কুষ্টিয়ায় দরবারে হামলা: পীর হত্যা ও ভাঙচুরের পরও ধোঁয়া উঠছে
কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নে একটি দরবারে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়েছে। রোববার সকাল নয়টায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দরবারের ধ্বংসাবশেষ থেকে এখনো ধোঁয়া বের হচ্ছে। গত শনিবারের এই ঘটনায় পীর শামীম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীর নিহত হয়েছেন এবং আহত দুই নারীসহ কয়েকজন আতঙ্কগ্রস্ত অবস্থায় রয়েছেন।
দরবারের ধ্বংসাবশেষ ও আতঙ্কের ছায়া
দরবারে সরেজমিনে দেখা গেছে, দুটি দালানে ব্যাপক ভাঙচুর করা হয়েছে। আগুনে দুটি আধা পাকা ঘর ছাই হয়ে গেছে এবং একটি ঘর থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছিল। ধ্বংসাবশেষ চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে। আশেপাশের বিভিন্ন বয়সী নারী, পুরুষ ও শিশুরা নীরবে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখছেন। দরবারের সামনে ১৫ থেকে ২০ জন পুলিশ সদস্য চেয়ার পেতে বসে আছেন, নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
আহত দুই নারীর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলে তাঁদের চোখে-মুখে আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট দেখা গেছে। তবে কেউই গণমাধ্যমের সামনে কথা বলতে রাজি হননি, যা ঘটনার ভয়াবহতা নির্দেশ করে।
নিহত পীরের ভাইয়ের বেদনাদায়ক বর্ণনা
দরবারের সামনে বাঁশবাগানের ভেতর দাঁড়িয়ে ছিলেন নিহত পীর শামীম রেজার বড় ভাই ফজলুর রহমান। তিনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষক। গণমাধ্যমের পরিচয় পাওয়ার পর ফুপিয়ে কেঁদে উঠে ফজলুর রহমান বলেন, 'চোখের সামনে ভাইকে কোপাতে দেখেছি, তার পুরো শরীর রক্তে ভেজা অবস্থায় ছিল। আফসোস, সে যদি কোনো অন্যায় করে থাকত, তার বিচার হতো; কিন্তু এভাবে একজন মানুষকে মানুষ কখনো মারে না।'
তিনি আরও জানান, গতকাল শনিবার দুপুরে নামাজ শেষ করে বাড়িতে খাবার খাওয়ার সময় মানুষের হইচই শুনতে পান। বাইরে বের হয়ে দেখেন, দরবারের সামনে এক থেকে দেড় শ মানুষ ভাঙচুর চালাচ্ছে এবং তাঁর ভাইকে দোতলা থেকে টেনে নিচে নামিয়ে এলোপাথাড়ি কোপাচ্ছে। পরে পুলিশের গাড়িতে করে ভাইকে হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। এ সময় আরও কয়েকজন আহত হন, তবে তাঁরা শঙ্কামুক্ত বলে জানা গেছে।
চিকিৎসক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের বিবরণ
দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা তৌহিদুল হাসান জানান, শামীমের অবস্থা খুবই খারাপ ছিল এবং তাঁকে কোপানো হয়েছে। চিকিৎসা শুরুর পাঁচ মিনিটের মধ্যেই অতিরক্ত রক্তক্ষরণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। ফজলুর রহমানের মতে, ভাইয়ের মরদেহ কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের মর্গে রয়েছে এবং ময়নাতদন্ত শেষে দাফন করা হবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, পীর শামীম পবিত্র কোরআন সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন—কয়েক বছর আগের ৩০ সেকেন্ডের একটি ভিডিও গত শুক্রবার থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং গতকাল সকালে শতাধিক মানুষ জড়ো হয়ে দুপুরের পর দরবারে হামলা চালায়।
হামলার ভিডিও ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ১৮ মিনিটের একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, গ্রামের পাকা সড়কে শতাধিক মানুষ স্লোগান দিয়ে দরবারের দিকে যায়। মিছিলের লোকজন দরবারের একতলা দুটি পাকা ভবন ও একটি টিনশেড ঘরে ঢুকে পড়ে এবং ভাঙচুর চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, হামলার সময় দরবারের ভেতরে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে পাঁচ থেকে সাতজন আহত হয়েছেন এবং অন্যরা দৌড়ে চলে যান। পরে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা এসে আগুন নেভান।
ফজলুর রহমান জানিয়েছেন, জানাজার পর ভাইয়েরা মিলে মামলা করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। এই ঘটনায় সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তেজনা ও শোকের ছায়া নেমে এসেছে, যা স্থানীয় প্রশাসনের কঠোর নজরদারি দাবি করছে।



