মুক্তিযুদ্ধের অজানা অধ্যায়: হাফিজ উদ্দিন আহমদের স্মৃতিচারণে একাত্তরের রণাঙ্গন
মুক্তিযুদ্ধের অজানা অধ্যায়: হাফিজ উদ্দিন আহমদের স্মৃতি

মুক্তিযুদ্ধের অজানা অধ্যায়: হাফিজ উদ্দিন আহমদের স্মৃতিচারণে একাত্তরের রণাঙ্গন

মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানী হাফিজ উদ্দিন আহমদ তাঁর সৈনিক জীবনের গৌরবময় অধ্যায় নিয়ে আলোচনা করেছেন। তাঁর বই 'গৌরবের একাত্তর রক্তাক্ত পঁচাত্তর' এ উল্লেখিত বিষয়গুলোর ওপর আলোকপাত করে তিনি ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের ঘটনাবলি স্মরণ করেছেন।

মার্চের উত্তাল দিনগুলো: বিদ্রোহের সূচনা

হাফিজ উদ্দিন আহমদ জানান, ১৯৭১ সালের ১৬ মার্চ তিনি পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ঢাকায় ফিরে আসেন। ফলে মার্চের শুরুর দিকের গণ-আন্দোলন বা ৭ মার্চের ভাষণ সরাসরি দেখার সুযোগ তাঁর হয়নি। তবে মানুষের তীব্র ক্ষোভ তিনি অনুভব করতে পেরেছিলেন। বিশেষ করে পার্লামেন্টের অধিবেশন পিছিয়ে দেওয়ায় বাঙালিদের সংক্ষুব্ধতা তিনি লক্ষ্য করেছিলেন।

ঢাকায় আসার পরপরই তাঁকে সীমান্ত এলাকায় শীতকালীন মহড়ায় পাঠানো হয়। সেখানে তিনি সৈনিকদের নিয়ে দিন-রাত যুদ্ধের কলাকৌশল রপ্ত করতে ব্যস্ত ছিলেন। ২৯ মার্চ পর্যন্ত এই সামরিক অনুশীলনেই নিযুক্ত থাকায় ২৫ মার্চের ভয়াবহ ক্র্যাকডাউন বা ২৬ ও ২৭ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কে জানার সুযোগ তাঁর ছিল না।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিদ্রোহের ঐতিহাসিক মুহূর্ত

২৯ মার্চ তাঁদের ক্যান্টনমেন্টে ডেকে পাঠানো হয়। গভীর রাতে সেখানে পৌঁছানোর পর ৩০ মার্চ সকাল সাড়ে সাতটায় ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার আবদুর রহিম দুররানি নির্দেশ দেন যে তাদের ব্যাটালিয়ন অর্থাৎ প্রথম ইস্ট বেঙ্গলকে নিরস্ত্র করা হয়েছে। ইতিমধ্যে অন্যান্য ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট বিদ্রোহ করলেও তারা শীতকালীন মহড়ায় থাকায় খবরটি জানতেন না।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ব্রিগেড কমান্ডারের নিরস্ত্র করার নির্দেশের সঙ্গে সঙ্গেই বাঙালি সৈনিকেরা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং অস্ত্রাগার ভেঙে অস্ত্র নিয়ে নেয়। শুরু হয় এক ঐতিহাসিক বিদ্রোহ। ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে টানা আট ঘণ্টা সম্মুখযুদ্ধ চলে। তাদের কমান্ডিং অফিসার ছিলেন বাঙালি লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেজাউল জলিল, যিনি সংকট মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত দিতে পারেননি। সৈনিকেরা হাফিজ উদ্দিন আহমদকে বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিতে অনুরোধ করলে তিনি বিবেকের ডাকে সৈনিকদের সঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত নেন।

