গাজার শিশু হত্যায় বিশ্ববিবেকের নীরবতা: কবি সুফিয়া কামালের প্রসঙ্গ
গাজার শিশু হত্যায় বিশ্ববিবেকের নীরবতা

কবি সুফিয়া কামাল ‘তাহারেই পড়ে মনে’ কবিতার শুরুতেই লিখিয়াছেন, ‘হে কবি, নীরব কেন ফাগুন যে এসেছে ধরায়,/ বসন্তে বরিয়া তুমি লবে না কি তব বন্দনায়?’ কালজয়ী এই কবিতায় এই প্রশ্নটি মূলত কবির বিষাদ, উদাসীনতা ও প্রিয়জন হারানোর গভীর শোক বুঝাইতে ব্যবহার করা হইয়াছে। প্রকৃতিতে ঋতুরাজ বসন্ত আসিয়া গিয়াছে, চারিদিক পাখির কলতান, নূতন ফুল ও সুরভিত বাতাসে মুখরিত; কিন্তু কবি প্রিয়জন হারানোর বেদনায় এতটাই শোকে মুহ্য যে এই আনন্দময় মুহূর্তে কোনো গান বা কবিতা তিনি লিখিতেছেন না। আমরাও কি আজ এতটাই শোকাহত যে, ফিলিস্তিনের গাজায় নিষ্ঠুরভাবে শিশুহত্যার পরও আমাদের নীরবতা ভাঙিতেছে না!

শোকের মাত্রা ও নীরবতা

কথায় বলে : অল্পশোকে কাতর, অধিক শোকে পাথর। সামান্য শোকে মানুষ বিলাপ করিতে পারে, কাঁদিতে পারে; কিন্তু শোক যখন চরম আকার ধারণ করে, তখন মানুষ বাদ্ধ বা নির্বাক হইয়া যায়। এই অসহায়ত্বের কারণেই কি গাজার শিশুদের নির্মম ভাগ্য দেখিয়াও আমরা নীরব- নিস্তব্ধ হইয়া রহিয়াছি?

জাতিসংঘের রিপোর্টে ভয়াবহ পরিসংখ্যান

জাতিসংঘের একটি স্বাধীন আন্তর্জাতিক কমিশনের রিপোর্টে বলা হইয়াছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হইতে ২০২৫ সালের ৭ অক্টোবর পর্যন্ত গাজায় শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করিয়া নির্বিচারে হত্যা করা হইয়াছে। এই সময়ে ২০ হাজার ১৭৯ জন শিশুকে হত্যা করা হইয়াছে নির্মমভাবে। নিহত শিশুদের এই সংখ্যা এই সময়ে যুদ্ধে নিহত মোট ফিলিস্তিনিদের ৩০ শতাংশ। ঔষধ, খাবার ও ত্রাণসামগ্রি চলাচলে অবরোধ সৃষ্টি করায় অনাহারেও অনেক শিশু মারা গিয়াছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এথনিক ক্লিনজিংয়ের অভিযোগ

এই যে মহাকালের ললাটে এইভাবে কলঙ্কতিলক অঙ্কিত হইল, তাহা মানব সভ্যতার ইতিহাসে মুছিবার সাধ্য কাহার? এই নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ কেবল যুদ্ধাপরাধ বা মানবতাবিরোধী অপরাধ নহে; ইহা একটি পরিকল্পিত, দীর্ঘ ও বীভৎস এথনিক ক্লিনজিং বা ‘জাতিগত নিধন’। শিশুদের হত্যা করিয়া একটি প্রজন্মকে যদি নিশ্চিহ্ন করা যায়, তাহা হইলে একদিকে যেমন বড়রা ভীতসন্ত্রস্ত ও তটস্থ থাকিবেন, তেমনি ভবিষ্যতে প্রতিবাদ করিবার মতো কোনো কণ্ঠস্বর থাকিবে না। তখন অন্যায়ভাবে সম্প্রসারণবাদী নীতির বাস্তবায়ন করাও সহজ হইবে। এই জন্য ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সাম্রাজ্যবাদী লালসার বড় শিকারে পরিণত হয় অবোধ শিশুরা।

পশ্চিম তীরেও একই নিধনযজ্ঞ

গাজার পর পশ্চিম তীরের নিষ্পাপ শিশুদের আর্তনাদে আকাশ-বাতাস আজ প্রকম্পিত হইতেছে! গাজার মতো সেইখানেও চলিতেছে একই নিধনযজ্ঞ, ধ্বংসলীলা। ইহার শেষ কোথায়? যুদ্ধবিরতির পরেও এমন হত্যাকাণ্ড স্তিমিত হইতেছে না! ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত, ঔষধহীন শিশুরা যখন বোমার আঘাতে কিংবা অনাহারের যন্ত্রণায় ঝুঁকিয়া ধুঁকিয়া প্রাণত্যাগ করে, তখন মানবতার সকল অহংকার চূর্ণবিচূর্ণ হইয়া যায়। নবজাতক শিশুরা যখন হাসপাতালের অবরুদ্ধ প্রকোষ্ঠে অক্সিজেনের অভাবে নীল হইয়া শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে, তখন এই দৃশ্য দেখিয়া যাহাদের হৃদয় কাঁপিয়া উঠে না, তাহারা এই ধরাধামে মানুষ নামের কলঙ্ক!

বিশ্বনেতাদের নীরবতার সমালোচনা

ধিক এই বৈভবশালী পৃথিবীকে, ধিক আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ও বিশ্বনেতাদের যাহারা এখনো জাগিয়া জাগিয়া ঘুমাইতেছেন। সকল কিছু দেখিয়াও না দেখিবার ভান করিতেছেন। শোকে পাথর শান্তিকামী বিশ্ববাসীর অসহায়ত্বকে তাহারা একপ্রকার উপভোগ করিয়া চলিতেছেন বলিলে কি অত্যুক্তি হইবে? যে বিশ্ববিবেক ক্ষুদ্র স্বার্থে কিংবা ভূরাজনীতির সমীকরণে উচ্চকণ্ঠ হইয়া উঠে, তাহা আজ শিশুদের এমন পরিণতি দেখিয়াও মূক ও বধির সাজিয়া রহিয়াছে। পরাশক্তি রাষ্ট্রসমূহের মৌখিক সমবেদনার বাণী শুনাইতেছে ব্যর্থ পরিহাস। অথচ তাহারা নেপথ্যে ঘাতকের হস্তে তুলিয়া দিতেছে মারণাস্ত্র!

মানবাধিকারের ব্যর্থতা

আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন, মানবাধিকারের গালভরা বুলি—আজ সকলই যেন ব্যর্থ ও বৃথা বলিয়া প্রতীয়মান হইতেছে। ইহা বিশ্ববিবেকের দেউলিয়া দশাকেই কি উপহাস করিতেছে না? এখনো সময় আছে, ফুলের ন্যায় পবিত্র যে কোনো দেশের শিশুদের জীবন লইয়া ছিনিমিনি খেলা বন্ধ হউক, অবসান ঘটানো হউক সকল অমানবিকতা, নিষ্ঠুরতা ও পৈশাচিকতার; নতুবা ইতিহাস আমাদের কখনো ক্ষমা করিবে না।