিনতাই করার লোভে মানুষ যে কত হিংস্র হয়ে উঠতে পারে, তার একটি নমুনা দেখলাম গাজীপুরের ৪৬ বছর বয়সী চা-বিক্রেতা কুলসুম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায়। তার কাছে টাকা ও সোনার গয়না আছে—এমন ধারণা থেকে করা হয় ডাকাতির পরিকল্পনা। ঘটনার দিন আসামিরা কৌশলে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে ওই নারীকে অচেতন করার চেষ্টা করে। পরে দা দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে তাকে খুন করা হয়। খুনের পর ঘর থেকে টাকা ও কিছু গয়না নিয়ে পালিয়ে যায় আততায়ীরা। পরে গয়না বিক্রি করতে গিয়ে তারা জানতে পারে সেগুলো আসল সোনা নয়, ‘সিটি গোল্ড’। ৯ মাস আগে খুন হয় নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ১৭ বছর বয়সী ইয়াছিন আরাফাত। সে পড়ত একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের ও লেভেলে। গত বছরের ১১ আগস্ট সন্ধ্যায় মায়ের জন্য ওষুধ কিনতে বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হয় সে। দুই দিন পর সিদ্ধিরগঞ্জের ডিএনডি খাল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনা তদন্ত করে পিবিআই বলছে, পরকীয়া সম্পর্কের ভুল সন্দেহে স্কুলছাত্র ইয়াছিনকে হত্যা করা হয়। রোববার (১০ মে) ভোর চারটার দিকে কালিয়াকৈর উপজেলার ফুলবাড়িয়া ইউনিয়নের বাগচালা বাজার এলাকায় গরু চুরির অভিযোগে তিনজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এ সময় ক্ষুব্ধ জনতা একটি পিকআপ ভ্যানে আগুন ধরিয়ে দেয়। এই ‘ক্ষুব্ধ জনতা’–কে কী বলবেন? গরু হারানোর কারণে ত্যক্তবিরক্ত, নাকি মব?
আমাদের নদীতে এখন আর পলি পড়ে না। তলদেশে জমে বালু। এই বালু মহার্ঘ। বাড়ি, সড়ক, সেতু আর বাঁধ নির্মাণে এটি দরকার। এটি নদী থেকে পাওয়া যায় মুফতে। বালু তৈরিতে বিনিয়োগ লাগে না। লাগে শুধু উত্তোলন আর পরিবহনের খরচ। নদী থেকে বালু তোলা কিংবা বালুমহালের ইজারা নিতে গিয়ে মারামারি-সংঘর্ষ হয় নিত্যদিন। মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার আলোকদিয়া এলাকায় যমুনা নদীতে খননযন্ত্র দিয়ে বালু উত্তোলন নিয়ে দ্বন্দ্বে আবারও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এর আগে গত ৩ এপ্রিল যমুনা নদীতে বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে দ্বন্দ্বে আলোকদিয়া এলাকায় তেওতা বালুমহাল ইজারাদার প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক মিরাজুল ইসলামকে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
এ সপ্তাহের সবচেয়ে রোমহর্ষক ঘটনাটি ঘটেছে গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলা সদরের রাউৎকোনা গ্রামে। এই গ্রামের একটি বাড়ি থেকে এক নারী, তাঁর তিন মেয়ে ও এক ভাইয়ের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনার পর থেকে ওই নারীর স্বামী পলাতক। স্থানীয় লোকেরা জানিয়েছেন, একটি ঘরে বিছানার পাশে জানালার গ্রিলে শারমিন আক্তার নামের ওই নারীকে দুই হাত বেঁধে রাখা হয়েছে। শরীরে নতুন শাড়ি। মুখে টেপ প্যাঁচানো, মুখের বেশির ভাগ কালো কাপড় দিয়ে প্যাঁচানো, পিঠের পেছনে দেয়ালে রক্তের দাগ। কারণ কী? অভাব, যৌতুক, পরকীয়া, দাম্পত্য ঝগড়া, মানসিক ব্যাধি, নাকি অন্য কিছু? তুচ্ছ অজুহাতে মানুষ মেরে ফেলা যেন একটি খেলায় পরিণত হয়েছে! আজকাল তো খুনের হুমকি প্রকাশ্যেই দেওয়া হয়। রাজনৈতিক সংযোগের সুবিধা নিয়ে কেউ কেউ থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। গত শনিবার বিকেলে চট্টগ্রামে মোবারক হোসেন ওরফে ইমন নামের এক ব্যক্তি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা না দিলে বিপ্লব দে পার্থ নামের এক সাংবাদিককে গুলি করার হুমকি দিয়েছে। বিপ্লব দে ‘বাংলা টিভি’র চট্টগ্রাম কার্যালয়ের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক। পাশাপাশি তিনি জন্মাষ্টমী উদ্যাপন পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক। হুমকিদাতা ইমন বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের সহযোগী হিসেবে পরিচিত। হোয়াটসঅ্যাপে দেওয়া অডিও বার্তায় ইমন বিপ্লবকে বলেন, ‘...বোলতার বাসা বানিয়ে ফেলব। পুরো শরীরে এমনভাবে গুলি করা হবে, পরিবার গণনাও করতে পারবে না। যা করার, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে করতে হবে। গুলি মানুষ চেনে না।’
এ তো চাঁদাবাজির একটি নমুনা। এ রকম অসংখ্য ঘটনা ঘটছে প্রতিদিন। চাঁদাবাজেরা কেউ চিহ্নিত সন্ত্রাসী, কেউবা কোনো রাজনৈতিক দলের স্থানীয় চাঁই। এখানে তো আমি শুধু একটি দৈনিকে প্রকাশিত এক দিনের কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করলাম। সব কটি পত্রিকার পুরো সপ্তাহের হিসাব নিয়ে একটা বিবরণ তৈরি হলে সেটি যে ভয়াবহ হবে, তাতে সন্দেহ নেই। দেশে চলছে দুর্বৃত্তদের অবাধ বিচরণ। ডালভাত এখন আর অত মহার্ঘ নয়। মারামারি-খুনোখুনি যেন ডালভাত হয়ে গেছে।
মহিউদ্দিন আহমদ লেখক ও গবেষক



