মার্কিন শীর্ষ সন্ত্রাসবিরোধী কর্মকর্তা জো কেন্ট ইরান যুদ্ধের বিরোধিতা করে পদত্যাগ করেছেন
যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সন্ত্রাসবিরোধী কর্মকর্তা জো কেন্ট ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের বিরোধিতা করে পদত্যাগ করেছেন। গতকাল মঙ্গলবার খুদে ব্লগ লেখার সাইট এক্সে তাঁর পদত্যাগপত্রের একটি প্রতিলিপি প্রকাশ করা হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্দেশে কেন্ট লিখেছেন, 'ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে সমর্থন জানাতে আমার বিবেক সাড়া দিচ্ছে না।' তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, 'ইরান আমাদের দেশের জন্য কোনো আসন্ন হুমকি তৈরি করেনি। এটা স্পষ্ট, ইসরায়েল ও তাদের প্রভাবশালী মার্কিন লবিস্টদের কাছ থেকে আসা চাপের কারণে আমরা এই যুদ্ধ শুরু করেছি।'
জো কেন্টের পেশাগত ও ব্যক্তিগত পটভূমি
৪৫ বছর বয়সী জো কেন্ট জাতীয় সন্ত্রাসবিরোধী কেন্দ্রের পরিচালক হিসেবে আট মাসের কম সময় দায়িত্বে ছিলেন। গত বছরের জুলাইয়ে সিনেট ৫২–৪৪ ভোটে তাঁকে অনুমোদন দেয়, যেখানে তিনি শুধু রিপাবলিকানদের কাছ থেকে সমর্থন পেয়েছিলেন। কেন্ট ইউএস আর্মি স্পেশাল ফোর্সেসের সাবেক সদস্য হিসেবে ১১টি যুদ্ধাভিযানে অংশ নিয়েছেন। সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএতে আধা সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেছেন।
কেন্টের ব্যক্তিগত জীবনেও ট্র্যাজেডি রয়েছে। তাঁর প্রথম স্ত্রী শনন কেন্ট মার্কিন নৌবাহিনীর ক্রিপ্টোলজিক টেকনিশিয়ান ছিলেন, যিনি ২০১৯ সালে সিরিয়ায় এক আত্মঘাতী বিস্ফোরণে নিহত হন। রাজনৈতিক অঙ্গনে, কেন্ট ২০২২ ও ২০২৪ সালে দুবার যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে ওয়াশিংটনের দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলের রিপাবলিকান প্রার্থী হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য নির্বাচন করেছিলেন, কিন্তু দুবারই মধ্যপন্থী ডেমোক্র্যাট মেরি গ্লুয়েসেনকাম্প পেরেজের কাছে পরাজিত হন।
পদত্যাগের কারণ ও রাজনৈতিক প্রভাব
কেন্টের পদত্যাগের ঘটনাটি ইরানে ট্রাম্প প্রশাসনের চালানো যুদ্ধের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে উচ্চপর্যায়ের কোনো ব্যক্তির প্রতিবাদ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তিনি দাবি করেছেন, ইরানকে ঘিরে হুমকির বিষয়ে ট্রাম্পকে ভুল বোঝানো হয়েছে, এবং এর জন্য কিছু গণমাধ্যম, ইসরায়েলের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও লবিস্টদের দায়ী করেছেন। কেন্ট স্মরণ করিয়ে দেন, ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে 'অন্তহীন যুদ্ধ' থেকে দূরে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, কিন্তু বর্তমান নীতি সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কেন্টের পদত্যাগ মার্কিন সামরিক কৌশলে পরিবর্তন আনতে না পারলেও এর রাজনৈতিক প্রভাব থাকতে পারে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের আট মাসের কম সময় বাকি থাকায়, ট্রাম্পের নীতির প্রতি বিরূপ প্রতিক্রিয়া রিপাবলিকানদের ভোটের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। আল–জাজিরার সংবাদদাতা মাইক হানা বলেন, কেন্ট ট্রাম্পের 'মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন' শিবিরে উচ্চপর্যায়ের অবস্থানে ছিলেন, তাই তাঁর সমালোচনা ট্রাম্পের অনুসারীদের মধ্যে হতাশা তৈরি করতে পারে।
প্রতিক্রিয়া ও বিতর্ক
কেন্টের পদত্যাগপত্র রিপাবলিকানদের মধ্যে বিভক্তি তৈরি করেছে। কেউ কেউ তাঁর পদত্যাগকে নৈতিক অবস্থান বিবেচনা করে সমর্থন করেছেন, আবার কেউ কেউ প্রেসিডেন্টের প্রতি তাঁর আনুগত্য বজায় না রাখার বিষয়ে নিন্দা জানিয়েছেন। ট্রাম্প নিজেও কেন্টকে নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন, বলেছেন, 'আমি সব সময় তাঁকে ভালো মানুষ হিসেবে বিবেচনা করেছি। কিন্তু সব সময় মনে হয়েছে, তিনি নিরাপত্তার বিষয়ে দুর্বল।' হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লেভিট কেন্টের দাবিকে 'অপমানজনক ও হাস্যকর' উল্লেখে খারিজ করে দিয়েছেন।
অন্যদিকে, রক্ষণশীল ধারার গণমাধ্যম বিশ্লেষক টাকার কার্লসন কেন্টের সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেছেন, তাঁকে 'সবচেয়ে সাহসী মানুষ' বলে অভিহিত করেছেন। তবে সমালোচকরা কেন্টের মন্তব্যকে ইহুদিবিদ্বেষী হিসেবে অভিযুক্ত করেছেন, কারণ তিনি ইসরায়েলকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে ট্রাম্পকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করার দায়ী করেছেন। মার্কিন বিমানবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডন বেকন ইহুদিবিদ্বেষকে 'একটি অনিষ্ট' বলে উল্লেখ করেছেন।
কেন্টের পদত্যাগ ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও পররাষ্ট্রনীতির দিকনির্দেশনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, যা আগামী দিনে মার্কিন রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
