সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের কালভার্ট ধ্বংস, তিন হাজার সদস্যের যৌথ বাহিনীর বিশাল অভিযান চলছে
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকা জঙ্গল সলিমপুরে অপরাধীদের আস্তানা উচ্ছেদে পরিচালিত বিশাল অভিযানে বাধা সৃষ্টি করতে সন্ত্রাসীরা খালের ওপরের কালভার্ট ভেঙে দিয়েছে। সোমবার (৯ মার্চ) দুপুর পর্যন্ত চলমান এই অভিযানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তিন হাজারের বেশি সদস্য কয়েক ভাগে বিভক্ত হয়ে তল্লাশি চালাচ্ছেন।
অভিযানের বিস্তারিত ও চ্যালেঞ্জ
অভিযান চলাকালে বেলা ১২টার দিকে চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি নাজমুল হাসান সাংবাদিকদের জানান, পুলিশ, র্যাব, সেনাবাহিনী ও বিজিবি যৌথভাবে একটি সুনির্দিষ্ট ‘কর্মপরিকল্পনা’ তৈরি করে এই অভিযান পরিচালনা করছে। তিনি উল্লেখ করেন, অভিযানে ইতোমধ্যে কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করা হলেও পুরো তল্লাশি শেষ না হওয়া পর্যন্ত উদ্ধারকৃত সামগ্রীর বিস্তারিত তালিকা পাওয়া সম্ভব নয়।
সন্ত্রাসীরা যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গাড়ি প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য ছিন্নমূল এলাকার পর আলী নগরের শুরুতে একটি বড় ট্রাক আড়াআড়িভাবে রেখে ব্যারিকেড তৈরি করেছে। এ ছাড়া কিছু দূরে খালের ওপরের কালভার্টটি সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলা হয়েছে। অতিরিক্ত ডিআইজি নাজমুল হাসান আরও জানান, গাড়ি চলাচলের পথ সুগম করতে তারা খালে ইট, বালি ও সিমেন্ট দিয়ে ভরাট করে বিকল্প রাস্তা তৈরি করে ভেতরে প্রবেশ করেছেন।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা
বায়েজিদ লিঙ্ক রোড এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাঁজোয়া যান মোতায়েন রাখা হয়েছে এবং নিরাপত্তার স্বার্থে বর্তমানে সাধারণ ও সাংবাদিকদের ওই এলাকায় প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। এই সতর্কতা ব্যবস্থা অভিযানের গুরুত্ব ও ঝুঁকির মাত্রা তুলে ধরছে।
পটভূমি: দীর্ঘদিনের অপরাধী অভয়ারণ্য
জঙ্গল সলিমপুরের এই ‘দুর্ভেদ্য সাম্রাজ্যে’ গত ১৯ জানুয়ারি অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী ধরতে গিয়ে স্থানীয়দের হামলায় র্যাব-৭-এর নায়েক সুবেদার মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হওয়ার পর থেকেই যৌথ অভিযানের ক্ষেত্র প্রস্তুত হচ্ছিল। ওই সময় আনুমানিক ৪০০ থেকে ৫০০ জন দুষ্কৃতকারী মাইকে ঘোষণা দিয়ে র্যাব সদস্যদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়।
সেই ঘটনার পর র্যাব প্রধান এ কে এম শহীদুর রহমান জঙ্গল সলিমপুরে বড় ধরনের অভিযানের ঘোষণা দিয়েছিলেন। প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর খাস জমি নিয়ে গঠিত এই এলাকায় পাহাড় কেটে গড়ে তোলা ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলো দীর্ঘদিন ধরেই অপরাধীদের অভয়ারণ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
সরকারি পরিকল্পনা ও বাধা
২০২২ সালে সরকার এই এলাকা দখলমুক্ত করে কেন্দ্রীয় কারাগার ও স্পোর্টস ভিলেজসহ বিভিন্ন স্থাপনা করার পরিকল্পনা নিলেও বারবার বাধার মুখে পড়ে প্রশাসন। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর এখানে ইয়াছিন বাহিনী ও রোকন-গফুর বাহিনীর মতো স্থানীয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা আবারও বেড়ে যায়, যা কয়েকবার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও খুনের ঘটনায় রূপ নেয়।
গত বছরের ৪ অক্টোবর দুই পক্ষের গোলাগুলিতে একজন নিহত হন এবং সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকরাও হামলার শিকার হন। আজকের এই সাঁড়াশি অভিযানের মাধ্যমে প্রশাসন দীর্ঘদিনের এই ‘অঘোষিত স্বায়ত্তশাসিত’ অপরাধী অঞ্চলটিকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছে, যা স্থানীয় নিরাপত্তা ও উন্নয়নের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।



