সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের দায়ে অভিযুক্ত তরুণকে (১৮) বুধবার (২৪ জুন) কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। এর আগে গত মঙ্গলবার রাতেই পুলিশ বাদী হয়ে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের দায়ে তার বিরুদ্ধে সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা করে। এ ঘটনায় আতঙ্কে রয়েছেন স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন।
গ্রেফতার তরুণের পরিচয় ও ঘটনার সূত্রপাত
গ্রেফতার তরুণ এবার এইচএসসি পরীক্ষার্থী। মঙ্গলবার বিকালে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে ফেসবুকে তার আপত্তিকর মন্তব্য ঘিরে তাহিরপুরের বাদাঘাট বাজারসহ আশপাশের এলাকায় উত্তেজনা ছড়ায়। বিক্ষুব্ধ লোকজন বাদাঘাট বাজারে ও গড়কাটি গ্রামে বাড়িঘর, তিনটি মন্দির এবং দুটি দোকান ভাঙচুর করেন। গতকাল বুধবার বিকালে পুলিশ সুপারসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
ভাঙচুরের শিকার পরিবারের বর্ণনা
গ্রেফতার তরুণের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সুনসান নীরবতা। তার মা ঘরের ভেতরে বসে কান্নাকাটি করছিলেন। তিনি জানান, মঙ্গলবার বিকালে শত শত মানুষ তাদের বসতঘরে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। ঘরে থাকা আসবাব, পানির মোটর, ট্যাঙ্কসহ মালপত্র লুট করে নিয়ে গেছে তারা। তিনি বলেন, "দুপুরে কয়েকজন ছেলে আমার ছেলেকে বাড়ি থেকে নিয়ে যায়। পরে জানতে পারি, ফেসবুকে কিছু লেখার কারণে পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে গেছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আশপাশ এলাকার শত শত মানুষ বাড়িতে এসে ভাঙচুর চালায়। ঘটনার পর থেকে আমার আরও তিন ছেলে, পুত্রবধূ এবং স্বামী ভয়ে বাড়িছাড়া। সন্ধ্যার পর পুলিশ বাড়িতে আসে।"
মন্দির ও দোকানে হামলা
স্থানীয় মন্দিরে গিয়েও ভাঙচুরের দৃশ্য দেখা গেছে। তবে কারা এ হামলা চালিয়েছে, এই বিষয়ে ভয়ে কেউ মুখ খুলতে চাননি। স্থানীয় বাসিন্দা অরুণ রায় জানান, তিনি পাশের বাদাঘাট বাজারে দোকানে ছিলেন। সন্ধ্যার দিকে তার বাদাঘাট বাজারের দোকানে ২০ থেকে ৩০ জন লোক ঢুকে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। এর পর বাজারের হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন দোকানপাট বন্ধ করে চলে যান। তিনি বলেন, "ঘটনার পর থেকে আমরা ভয়ের মধ্যে আছি। যে অপরাধ করেছে তার বিচার হোক, আমরাও চাই। একজনের অপরাধের জন্য যেন অন্যদের বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলা যেন না হয়, সেদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর দেওয়া প্রয়োজন।"
স্থানীয় নেতাদের বক্তব্য
বাদাঘাট বাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক হারুন মিয়া জানিয়েছেন, বুধবার বিকেলে ক্ষতিগ্রস্তরা এসে দোকানপাট খুলেছেন। গ্রামের স্কুলশিক্ষক রিপন রায় জানান, এ ঘটনার পর থেকে এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন আতঙ্কে রয়েছেন। তবে এই বিষয়ে স্থানীয় কেউ আর কিছুই জানাতে পারেননি। তাহিরপুর উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এবং বাদাঘাট কালীমন্দিরের সাংগঠনিক সম্পাদক গণেশ তালুকদার বলেন, "ঘটনার পর তিনটি মন্দির ভাঙচুর করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি বাদাঘাট কালীমন্দির, গড়কাটির কালীমন্দির এবং দুর্গামন্দির। এই মন্দিরগুলোর সামনে থাকা নাটমন্দিরও ভাঙচুর হয়েছে।"
পুলিশের ভূমিকা ও আইনশৃঙ্খলা
বাদাঘাট ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি নজরুল শিকদার বলেন, "রাতে বাদাঘাট কালীমন্দিরের সাংগঠনিক সম্পাদক মন্দিরে ভাঙচুর হতে পারে জানালে আমি সঙ্গে সঙ্গে ওখানে গিয়ে কাউকে পাইনি। বুধবার সকালে মন্দিরে গিয়ে অবস্থা দেখে তাহিরপুর থানার ওসিকে জানাই।" সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার এ বি এম জাকির হোসেন অভিযুক্ত তরুণের বাড়ি, দোকান, স্থানীয় মন্দিরসহ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান।