কামালপুর যুদ্ধ: রক্তক্ষয়ী লড়াই

৩১ জুলাই সংঘটিত কামালপুর যুদ্ধ ছিল মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ প্রথাগত আক্রমণ। হাফিজ উদ্দিন আহমদ বর্ণনা করেন, পাকিস্তানি বাহিনীর অবস্থান ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। তাদের কংক্রিটের তৈরি মজবুত বাংকার এবং ভারী কামান ছিল। সামরিক পরিভাষায় এমন অবস্থানকে 'স্ট্রং পয়েন্ট' বলা হয়। পুরো এলাকাটি মাইন ফিল্ড দিয়ে সুরক্ষিত ছিল।

নিয়ম অনুযায়ী এমন ঘাঁটিতে আক্রমণ করতে কামানের সাহায্য প্রয়োজন, কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে তখন কোনো আর্টিলারি ছিল না। গোলন্দাজ বাহিনীর সহায়তা ছাড়াই ২৫০ জন মুক্তিযোদ্ধা আক্রমণ চালিয়েছিলেন। ফলে লড়াইটি ছিল অত্যন্ত রক্তক্ষয়ী। প্রায় ১০০ জন সহযোদ্ধা হতাহত হয়েছিলেন। এই যুদ্ধে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন মমতাজ শহীদ হন এবং হাফিজ উদ্দিন আহমদ নিজেও গুরুতর আহত হন।

সিলেট বিজয়: মুক্তিবাহিনীর গৌরব

সিলেটের জকিগঞ্জের গৌরীপুরে পাকিস্তান আর্মির ৩১ পাঞ্জাব ব্যাটালিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মুক্তিবাহিনী ডিফেন্সে ছিল। চার ঘণ্টার এই যুদ্ধে পাকিস্তানের মেজর সারোয়ারসহ ৮০ জন নিহত হন এবং ৩২ জন পাঞ্জাবি সৈন্যকে জীবিত বন্দী করা হয়। এই যুদ্ধের পর পাকিস্তানিদের মনোবল ভেঙে যায় এবং তারা সিলেটের দিকে পিছু হটতে শুরু করে।

ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে মেজর জিয়াউর রহমানসহ প্রায় ১ হাজার ২০০ সৈনিক দুর্গম পথে সিলেটের দিকে রওনা হন। ১৪ ডিসেম্বর সকালে তারা এমসি কলেজের প্রিন্সিপালের বাসভবনের কাছে পৌঁছান। পাকিস্তানি সেনারা ভাবতেই পারেনি মুক্তিবাহিনীর বিশাল দল সরাসরি শহরের এমসি কলেজের টিলায় হানা দেবে।

দুপুরের দিকে ভারতীয় মেজর রাওয়ের বেতার সেট সচল হলে হাফিজ উদ্দিন আহমদ কামানের বদলে বিমান হামলার অনুরোধ জানান। আধা ঘণ্টা পর দুটি ভারতীয় মিগ বিমান পাকিস্তানি বাংকার লক্ষ্য করে ১৫ মিনিট রকেট হামলা চালায়। এই ভয়াবহ আক্রমণে পাকিস্তানি সেনারা পর্যুদস্ত হয়ে আত্মসমর্পণ করে। তৎকালীন ১৮টি জেলার মধ্যে একমাত্র সিলেট জেলাই মুক্তিবাহিনী নিজেদের প্রচেষ্টায় শত্রুমুক্ত করতে পেরেছিল।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ: উজ্জ্বল দৃষ্টিভঙ্গি

হাফিজ উদ্দিন আহমদ বাংলাদেশের একটি চমৎকার ভবিষ্যৎ দেখেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে এ দেশের মানুষের অসমসাহস ও দেশপ্রেম ছিল অতুলনীয়। ২০২৪ সালের জুলাই মাসের গণ-অভ্যুত্থানে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণও তাঁর কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়েছে। এই আন্দোলনে শুধু ছাত্রছাত্রীরা নয়, সর্বস্তরের মানুষ অংশ নিয়েছেন। নারী-পুরুষনির্বিশেষে সাধারণ পেশার মানুষ, এমনকি দরিদ্র ও খেটে খাওয়া মানুষও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে শামিল হয়েছে। এসব দেখেই তাঁর মনে হয়, বাংলাদেশের সামনে এক উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে।