চট্টগ্রামে প্রশিক্ষিত শুটারদের সন্ত্রাসী তাণ্ডব, বিদেশ থেকে নিয়ন্ত্রণ
চট্টগ্রামে সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটছে, যেখানে প্রশিক্ষিত শুটাররা অত্যাধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করছে। গুলি করে হত্যা, চাঁদাবাজি ও প্রকাশ্য হামলার মতো ঘটনাগুলোতে এসব শুটারদের জড়িত থাকার প্রমাণ মিলছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মতে, বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের নেতৃত্বে এই সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক পরিচালিত হচ্ছে।
সন্ত্রাসী ঘটনায় প্রশিক্ষিত শুটারদের ভূমিকা
গত শনিবার সকালে চট্টগ্রাম নগরের চন্দনপুরা এলাকায় পুলিশ পাহারায় থাকা এক ব্যবসায়ীর বাসায় গুলি ছোড়ে সন্ত্রাসী দলের চার সদস্য। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, একজন সন্ত্রাসী দুই হাতে দুটি পিস্তল থেকে গুলি করছে, অন্যদের হাতে এসএমজি, চায়নিজ রাইফেল ও শটগান ছিল। অস্ত্র চালানোর ধরন দেখে পুলিশ প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে যে, এই চারজনই প্রশিক্ষিত শুটার। ব্যবসায়ী দাবি করেছেন, কোটি টাকা চাঁদার দাবিতে এই গুলিবর্ষণ করা হয়েছে।
এছাড়াও, গত নভেম্বরে নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার খন্দকারপাড়া এলাকায় বিএনপি-মনোনীত প্রার্থীর জনসংযোগে গুলি করে সরোয়ার হোসেন ওরফে বাবলাকে হত্যা করা হয়। এই ঘটনায়ও প্রশিক্ষিত শুটার জড়িত বলে পুলিশ সন্দেহ করছে। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি রাউজানের পূর্ব গুজরা ইউনিয়নের অলিমিয়াহাট বাজারে প্রকাশ্যে গুলি করে আবদুল মজিদ নামের এক যুবদল কর্মীকে হত্যা করা হয়, যেখানে মুখোশ পরা অস্ত্রধারীরা মোটরসাইকেলে এসে দ্রুত সরে পড়ে।
বিদেশ থেকে নিয়ন্ত্রণ ও শুটারদের ক্যাটাগরি
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বিদেশে বড় সাজ্জাদ এবং দেশে রায়হান ও মোবারকের নির্দেশনায় তাদের দলের শুটাররা খুন ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছেন। এই দলে শুটারদের তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছে: 'এ' ক্যাটাগরির শুটাররা পরিকল্পনা করেন, 'বি' ক্যাটাগরির শুটাররা খুন ও বড় হামলায় অংশ নেন, এবং 'সি' ক্যাটাগরির সদস্যরা পালিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করেন। রাউজান ও রাঙ্গুনিয়ার দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় এই শুটারদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
দলের সদস্যদের মধ্যে রাশেদ, ভাতিজা মোহাম্মদ, নাজিম উদ্দিন, ববি আলম, কামাল, হাসান, নুরুল হক, বোরহান, মবিন, কাদের, তপু, আজম, মনির, তুষার, তুহিন, সোহেল, ছালেক ও এরশাদের নাম জানা গেছে। তবে পুলিশ এখনো অনেককে গ্রেপ্তার করতে পারেনি, এবং অত্যাধুনিক অস্ত্র উদ্ধারেও তারা ব্যর্থ হচ্ছে।
সাজ্জাদ আলীর প্রতিক্রিয়া ও পুলিশের পদক্ষেপ
বিদেশে বসে খুন-চাঁদাবাজির অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে সাজ্জাদ আলী প্রথম আলোকে বলেন, 'বিদেশে ব্যবসা করি, দেশে ভাড়া ঘর থেকেও আয় আছে। আমাদের পরিবার বিত্তশালী। আমি কেন বাহিনী তৈরি করব? উল্টো আমাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে সন্ত্রাসীরা।' তিনি দাবি করেন, ছোট সাজ্জাদ বা রায়হানের সঙ্গে তাঁর কোনো যোগাযোগ নেই।
চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মো. তারেক আজিজ বলেন, বিদেশে পলাতক সাজ্জাদের গড়ে তোলা এই বাহিনীই নগর ও জেলায় খুন, চাঁদাবাজি ও অস্ত্রবাজির ঘটনা ঘটিয়ে আসছে। ইতিমধ্যে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, এবং অন্যদের ধরতে অভিযান চলছে। তবে গত শনিবার চন্দনপুরায় ব্যবসায়ীর বাসায় গুলি করা শুটারদের এখনো ধরা যায়নি, এবং এই ঘটনায় কোনো মামলাও হয়নি।
পুলিশের এক কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, সন্ত্রাসীদের অস্ত্র চালনার ধরন দেখে বোঝা যায় তারা প্রশিক্ষিত শুটার, যাদের প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস রয়েছে। নগরের চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বাবুল আজাদ জানান, অস্ত্রধারীদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালানো হচ্ছে, এবং এর আগে জানুয়ারিতে একই ব্যবসায়ীর বাসায় গুলির ঘটনায় জড়িত চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
