শ্রীবরদীতে ট্রাংকে নারী লাশ: সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়ল নীল পিকআপ ভ্যান
শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার পশ্চিম নয়াপাড়া ঢালিবাড়ী তিন রাস্তার মোড়ে একটি তালাবদ্ধ প্লেনশিট ট্রাংকে নারীর লাশ উদ্ধারের ঘটনায় তদন্তে নতুন মোড় নিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে নীল রঙের একটি পিকআপ ভ্যান শনাক্ত করার পর হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ঘটনার সূচনা ও লাশ শনাক্ত
১ এপ্রিল সকালে শ্রীবরদীর পশ্চিম নয়াপাড়া ঢালিবাড়ী তিন রাস্তার মোড়ে একটি বড় ট্রাংক পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়রা। ট্রাংকটি অস্বাভাবিক ভারী মনে হওয়ায় তারা পুলিশকে খবর দেয়। পুলিশ এসে তালা ভাঙতেই বেরিয়ে আসে তোশকে মোড়ানো এক নারীর অর্ধগলিত লাশ। নারীর হাত-পা বাঁধা অবস্থায় ছিল এবং মুখ স্থানীয়দের অচেনা ছিল।
পিবিআইয়ের তদন্তে প্রথমে প্রযুক্তির সহায়তায় নারীর পরিচয় শনাক্ত করা হয়। তিনি ডলি আক্তার (৩৫), নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা। লাশ শনাক্ত হওয়ার পরই ডলি আক্তারের ভাই শফিকুল ইসলাম শ্রীবরদী থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন।
সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়ল নীল পিকআপ
তদন্তকারীরা ঘটনাস্থল ও আশপাশের সিসিটিভি ক্যামেরার ভিডিও সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ শুরু করেন। ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ৪০০ মিটার দূরের একটি ক্যামেরার ভিডিওতে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র মেলে।
ভিডিওতে দেখা যায়, ১ এপ্রিল সকাল ৯টা ২৫ মিনিটে একটি নীল রঙের পিকআপ ভ্যান বড় একটি ট্রাংক নিয়ে এলাকায় ঢুকছে। মাত্র ১০ মিনিট পর, সকাল ৯টা ৩৫ মিনিটে একই গাড়ি ট্রাংক ছাড়াই বেরিয়ে যাচ্ছে। এই ১০ মিনিটের ফুটেজই তদন্তের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।
পিবিআইয়ের জামালপুর ইউনিটের ইনচার্জ পুলিশ সুপার পংকজ দত্ত বলেন, "সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা নীল পিকআপটি শনাক্ত করার পর আমরা হত্যাকারীদের চিহ্নিত করতে সক্ষম হই।"
গ্রেপ্তার ও হত্যার কারণ উদ্ঘাটন
নীল পিকআপ ভ্যানের সূত্র ধরে ৩ এপ্রিল শ্রীবরদীর ভেলুয়া এলাকা থেকে গাড়িচালক আশরাফ আলীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর তথ্যের ভিত্তিতে পরদিন ভোরে শেরপুর-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ভাতশালা এলাকায় একটি যাত্রীবাহী বাস থেকে নিয়ামুর নাহিদ (২৬) ও তাঁর স্ত্রী রিক্তা মনিকে (২৬) গ্রেপ্তার করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে নিয়ামুর নাহিদ স্বীকার করেন, গাজীপুরের শ্রীপুরে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে ডলি আক্তারকে হত্যা করা হয়। এরপর আশরাফ আলীর মাধ্যমে লাশ ট্রাংকে ভরে দেড় শ কিলোমিটার দূরে শ্রীবরদীর পশ্চিম নয়াপাড়া ঢালিবাড়ী তিন রাস্তার মোড়ে ফেলে দেওয়া হয়।
হত্যার বিস্তারিত ও পরিকল্পনা
তদন্তে জানা গেছে, নিয়ামুর নাহিদ ও তাঁর স্ত্রী রিক্তা মনি গাজীপুরের শ্রীপুরে ভাড়া বাসায় থাকতেন এবং একটি টেক্সটাইল কারখানায় কাজ করতেন। পরিচয়ের সূত্রে ৩০ মার্চ রাতে ডলি আক্তারকে নিজ বাসায় নিয়ে যান নাহিদ।
বাসায় যাওয়ার পর ডলি আক্তারের সঙ্গে নাহিদের কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে ডলি চিৎকার করলে বিষয়টি বাইরে জানাজানি হয়ে যেতে পারে, এই আশঙ্কায় নাহিদ তাঁর গলায় গামছা পেঁচিয়ে ধরেন। এতে শ্বাস রুদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়।
পিবিআই সূত্র জানিয়েছে, রাত সাড়ে ১০টার দিকে স্ত্রী রিক্তা মনিকে বাসায় নিয়ে আসার পথে ডলিকে হত্যার কথা জানান নাহিদ। এরপর দুজন মিলে লাশ গোপন করার পরিকল্পনা করেন। প্লেনশিটের একটি বড় ট্রাংক কেনা হয় এবং ডলি আক্তারের হাত-পা বেঁধে তোশকে পেঁচিয়ে লাশ ট্রাংকে ভরা হয়।
পরদিন ৩১ মার্চ মধ্যরাতে নীল রঙের পিকআপ ভ্যানটি ভাড়া করে ট্রাংকটি নিয়ে রওনা হন তারা। ১ এপ্রিল সকালে ট্রাংকটি শ্রীবরদীর পশ্চিম নয়াপাড়া ঢালিবাড়ী তিন রাস্তার মোড়ে ফেলে রেখে আবার গাজীপুরে ফিরে যান নাহিদ।
আরও তথ্য
ডলি আক্তার তাঁর স্বামী বিল্লালকে নিয়ে ময়মনসিংহের ভালুকার স্কয়ার মাস্টারবাড়ী আইডিয়াল মোড় এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। স্থানীয় একটি সোয়েটার কারখানায় কাজ করতেন তিনি। গত ৩০ মার্চ থেকে তাঁর মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া গেলে স্বজনেরা খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। পরে শ্রীবরদী থানায় গিয়ে ভাই শফিকুল ইসলাম বোনের লাশ শনাক্ত করেন।
পিবিআইয়ের কর্মকর্তা পংকজ দত্ত আরও জানান, পিকআপটি শনাক্ত করার পর দেখা যায় গাড়ির নিবন্ধন একটি গাড়ি বিক্রির প্রতিষ্ঠানের নামে। প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে ক্রেতাকে শনাক্ত করা হয়, যিনি নিজেই গাড়িটির চালক ছিলেন। তাঁর কাছ থেকে তথ্য নিয়ে হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করা হয়।
এই হত্যা মামলার তদন্ত এখনও চলছে এবং পিবিআই আরও বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করছে বলে জানানো হয়েছে।



