বিয়ে ও প্রেমের সম্পর্কের ফাঁদে ফেলে বাংলাদেশি নারীদের বিদেশে পাচারের একটি নতুন কৌশল সামনে এসেছে। গত সাত মাসে একই অভিযোগে ছয় চীনা নাগরিক গ্রেফতার হয়েছেন। পাশাপাশি ভালো চাকরি ও উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে নারীদের পাচারের ঘটনাও ঘটছে। অভিবাসন সংশ্লিষ্টদের মতে, স্থানীয় দালালদের সহযোগিতায় আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্র সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। গত সাত-আট বছরে নির্যাতন, শোষণ ও প্রতারণার শিকার হয়ে বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছেন ৭০ হাজারের বেশি নারী।
বিমানবন্দরে দুই চীনা নাগরিক গ্রেফতার
২০২৪ সালের ৭ নভেম্বর বিয়ে ও প্রেমের ফাঁদে ফেলে বাংলাদেশি দুই নারীকে চীনে পাচারের চেষ্টার সময় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে দুই চীনা নাগরিককে হাতেনাতে গ্রেফতার করা হয়। তারা হলেন মে পেনগুই ও তিয়ান জেংওয়েন। রানী আক্তার ও মালিনা মারাককে বিভিন্ন লোভ দেখিয়ে বিয়ে করে উন্নত জীবনের প্রলোভনে চীনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন তারা।
বিমানবন্দরে পৌঁছে ওই দুই নারী বুঝতে পারেন, তাদের অসৎ উদ্দেশ্যে চীনে নেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি আঁচ করতে পেরে তারা দুই চীনা নাগরিকের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়েন এবং যেতে অস্বীকৃতি জানান। এতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে এলে দুই চীনা নাগরিককে গ্রেফতার করা হয়।
একই কৌশলে আরও গ্রেফতার
একই বছরের ৯ ডিসেম্বর একই কৌশলে আরেক নারীকে পাচারের সময় গ্রেফতার হন দুই চীনা নাগরিক ফ্যান গোউয়ে (২৭) ও ইয়াং জিকু (২৫)। চাঁদপুরের এক ভুক্তভোগীর অভিযোগের ভিত্তিতে বিষয়টি প্রথমে এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের নজরে আসে। পরে তাদের গ্রেফতার করা হয়।
এরপর ২০২৫ সালের ২৮ মে একই অভিযোগে আরও দুই চীনা নাগরিক হু জানজুন (৩০) ও জিয়াং লিজি (৫৪) গ্রেফতার হন।
প্রেমের ফাঁদ ও পাচারের কৌশল
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে প্রেমের ফাঁদে ফেলে নারীদের বিদেশে নিয়ে যাওয়ার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গ্রামের সহজ-সরল নারীদের টার্গেট করে একটি চক্র তাদের পাচার করছে। এ ক্ষেত্রে চীনা নাগরিকদের সম্পৃক্ততা বেশি দেখা যাচ্ছে। একাধিকবার গ্রেফতারের পরও চক্রটি তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
তবে শুধু প্রেমের ফাঁদই নয়, ভালো চাকরি ও উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়েও নারীদের মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাচার করা হচ্ছে। সেখানে গিয়ে প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পারলে কেউ নানা উপায়ে দেশে ফিরতে পারছেন, আবার কেউ ফিরতেও পারছেন না। সম্প্রতি পাচারের শিকার এক নারী কম্বোডিয়া থেকে ফিরে বিমানবন্দর থানায় মামলা করেছেন। গত প্রায় সাত-আট বছরে ৭০ হাজারের বেশি নারী নির্যাতন ও শোষণের শিকার হয়ে বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছেন।
চীনা নাগরিকদের ফাঁদ
চীনা নাগরিকদের গ্রেফতার এবং ভুক্তভোগী নারীদের বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশের একটি সূত্র জানায়, মানবপাচারকারী চীনা নাগরিকরা বাংলাদেশে এসে নিকুঞ্জ, উত্তরা কিংবা বসুন্ধরা এলাকায় অবস্থান নেন। এরপর স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে গ্রামের মেয়েদের সঙ্গে ফেসবুকে পরিচয় গড়ে তোলেন। তিন থেকে ছয় মাস যোগাযোগ রাখার পর তারা বাংলাদেশে এসে ওই তরুণীর গ্রামের বাড়িতে যান। নানা কৌশলে পরিবারের আস্থা অর্জন করে বিয়ের মাধ্যমে মেয়েদের চীনে নিয়ে যান বা নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রকৃত উদ্দেশ্য থাকে তাদের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করে দেওয়া।
এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অনিতা রানী সূত্রধর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বেশ কিছু দেশের মানবপাচারকারী চক্র স্থানীয় দালালদের সহযোগিতায় নারী পাচারের চেষ্টায় লিপ্ত। তারা মূলত গ্রামের সহজ-সরল নারীদের টার্গেট করে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে পাচারের চেষ্টা করে। তথ্য পেলে আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করি।’
ভালো চাকরি ও উন্নত জীবনের প্রলোভন
কাস্টমার কেয়ার সার্ভিসে চাকরি দেওয়ার কথা বলে এক নারীকে কম্বোডিয়ায় পাচার করা হয়। সেখানে গিয়ে তিনি নানা নির্যাতনের শিকার হন এবং সম্প্রতি দেশে ফিরে বিমানবন্দর থানায় মামলা করেন।
এজাহারে তিনি উল্লেখ করেন, প্রতি মাসে ১ লাখ টাকা বেতনে কম্বোডিয়ায় কাস্টমার কেয়ার সার্ভিসে চাকরির প্রলোভন দেখান রাজবাড়ীর খাগজানা এলাকার বাসিন্দা মো. রুবেল। এই চক্রে ছিলেন ফরিদপুরের মধুখালীর আনিসুর রহমান ও গাজীপুরের বেলাল হোসেন।
ঋণের ফাঁদে ফেলেই ওই তরুণীকে কম্বোডিয়ায় নেওয়া হয়। রুবেল একসময় ফরিদপুরের একটি এনজিওতে চাকরি করতেন। গ্রামে কিস্তি সংগ্রহ করতে গিয়ে তার সঙ্গে ওই তরুণীর পরিচয় হয়। পরে ওই তরুণী এনজিও থেকে ২ লাখ টাকা ঋণ নেন। কিস্তি বকেয়া পড়লে রুবেল তাকে কম্বোডিয়ায় ভালো বেতনের চাকরির প্রস্তাব দেন। তিনি জানান, কম্বোডিয়ায় থাকা আনিসুর রহমানের মাধ্যমে ১ লাখ টাকা মাসিক বেতনে চাকরি দেওয়া হবে। তবে সেখানে যেতে ৪ লাখ টাকা লাগবে।
প্রথমে রুবেল এনজিও থেকে ওই নারীকে ১ লাখ টাকা ঋণ পাইয়ে দেন। বাকি টাকা পরে দিতে হবে বলে জানান। এরপর পাসপোর্টসহ ১ লাখ টাকা আনিসুর রহমানের কাছে পাঠানো হয়। ধারদেনা করে আরও ২ লাখ টাকা আনিসুরের অ্যাকাউন্টে পাঠান ওই নারী। পরে রুবেল তার বাড়ি গিয়ে আরও ১ লাখ টাকা নেন। গত বছরের ১৮ আগস্ট ওই নারী কম্বোডিয়ায় যান।
তার অভিযোগ, কম্বোডিয়ায় পৌঁছানোর পর রুবেল বিমানবন্দরে তাকে রিসিভ করেন এবং জোর করে তার পাসপোর্ট ও ডলার নিয়ে নেন। এরপর নিজের ভাড়া বাসায় ১০ দিন রেখে কলসেন্টারের কাজ শেখান। পরে তাকে একটি চীনা কোম্পানির কাছে ১ হাজার ৫০০ ডলারে বিক্রি করে দেওয়া হয়।
প্রথম মাসে কিছু ডলার পেলেও পরের মাসের বেতন নিয়ে যান আনিসুর। পরে ওই কোম্পানি থেকে তাকে বের করে দেওয়া হয়। এরপর আনিসুর তাকে আরেকটি কোম্পানিতে নিয়ে গিয়ে সহযোগী বেলালের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। সেখানে তাকে মডেলিং করতে বলা হয়। রাজি না হওয়ায় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়। পরে বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে মোবাইল ফোনে আপত্তিকর কথাবার্তা বলে প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে বাধ্য করা হয়। এতে অস্বীকৃতি জানিয়ে দেশে ফিরতে চাইলে তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়।
এজাহারে ওই নারী আরও উল্লেখ করেন, রুবেল ও আনিসুর তাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করেছেন। পরে তিনি পালিয়ে ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারের সহায়তায় দেশে ফিরে আসেন।
বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল হাসান তালুকদার বলেন, ‘ঘটনাটি নিয়ে আমরা কাজ করছি। এজাহারে যাদের নাম উল্লেখ রয়েছে, তাদের গ্রেফতারে আমাদের টিম কাজ করছে।’
সৌদি আরবেও একই চিত্র
কম্বোডিয়া থেকে ফিরে আসা নারীর মতো আরেক নারী সৌদি আরবে ‘টিস্যু কোম্পানিতে’ কাজ দেওয়ার নামে যৌন ও মানবিক নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরেছেন।
