ভূমধ্যসাগরে বাংলাদেশি অভিবাসন প্রত্যাশীদের মৃত্যু: উদ্বেগজনক পরিস্থিতি
উত্তাল ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে লিবিয়া থেকে গ্রিসে যাওয়ার পথে শনিবার (২৮ মার্চ) ২২ জন অভিবাসন প্রত্যাশীর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। নৌকায় করে অবৈধভাবে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টাকালে তারা প্রাণ হারান। জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে বিভিন্ন দেশের আরও ২৬ জন অভিবাসন প্রত্যাশীকে, যাদের মধ্যে ২১ জনই বাংলাদেশি নাগরিক।
ইউরোপে অবৈধ প্রবেশে শীর্ষে বাংলাদেশিরা
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর তথ্য অনুযায়ী, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে ইউরোপে প্রবেশের তালিকায় শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছেন বাংলাদেশের নাগরিকরা। গত বছর ১ লাখ ৫৪ হাজার ৫০০ জন সাগর পথে ইউরোপে প্রবেশ করেছেন, যেখানে সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে মৃত্যুবরণ বা নিখোঁজ হয়েছেন ২ হাজার ৯৫০ জন।
ইতালি গমনকারী বাংলাদেশিদের সংখ্যা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। গত বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ২০ হাজার ২৫৯ জন বাংলাদেশি ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি প্রবেশ করেছেন। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএম-এর ধারণা, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে যারা প্রাণ হারান, তাদের ১২ শতাংশই বাংলাদেশি নাগরিক।
বছরের পর বছর ধরে চলছে এই প্রবণতা
ইউএনএইচসিআর-এর তথ্যানুযায়ী, সাগর পথে ইতালি প্রবেশের ক্ষেত্রে প্রতিবছরই শীর্ষ অবস্থানে আছে বাংলাদেশ। ২০১৪ সালে ১৪ হাজার ২৮৪ জন, ২০২৩ সালে ১২ হাজার ৭৭৪ জন, ২০২২ সালে ১৫ হাজার ২২৮ জন, ২০২১ সালে ৭ হাজার ৮৩৮ জন এবং ২০২০ সালে ৪ হাজার ১৪১ জন বাংলাদেশি এই পথে ইতালিতে পৌঁছেছেন।
২০২৬ সালেও এই প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। চলতি বছরের ২২ মার্চ পর্যন্ত ৫ হাজার ৯০১ জন সাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি প্রবেশ করেছেন, যার মধ্যে ১ হাজার ৩৫৮ জন বাংলাদেশি। অন্যান্য দেশের মধ্যে সোমালিয়া, পাকিস্তান, মিসর, সুদান, আলজেরিয়া, তিউনিশিয়া, গিনি ও ইরানের নাগরিকরা শীর্ষ দশে অবস্থান করছেন।
লিবিয়া থেকে যাত্রা ও মানবপাচার চক্রের ভূমিকা
বাংলাদেশিরা ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার জন্য মূলত লিবিয়া থেকে যাত্রা শুরু করে, যা সেন্ট্রাল মেডিটেরানিয়ান রুট হিসেবে পরিচিত। গত বছরের ডিসেম্বরে লিবিয়া থেকে রওনা হওয়া নাগরিকদের ৩৯ শতাংশই ছিল বাংলাদেশি, যা নভেম্বরের তুলনায় ৬ শতাংশ বেশি।
মানবপাচারকারী চক্র বাংলাদেশি, পাকিস্তানি, আফগান ও ইরানের দালালদের সমন্বয়ে কাজ করে। তারা শুরুতে ৪০-৫০ হাজার থেকে ২-৩ লাখ টাকার বিনিময়ে গ্রিসে যাওয়ার স্বপ্ন দেখায়। কম টাকা দিতে চাইলে পৌঁছানোর পর বাকি টাকা পরিশোধের শর্ত দেওয়া হয়।
নির্যাতন ও জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়
বিভিন্ন সময় লিবিয়া থেকে ফেরত আসা ভুক্তভোগীরা জানান, দালালদের কাছে অত্যাধুনিক অস্ত্র থাকে এবং তারা জঙ্গল, শহর ও গ্রামে অভিবাসন প্রত্যাশীদের আটকে রাখে। সেখান থেকে ছাড়া পেতে আটক ব্যক্তির স্বজনদের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করা হয়। টাকা না দিলে হত্যা করে লাশ মরুভূমিতে পুঁতে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়।
আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য ও উদ্বেগ
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্য অনুসারে, ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী অভিবাসন রুটে কমপক্ষে ৭ হাজার ৭৬৭ জন লোক মারা গেছে বা নিখোঁজ হয়েছে। ভূমধ্যসাগরে কমপক্ষে ২ হাজার ১৮৫ জনের মৃত্যু বা নিখোঁজ হওয়ার তথ্য রয়েছে। বছরের পর বছর হ্রাস সত্ত্বেও, আসল মৃতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
২০২৫ সালে কমপক্ষে ২৭০টি মানুষের দেহাবশেষ ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে ভেসে এসেছে। ২০২৬ সালেও এই উদ্বেগজনক প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। চলতি বছরের প্রথম দুই মাসে ভূমধ্যসাগরে ৬০৬টি মৃত্যুর তথ্য রেকর্ড করা হয়েছে।
ব্র্যাকের গবেষণা: চাকরির প্রলোভন ও বাস্তবতা
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক লিবিয়া থেকে ফেরত আসা ৫৫৭ জন বাংলাদেশির তথ্য বিশ্লেষণ করে জানায়, ইউরোপে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে যাদের লিবিয়া নেওয়া হয়, তাদের ৮৯ শতাংশই চাকরি বা কোনও কাজ পাননি। উল্টো ৭৯ শতাংশ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, ২৬ থেকে ৪০ বছর বয়সী লোকজন সবচেয়ে বেশি ইউরোপে ঢোকার চেষ্টা করছেন, যাদের বেশিরভাগের বাড়ি মাদারীপুর, শরীয়তপুর, ফরিদপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, নোয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কুমিল্লা এলাকায়।
মানবপাচার মামলার অবস্থা
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মানবপাচার মামলা সংক্রান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত মানবপাচার আইনে ৮১০টি নতুন মামলা হয়েছে। পুরোনো মামলা ধরলে ৪ হাজার ৭৫৮টি মামলা ঝুলে আছে, যার মধ্যে তিন হাজার মামলা বিচারাধীন এবং এক হাজারেরও বেশি মামলার তদন্ত শেষ হয়নি।
সরকারি পদক্ষেপ ও প্রতিক্রিয়া
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম রবিবার (২৯ মার্চ) এক ব্রিফিংয়ে বলেন, "গ্রিসের ঘটনায় একটি সংঘবদ্ধ আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্র জড়িত। এ চক্রের সদস্যরা বাংলাদেশ ও লিবিয়া দুই দেশেই সক্রিয়। তারা উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে বিপজ্জনক পথে পাঠায়।"
তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে দ্রুত এ চক্রকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা যায়। প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আইন ও বাংলাদেশের আইন— উভয় ব্যবস্থায় বিচার নিশ্চিত করার কথাও বলেন তিনি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, মানবপাচার সংক্রান্ত অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহি করার জন্য শক্তিশালী আইনি কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বিভাগীয় পর্যায়ে সাতটি মানবপাচার ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে, যা বিচার প্রক্রিয়ার গতি বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।



