ইরানে সরকার পতনের মোসাদ পরিকল্পনা ব্যর্থ, নেতানিয়াহুর ক্ষোভ
ইরানে ব্যাপক জনবিক্ষোভ উসকে দিয়ে বর্তমান সরকারের পতন ঘটানোর একটি উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা করেছিল ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক বিস্তৃত প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। তবে ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধ শুরুর পর সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হওয়ায় মোসাদের ওপর চরম ক্ষুব্ধ হয়েছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
মোসাদ প্রধানের দাবি ও নেতানিয়াহুর আশা
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কর্তৃক ইরানের ওপর হামলা শুরুর মাত্র কয়েক দিন আগে মোসাদ প্রধান ডেভিড বার্নিয়া প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেন। সে সময় তিনি দৃঢ়ভাবে দাবি করেছিলেন, মোসাদ ইরানি বিরোধী পক্ষকে ঐক্যবদ্ধ করে দেশটিতে একটি পূর্ণাঙ্গ সরকার পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের একাধিক সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তৈরি ওই প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বার্নিয়া জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে ওয়াশিংটন সফরকালে মার্কিন গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের কাছেও এই প্রস্তাব পেশ করেন। পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য ছিল, প্রথমে ইরানের শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতাদের হত্যা করা এবং এরপর ধারাবাহিক গোয়েন্দা অভিযানের মাধ্যমে দেশটিতে একটি গণ-অভ্যুত্থান ঘটানো।
ট্রাম্পকে রাজি করানো ও যুদ্ধের সূচনা
নেতানিয়াহু মোসাদের এই প্রতিশ্রুতিকে পুঁজি করেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বুঝিয়েছিলেন যে, ইরানি সরকারের পতন ঘটানো সম্ভব এবং এটি একটি দ্রুত সমাধান হবে। যুদ্ধের শুরুতে ট্রাম্পের দেওয়া আট মিনিটের এক ভিডিও বার্তাতেও এর স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়। যেখানে তিনি ইরানি জনগণের উদ্দেশে বলেছিলেন, "আপনাদের স্বাধীনতার সময় ঘনিয়ে এসেছে... আমরা কাজ শেষ করলে আপনারা সরকারের দায়িত্ব বুঝে নিন।"
তবে যুদ্ধ শুরুর দুই সপ্তাহ পার না হতেই সরকার পতনের সেই স্বপ্ন ফিকে হতে শুরু করে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-র সর্বশেষ মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইরানের বর্তমান সরকারের পতন ঘটার কোনো বাস্তবসম্মত সম্ভাবনা নেই। বরং সিআইএ সতর্ক করেছে যে, শীর্ষ নেতাদের হত্যা করা হলে আরও কট্টরপন্থি ও রক্ষণশীল কোনও নেতৃত্ব ক্ষমতায় আসতে পারে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে।
মার্কিন সতর্কতা ও মোসাদের ব্যর্থতা
নিউ ইয়র্ক টাইমস বলছে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র মিলে ইরানে ব্যাপক বিদ্রোহ উসকে দিতে পারবে, এমন অতি-আশাবাদী বিশ্বাসই ছিল এই যুদ্ধের প্রস্তুতির অন্যতম বড় ভুল। মার্কিন সামরিক নেতারা ট্রাম্পকে আগেই সতর্ক করেছিলেন যে, মাথার ওপর যখন বোমা পড়ে, তখন সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করে না, বরং তারা আরও বেশি করে সরকারের পাশে দাঁড়ায়।
প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ইরানে কোনও গণ-অভ্যুত্থান না হওয়ায় মোসাদের ওপর হতাশ হয়ে পড়েছেন নেতানিয়াহু। যুদ্ধ শুরুর কয়েক দিন পর এক গোপন নিরাপত্তা বৈঠকে তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, "মোসাদের অভিযান যদি ফলপ্রসূ না হয়, তাহলে ট্রাম্প যেকোনও মুহূর্তে যুদ্ধ বন্ধ করে দিতে পারেন, যা আমাদের জন্য বিপর্যয়কর হবে।"
গোয়েন্দা মহলে শুরু থেকেই সন্দেহ
ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আমান এবং অনেক মার্কিন উর্ধ্বতন কর্মকর্তাও মোসাদের এই পরিকল্পনার কার্যকারিতা নিয়ে শুরু থেকেই সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। তাদের মতে, ইরানের সরকারী কাঠামো ও জনসমর্থন অনেক বেশি শক্তিশালী। বর্তমানে ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের নিজস্ব মূল্যায়ন হলো, ইরান সরকার কিছুটা দুর্বল হলেও এখনও যথেষ্ট সুসংহত ও স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে।
এই ব্যর্থ পরিকল্পনা ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে তীব্র মতবিরোধ ও সমন্বয়হীনতার চিত্রও ফুটিয়ে তুলেছে, যা ভবিষ্যতে আরও বড় সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।