২০২৫ সালে তিনি সৌদি আরবে যান। গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর চাকরি পরিবর্তনের চেষ্টা করেন। সেই সুযোগে দালাল চক্র তাকে একটি টিস্যু কোম্পানিতে কাজের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু সেখানে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন, প্রতারণার মাধ্যমে তাকে যৌন কাজে বাধ্য করা হচ্ছে।
তাকে একটি কক্ষে আটকে রাখা হতো। নিয়মিত মারধর, অমানবিক আচরণ এবং খাদ্যবঞ্চনার শিকার হতে হয়েছে। অসুস্থ হয়ে পড়লেও কোনো চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। দীর্ঘদিন নির্যাতনের মধ্যে থাকার পর তিনি একাধিকবার যৌন নির্যাতনের শিকার হন এবং পরে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন। কয়েক মাস কারাভোগের পর দেশে ফিরে সন্তান জন্ম দেন।
অভিবাসন খাতে কাজ করা সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। ২০২৫ সালে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় দুই হাজার নারী নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরেছেন। আর ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ফিরেছেন এক হাজার নারী।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক জানিয়েছে, গত সাত বছরে অন্তত ৭০ হাজার নারী কর্মী বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছেন। তাদের অধিকাংশই কোনো না কোনো ধরনের নির্যাতন, শোষণ বা প্রতারণার শিকার হয়েছেন। একই সময়ে বিদেশ থেকে প্রায় ৮০০ নারী কর্মীর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে স্পষ্ট করে।
যা বলছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ শরিফুল হাসান বলেন, ‘চীনা নাগরিকরা দেশে এসে বিয়ে বা প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলে নারীদের চীনে নিয়ে যাচ্ছেন। দূতাবাসের মাধ্যমে তাদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া জরুরি। একই সঙ্গে বিদেশে গিয়ে কেউ নির্যাতনের শিকার হলে যেন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সেই নিশ্চয়তাও থাকতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘নানা উপায়ে নারীরা পাচারের শিকার হচ্ছেন। এক ধরনের কাজের কথা বলে বিদেশে নিয়ে গিয়ে অন্য কাজে বাধ্য করা হচ্ছে, নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে। এমনকি অনেকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে ফিরছেন। এটি অবশ্যই উদ্বেগজনক।’
তার ভাষ্য, ‘একজন নারী বিদেশে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হলে আমরা কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারি না। এটাই আমাদের বড় দুর্বলতা। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়, দেশে এসে হয়তো বিভিন্নভাবে সহায়তা করা হয়; কিন্তু যারা নির্যাতন বা নিপীড়ন করেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায় না।’
তিনি আরও বলেন, ‘নারীরা বিদেশে অবশ্যই যাবেন। তবে নার্সিংসহ অন্যান্য দক্ষ পেশায় প্রশিক্ষণ নিয়ে গেলে ঝুঁকি কমবে। শুধু গৃহকর্মী হিসেবে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হলে হবে না, যারা এই নির্যাতনের জন্য দায়ী, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। নারীরা বিদেশে গিয়ে যেন পাচার বা নিপীড়নের শিকার না হন, সে জন্য আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।’
বাংলাদেশি দূতাবাসগুলোকে প্রতিটি অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করতে হবে এবং ভুক্তভোগীদের দ্রুত আইনি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।



