নোয়াখালীর চাটখিল পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ভীমপুর গ্রামের বেদেপল্লিতে সরকারি খাস জায়গায় গড়ে তোলা একটি কুঁড়েঘর বাইরে থেকে দেখতে সাধারণ মনে হলেও ভেতরে রয়েছে ভিন্ন চিত্র। সেখানে বসানো হয়েছে এয়ারকুলার (এসি) ও অত্যাধুনিক সিসিটিভি ক্যামেরা। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই আস্তানার মূল হোতা ববিতা আক্তার সুমাইয়া (৩৫) নামে এক নারী, যিনি দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় মাদককারবার পরিচালনা করে আসছেন।
অভিযোগ ও স্থানীয়দের বক্তব্য
অভিযোগ রয়েছে, এক সময় আওয়ামী লীগের নেতাদের সহযোগিতায় ব্যবসা শুরু করলেও বর্তমানে বিএনপির কিছু নেতার আশ্রয়ে ও প্রশ্রয়ে তিনি সেই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। এর আগে চাটখিল থানা পুলিশ কয়েক দফায় তাকে ইয়াবাসহ আটক করে আদালতে পাঠালেও জামিনে বের হয়ে পুনরায় একই ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন ওই নারী।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলাকার সাবেক এক মেম্বার জানান, মাদকের সঙ্গে সঙ্গে এখানে জমজমাট নারী ব্যবসাও চলে। এলাকার বাইরে থেকে বেগমগঞ্জ, সোনাইমুড়ী, চন্দ্রগঞ্জ থানা এলাকা এমনকি কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ থানা এলাকা থেকেও খদ্দেররা আসে এ আস্তানায়। এলাকার বয়োবৃদ্ধ আলী আহমদ (৬৫) বলেন, এ মধুকুঞ্জ এলাকার উঠতি বয়সের কিশোর ও যুবকদের ধ্বংস করে ফেলছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক জানান, থানা পুলিশ নিয়মিত মাসিক টাকা নেয় এই মাদক রানীর কাছ থেকে। এলাকার পক্ষ থেকে একবার পুলিশ সুপার বরাবর আবেদন করায় শাসক দলের ক্যাডারদের হাতে কয়েকজন এলাকাবাসীকে লাঞ্ছিত হতে হয়েছিল।
সরেজমিন ও প্রযুক্তির অপব্যবহার
সরেজমিন দেখা যায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ক্রেতাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য আস্তানার চারপাশে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। প্রযুক্তির এই অপব্যবহারের মাধ্যমে বেদেপল্লি থেকে প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি হওয়ায় চাটখিলের ছাত্র ও যুবসমাজ বিপথগামী হচ্ছে বলে দাবি স্থানীয়দের। তারা এই মাদক সিন্ডিকেটের নেপথ্যে থাকা গডফাদারদের আইনের আওতায় এনে অবৈধ আস্তানা উচ্ছেদের দাবি জানিয়েছেন।
রাজনৈতিক নেতার প্রতিক্রিয়া
চাটখিল পৌরসভা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক বিকে হানিফ বলেন, একজন মাদককারবারির কাছে পুলিশ, সাংবাদিক, রাজনৈতিক নেতা ও স্থানীয় মানুষ সবাই অসহায়। পুলিশ বা বহিরাগত কারো উপস্থিতি টের পেলেই তারা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে দলবেঁধে বের হয়ে আসে। ববিতার এত ক্ষমতার উৎস খুঁজে বের করা দরকার। যারা তাকে পেছন থেকে সহযোগিতা করছে, তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।
পুলিশের তথ্য ও ববিতার বক্তব্য
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ববিতা আক্তার সুমাইয়ার বিরুদ্ধে থানায় সাতটি মাদক মামলা রয়েছে। এ পর্যন্ত ছয়বার তিনি পুলিশের হাতে আটক হয়েছেন। তবে প্রতিবারই জামিনে মুক্ত হয়ে পুনরায় একই কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। তাকে আটক করতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও স্থানীয়রা হামলার শিকার হয়েছেন বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে একাধিকবার ফোন করলেও রিসিভ করেননি ববিতা আক্তার সুমাইয়া। পরে মাদকসেবীর ফোন থেকে কল করে সাংবাদিক পরিচয় দিতেই তিনি চিৎকার করে বলেন, ‘সাংবাদিক? কি লাগবো? টাকা লাগলে বা ‘ছেমরি’ লাগলে কন পৌঁছে যাবে; মাগার তেড়িবেড়ি করলে নারী নির্যাতন ও মাদক মামলায় ফাঁসাই দিমু হালায়। থানা এবং কোর্টে দুহানেই মামলা রেডি থাকে সব সময়। আর সাবধান কইরা দিতাছি আমার বিরুদ্ধে বা আমার আশপাশে লাগার চেষ্টা করিস না, তাহলে খবর আছে।’
থানার ওসির মন্তব্য
এ বিষয়ে চাটখিল থানার ওসি আব্দুল মোন্নাফ বলেন, ওই নারী মাদককারবারি। তাকে কতবার ধরে চালান দিলাম। এখন সড়ক জনপথ বিভাগের একটি জায়গা টার্গেট ছিল। সেটা না পেরে এখন নাকি নতুন করে ঘর দরজা উঠাচ্ছে। আমি আসার পর তার বিরুদ্ধে দুটি মাদকের মামলা দেওয়া হয়েছে। এর আগেও তার বিরুদ্ধে মাদকের মামলা ছিল। সে খুব বেপরোয়া। কিছু দিন আগেও তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তবে তার এমন বিলাসবহুল জীবনযাপনের বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।



