বাংলাদেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সাদা, নীল, হলুদ, সোনালি রঙের সংগঠন আছে, যা তাদের রাজনৈতিক অবস্থান নির্দেশ করে। বিশ্বের উগ্রবাদী সংগঠনগুলোর মধ্যেও রঙের ব্যবহার রয়েছে, যেখানে রংবাহী পতাকার মাধ্যমে সদস্যপদ প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশে এসব সংগঠন আইনগতভাবে নিষিদ্ধ, কিন্তু সম্প্রতি রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ইসলামের ‘কালেমা শাহাদাত’ খচিত সাদা পতাকা রাস্তার পাশে টাঙানো এবং মিছিলের ঘটনা ঘটেছে। গণমাধ্যমের খবর বলছে, এসব পতাকা বিভিন্ন উগ্রবাদী সংগঠনের আদলে তৈরি।
উগ্রবাদী পতাকার প্রতীকী ব্যবহার
প্রশ্ন হলো, কালেমা শাহাদাত লেখা পতাকা থাকলেই কি সেটি উগ্রবাদী সংগঠনের পতাকা? ‘দ্য গ্লোবাল ইমাম কাউন্সিল’ (জিআইসি) থেকে প্রকাশিত ‘সিম্বলস অব টেরর’ বইতে উগ্রবাদী সংগঠনগুলোর পতাকা ও লোগো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে, যা কানাডার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জনসচেতনতার জন্য রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করে। বইয়ে বলা হয়েছে, সাদা, কালো, হলুদ, কমলা রঙের ওপর কালেমা শাহাদাত ব্যবহার করে বহু উগ্রবাদী সংগঠন। ক্যালিগ্রাফির ধরনভেদে একই রঙের পতাকায় সংগঠনের নামের ভিন্নতা দেখা যায়।
আইএস, তালেবান ও আল-কায়েদার পতাকা
২০০৪ সালে আল-কায়েদা থেকে জন্ম নেওয়া ইসলামিক স্টেট ইন ইরাক আল সাম (আইএসআইএস) কালো পতাকার ওপর সাদা রঙে কালেমা শাহাদাত এবং মাঝখানে সাদা বৃত্তের ভেতর মুহাম্মদ (সা.) লেখা ব্যবহার করে। এই পতাকা বোকো হারাম, আবু সায়াফ গ্রুপ (এএসজি), আল-কায়েদা ইন ইসলামিক মাগরিব (একিউআইএম) ব্যবহার করে। সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডে কালো বর্ণের পতাকা তেহেরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) ব্যবহার করে, যাতে অতিরিক্ত তলোয়ার চিহ্ন থাকে। ১৯৮৮ সালে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানভিত্তিক আল-কায়েদার কালো পতাকায় সাদা রঙে কালেমা শাহাদাত ‘স্ট্যান্ডার্ড ক্যালিগ্রাফি’-তে লেখা। হিযবুত তাহ্রীরও এই পতাকা ও কমলা রঙের পতাকা ব্যবহার করে। নব্বইয়ের দশকে প্রতিষ্ঠিত আফগান তালেবানের সাদা পতাকায় কালো রঙে কালেমা শাহাদাত লেখা হয়।
অন্যান্য রঙের পতাকা
সাদা, কালো ছাড়াও সবুজ রঙের পতাকায় কালেমা শাহাদাত ব্যবহার করে সোমালিয়ার আল শাবাব ও পাকিস্তানের লস্কর-ই-জংভি। হরকাতুল মুজাহিদীন সমান্তরাল চারটি স্ট্রিপের মধ্যে দুই পাশে কালো ও মাঝখানে দুটি সবুজ রেখার মধ্যে আরবি হরফে জিহাদ লেখা পতাকা ব্যবহার করে।
হোলি আর্টিজানের ১০ বছর ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
হোলি আর্টিজান ঘটনার ১০ বছর পূর্তির প্রাক্কালে (১ জুলাই ২০২৬) উগ্রবাদী সংগঠনের আদলে পতাকা ওড়ানোর ঘটনা দেশের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। ড. নাদিম মাহমুদ, গবেষক, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বলেন, ‘সাদা কালো পতাকা মিছিল নিয়ে সরকারের অবস্থা কী তা বোঝা যাচ্ছে না। কোনো অঘটন ঘটার আগে, সরকারকে সতর্ক হতে হবে, কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।’
সরকারের ভূমিকা ও উদ্বেগ
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ঢাকায় নিষিদ্ধ সংগঠনগুলোর শোডাউন দেখা গেছে। দেশি-বিদেশি পত্রিকায় খবর বের হওয়ার পর সরকার অনেককে গ্রেপ্তার করে। বায়তুল মোকাররমের সামনে নিষিদ্ধ সংগঠনের কর্মসূচি প্রতিহত করতে গিয়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। তবে এর বাইরে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে জোরালো ভূমিকা দেখা যায়নি। ড. নাদিম মাহমুদ আরও বলেন, ‘ধর্মের অন্তরালে উগ্রবাদিতা এই অঞ্চলের বড় সমস্যা। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে উগ্রবাদীরা আবারও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।’
অতীতে বিভিন্ন সরকারের আমলে উগ্রবাদীদের তৎপরতা দেখা গেছে। এখন তারা নতুন করে মাথাচাড়া দেওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছে। অন্তর্বর্তী দুর্বল সরকারের শাসনব্যবস্থায় উগ্রবাদী সংগঠনগুলো পুষ্ট হয়েছে, কিন্তু নির্বাচিত সরকারের কাছে প্রশ্রয় পাবে না বলে আশা করা যায়। সরকারের উচিত দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া, গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো। আমরা চাই না বাংলাদেশকে বহির্বিশ্ব উগ্রবাদীদের আশ্রয়স্থল হিসেবে চিনুক, বিনিয়োগ বন্ধ হয়ে অর্থনীতির বড় ক্ষতি হোক।



