বন্ধুর হাতে খুন হাসিব: নেশার ঝগড়ায় হত্যা, নাটকীয়তা শেষে গ্রেপ্তার
বন্ধুর হাতে খুন হাসিব: নেশার ঝগড়ায় হত্যা, গ্রেপ্তার

বন্ধুর হাতে খুন হাসিব: নেশার ঝগড়ায় হত্যা, নাটকীয়তা শেষে গ্রেপ্তার

খুলনা শহরের দুই বন্ধু হাসিব মৃধা ও মো. সোহেল প্রায় সব সময় একসঙ্গেই থাকতেন। তাঁদের আলাদা করে দেখা যেত না বললেই চলে। দিনমজুরের কাজ করে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়াতেন তাঁরা। কিন্তু গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে হঠাৎ করেই দুজনেই উধাও হয়ে যান। পরিবার ভেবেছিল, হয়তো কোথাও কাজে চলে গেছেন। তিন দিন পর সোহেল ফিরে এলেও হাসিবের কোনো খোঁজ মিলছিল না। এই ঘটনাই এক ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের দিকে নিয়ে যায় তদন্তকারীদের।

নিখোঁজের নাটক ও মায়ের মরিয়া খোঁজ

হাসিবের মা সুইটি বেগম ছেলের খোঁজে ছুটে যান তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু সোহেলের কাছে। সোহেল জানান, তাঁরা দুজন দিনমজুরের কাজ করতে তিন দিন আগে একসঙ্গে খুলনা থেকে ঢাকায় গিয়েছিলেন। তিনি ফিরে এলেও হাসিব আর ফেরেননি। ছেলের খোঁজে মরিয়া হয়ে ওঠেন হাসিবের মা-বাবা হাসান মৃধা। তাঁরা জিজ্ঞাসা করেন, কোথায় রেখে আসা হয়েছে তাঁদের ছেলেকে? সোহেল তখন বলেন, গত বছরের ২১ সেপ্টেম্বর ঢাকার রমনা বটমূলে হাসিবকে রেখে তিনি এলাকায় ফিরে আসেন।

ছেলের খোঁজে ঢাকায় যেতে চান হাসিবের মা-বাবা। ২৫ সেপ্টেম্বর সোহেল নিজেই তাঁদের সঙ্গে নিয়ে ট্রেনে করে ঢাকায় যান। রাজধানীর রমনার বটমূল, মৎস্য ভবন, শাহবাগ, গুলিস্তানের গোলাপ শাহ মাজারের আশপাশের এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা খোঁজাখুঁজি করেন তাঁরা। কিন্তু কোনো সন্ধান মেলেনি। শেষ পর্যন্ত নিরাশ হয়ে আবার খুলনায় ফিরে যান হাসিবের মা–বাবা। তখনো কেউ বুঝতে পারেননি—ছেলের যে বন্ধু ছেলেকে খুঁজতে পাশে দাঁড়িয়েছেন, তিনিই আসলে খুনি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বেওয়ারিশ লাশ ও পরিচয় শনাক্ত

গত বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর খুলনার লবণচরা থানার শিপইয়ার্ড এলাকার বড় পন্টুনের পূর্ব পাশে রূপসা নদীর কিনারে ভাসমান অবস্থায় অজ্ঞাতপরিচয় এক পুরুষের লাশ উদ্ধার করে রূপসা নৌ পুলিশ ফাঁড়ি। লাশটিতে পচন ধরায় তাৎক্ষণিকভাবে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এ ঘটনায় পুলিশ একটি অপমৃত্যুর মামলা করে। পরে বেওয়ারিশ হিসেবে লাশটি দাফন করা হয়।

পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) খুলনা জেলা পুলিশের একটি দল ঘটনাটি নিয়ে ছায়াতদন্ত শুরু করে। আশপাশের জেলাসহ বিভিন্ন থানায় খোঁজ চলছিল, ২৩ সেপ্টেম্বরের আগে বা পরে কোনো নিখোঁজের অভিযোগ আছে কি না? পিবিআইয়ের তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানতে পারেন, লবণচরা থানায় এমন একটি অভিযোগ আছে। সেই অভিযোগের সূত্র ধরে হাসিবের মা সুইটি বেগমের সঙ্গে যোগাযোগ হয়।

২৯ সেপ্টেম্বর হাসিব মৃধার মা সুইটি বেগমকে উদ্ধার হওয়া লাশের স্থিরচিত্র দেখানো হয়। ডান হাতের বাহুতে থাকা ট্যাটু, পোশাক ও শারীরিক গঠন দেখে সুইটি বেগম লাশটি তাঁর ছেলে হাসিবের বলে শনাক্ত করেন। লাশ শনাক্ত হওয়ার মুহূর্তেই সন্দেহের তীর ঘুরে যায় ছেলে হাসিবের বন্ধু সোহেলের দিকে।

সোহেলের গ্রেপ্তার ও স্বীকারোক্তি

শুরুতে সোহেল স্বীকার করছিলেন না। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর সোহেলকে নজরদারিতে রাখে পিবিআই। এর মধ্যে সোহেল একটি চুরির মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে চলে যান। এদিকে গত ১৮ নভেম্বর খুলনা সদর থানায় সোহেলকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন হাসিবের মা সুইটি বেগম। ২৫ নভেম্বর সোহেলকে হত্যা মামলায় রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ২৭ নভেম্বর তিনি হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই খুলনা জেলার উপপরিদর্শক (এসআই) রেজোয়ান আহমেদ বলেন, “পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনায় অনেকটাই নিশ্চিত যে হাসিবকে হত্যা করেছেন সোহেল। প্রযুক্তিগত তদন্তেও এমনটাই মনে হয়েছে। পরে হাসিব হত্যা মামলায় সোহেলকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।”

নেশা নিয়ে ঝগড়ার জেরে হত্যা

পিবিআইয়ের জিজ্ঞাসাবাদে সোহেল জানান, গত ২১ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যার পর তিনি হাসিব মৃধাকে খুলনা সদর এলাকার হেলাতলা মোড় থেকে ইজিবাইকে করে রূপসা নদীর পাড়ে নিয়ে যান। সেখানে আঠা (ড্যান্ডি)–জাতীয় নেশাদ্রব্য সেবন নিয়ে তাঁদের মধ্যে ঝগড়া হয়। একপর্যায়ে সোহেল হাসিবের বুকের নিচে কিল-ঘুষি মারেন। এতে হাসিব অজ্ঞান হয়ে পড়েন। হাসিবকে মৃত ভেবে লাশ গোপন করতে রূপসা নদীতে ফেলে দেন সোহেল। এরপর এলাকায় ফিরে এসে শুরু করেন নিখোঁজ বন্ধুকে খোঁজার নাটক।

খুলনা জেলা পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার রেশমা শারমিন বলেন, “গলিত লাশ উদ্ধারের ঘটনাটি শুরুতে ক্লুলেস ছিল। লাশের পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পর প্রযুক্তিগত তদন্তে একজনের বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায়। এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তি এরই মধ্যে আদালতে জবানবন্দি দিয়ে হত্যার দায় স্বীকার করেছেন। শিগগিরই এই হত্যা মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হবে।”

এই ঘটনায় খুলনা জেলায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। বন্ধুর হাতে খুন হওয়ার এই মর্মান্তিক ঘটনা স্থানীয়দের মধ্যে শোক ও আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে। পুলিশের দ্রুত তদন্ত ও গ্রেপ্তার ন্যায়বিচারের আশা জাগিয়েছে।