ওজিল ও এরদোয়ানের কক্সবাজার সফর: রোহিঙ্গা ক্যাম্পে শিক্ষা ও মানবিক সহায়তার ওপর জোর
ওজিল ও এরদোয়ানের রোহিঙ্গা ক্যাম্প সফর, শিক্ষার ওপর জোর

ওজিল ও এরদোয়ানের কক্সবাজার সফর: রোহিঙ্গা ক্যাম্পে শিক্ষা ও মানবিক সহায়তার ওপর জোর

জার্মানির বিশ্বকাপজয়ী সাবেক তারকা ফুটবলার মেসুত ওজিল এবং তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের ছেলে নেকমোদ্দিন বিলাল এরদোয়ান বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) কক্সবাজারের উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন। এই সফরে তারা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মানবিক সংকটের দিকে আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণ এবং শিক্ষা কার্যক্রম জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

ক্যাম্প পরিদর্শন ও ইফতার অনুষ্ঠান

বৃহস্পতিবার দুপুর ১টার দিকে উখিয়ার ৯ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পৌঁছান ওজিল ও বিলাল এরদোয়ান। তারা ক্যাম্পের পরিবেশ, শিক্ষা কার্যক্রম, স্বাস্থ্যসেবা এবং চলমান মানবিক সহায়তা কার্যক্রম ঘুরে দেখেন এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন। সন্ধ্যায় তারা রোহিঙ্গা পরিবারের সঙ্গে ইফতার করেন, যা তুরস্কের রমজান ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

প্রেস ব্রিফিং ও শিক্ষার আহ্বান

এর আগে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কক্সবাজারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয়ে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে অংশ নেন তারা। সেখানে বিলাল এরদোয়ান রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানবিক সংকট তুলে ধরে বলেন, ‘চার দশকেরও বেশি সময় ধরে রোহিঙ্গারা মৌলিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। ভবিষ্যতে নিজ দেশে মর্যাদার সঙ্গে ফিরে যেতে হলে এখন থেকেই তাদের শিক্ষা ও কারিগরি দক্ষতা অর্জনের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘মাঠপর্যায়ের বাস্তব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আবারও এই সংকটের দিকে আকর্ষণ করাই আমাদের সফরের মূল উদ্দেশ্য।’ তিনি ক্রীড়া কার্যক্রমের মাধ্যমে শিশু-কিশোরদের মানসিক বিকাশের ওপরও জোর দেন।

রোহিঙ্গা তরুণদের উচ্ছ্বাস ও স্কুল পরিদর্শন

সকালে বিলাল এরদোয়ানের নেতৃত্বে ওজিলসহ একটি ১৩ সদস্যের প্রতিনিধিদল উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে আসেন। তারকা ফুটবলার মেসুত ওজিলকে পেয়ে রোহিঙ্গা তরুণরা ভীষণ উচ্ছ্বসিত হন। অনেকে তার সঙ্গে সেলফি তুলতে সক্ষম হন, যদিও নিরাপত্তার কড়াকড়ির কারণে অনেকেই দূর থেকে তাকে একনজর দেখেছেন।

পুরো দিন জুড়ে তাদের ব্যস্ত সফরসূচি ছিল, যেখানে তারা রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন এবং রোহিঙ্গা শিশুদের কয়েকটি স্কুল ঘুরে দেখেছেন।

আগমন ও সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক

সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ঢাকা থেকে বিশেষ উড়োজাহাজে কক্সবাজার বিমানবন্দরে পৌঁছান নেকমোদ্দিন বিলাল এরদোয়ানের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলটি। বিমানবন্দরে তাদের স্বাগত জানান কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান ও পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান।

শরণার্থী কমিশনারের বক্তব্য ও সহযোগিতার আহ্বান

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মিজানুর রহমান বলেন, ‘বিলাল এরদোয়ান এবং মেসুত ওজিলসহ প্রতিনিধি দল রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করেছেন। তুরস্কে রমজানের প্রথম দিন পরিবার-পরিজনের সঙ্গে একত্রে ইফতার করার একটি বিশেষ ঐতিহ্য রয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটেই রোহিঙ্গাদের নিজেদের পরিবারের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে প্রতিনিধি দলটি ক্যাম্পে এসেছে।’

তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘এর মাধ্যমে তুরস্কসহ বিশ্ববাসীর কাছে একটি বার্তা পৌঁছে দেওয়া, তা হলো রোহিঙ্গারা একা নয়, বিশ্ব মানবতার অংশ।’ মিজানুর রহমান রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ সরকারের আন্তরিকতার কথা তুলে ধরেন এবং আশ্রয়শিবিরে বন্ধ রোহিঙ্গা শিশুদের স্কুলগুলো পুনরায় চালু করতে তুরস্ক সরকারের সহযোগিতা চান।

নেকমোদ্দিন এরদোয়ান বন্ধ শিক্ষাকেন্দ্র চালুর ক্ষেত্রে আশ্বাস দিয়েছেন। উখিয়ার আশ্রয়শিবিরে তুরস্ক সরকারের অর্থায়নে বর্তমানে ৯টি স্কুল চালু রয়েছে, তবে আরও স্কুল চালু করা দরকার। দাতাগোষ্ঠীর অর্থসহায়তা বন্ধ থাকায় কয়েক মাস ধরে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩ আশ্রয়শিবিরে অন্তত দুই হাজার লার্নিংসেন্টার (শিশুশিক্ষাকেন্দ্র) বন্ধ রয়েছে। জাতিসংঘের ইউনিসেফের অর্থায়নে চালু আছে দুই হাজারের বেশি শিক্ষাকেন্দ্র।

চ্যারিটি ফুটবল ম্যাচের পরিকল্পনা

সফরের অংশ হিসেবে রোহিঙ্গা তরুণদের অংশগ্রহণে একটি চ্যারিটি ফুটবল ম্যাচ আয়োজনের কথা রয়েছে। মানবিক সহায়তা ও সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আয়োজিত এই প্রীতি ম্যাচে প্রতীকীভাবে অংশ নেবেন ওজিল ও বিলাল এরদোয়ান। এই উদ্যোগ রোহিঙ্গা সংকটে ক্রীড়ার ভূমিকা তুলে ধরতে সাহায্য করবে বলে আশা করা হচ্ছে।