উত্তরায় গৃহকর্মী সেজে চেতনানাশক প্রয়োগে হত্যা: পুলিশের তদন্তে হাঁটার ভঙ্গি থেকে শনাক্ত
ঢাকার উত্তরায় গৃহকর্মী সেজে চেতনানাশক প্রয়োগ করে গৃহকর্ত্রীকে হত্যা ও স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা লুটের ঘটনায় পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে বিলকিছ বেগম নামের এক নারীকে। তদন্তে দেখা গেছে, তিনি দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় একই কৌশলে চুরি করে আসছেন, কিন্তু এবার তাঁর প্রয়োগ করা চেতনানাশকে একজনের মৃত্যু হয়েছে।
তদন্তের সূচনা: সিসিটিভি ফুটেজ ও হাঁটার ভঙ্গি
ঘটনাটি ঘটে ১৭ ফেব্রুয়ারি, যখন উত্তরা-৭ নম্বর সেক্টরের একটি বাসার গৃহকর্ত্রী আয়শা আক্তার (৬২) ও তাঁর স্বামী মো. আনোয়ার হোসেনকে (৬৮) চেতনানাশক খাওয়ানো হয়। অতিরিক্ত মাত্রায় চেতনানাশক প্রয়োগে আয়শা আক্তারের মৃত্যু হয়, আর আনোয়ার হোসেনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শুরুতে তদন্তকারীরা অন্ধকারে ছিলেন, কারণ গৃহকর্মী ভুয়া পরিচয় দিয়েছিলেন এবং বাসার সিসিটিভি ক্যামেরা নষ্ট ছিল।
পাশের বাড়ির একটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পাওয়া গেলেও, সেখানে আসামির মুখ স্পষ্ট ছিল না। তবে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ঢাকা মেট্রো উত্তরের উপপরিদর্শক (এসআই) রবিউল ইসলাম ফুটেজে হাঁটার বিশেষ ভঙ্গি লক্ষ্য করেন। তিনি বলেন, ‘এই হাঁটার ভঙ্গি আমার পরিচিত মনে হয়, কারণ তিন বছর আগে একটি চুরির মামলায় এক নারীকে গ্রেপ্তার করেছিলাম।’ এরপর পুরোনো নথি ও গুগল ড্রাইভে সংরক্ষিত ছবি মিলিয়ে তিনি নিশ্চিত হন যে আসামি বিলকিছ বেগম।
বিলকিছ বেগমের পরিচয় ও অপকৌশল
বিলকিছ বেগমের বয়স ৪৩ বছর, এবং তিনি বিভিন্ন বাসাবাড়িতে ছদ্মনামে কাজ নিয়ে চুরি করেন। তাঁর কৌশল হলো:
- বাসার লোকজনকে কৌশলে চেতনানাশক খাওয়ানো
- অজ্ঞান করে মালামাল লুট করা
- নির্বিঘ্নে পালিয়ে যাওয়া
তিনি কাজ নেওয়ার সময় নিজের সঠিক পরিচয়, ছবি, এনআইডি বা মুঠোফোন নম্বর দেন না, যা তাঁকে শনাক্ত করা কঠিন করে তোলে। তাঁর বিরুদ্ধে ঢাকার বিভিন্ন থানায় অন্তত ৫টি মামলা রয়েছে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে হাতিরঝিল থানার একটি মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, এবং তিনি দেড় মাস কারাগারে ছিলেন। কারাগার থেকে বেরিয়ে তিনি আবারও একই কৌশল অবলম্বন করেন।
ঘটনার বিস্তারিত ও গ্রেপ্তার
১৪ ফেব্রুয়ারি বিলকিছ বেগম উত্তরা-৭ নম্বর সেক্টরে আয়শা আক্তারের বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ নেন, নিজেকে ‘মমতাজ’ বা ‘মারুফা’ নামে পরিচয় দেন। ১৮ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় পরিবারের সদস্যরা তাঁদের অচেতন অবস্থায় পান, এবং আয়শা আক্তার মারা যান। পিবিআইয়ের তদন্তে পাশের বাসার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়, যেখানে দেখা যায় গৃহকর্মী সকালে ঢুকছেন ও বেলা আড়াইটার দিকে বের হচ্ছেন।
এসআই রবিউল ইসলাম ফুটেজ দেখে সন্দেহ করেন এবং হাতিরঝিল থানার পুরোনো মামলার ডকেট থেকে বিলকিছ বেগমের তথ্য সংগ্রহ করেন। গুগল ড্রাইভে সংরক্ষিত তাঁর ছবি পরিবারের সদস্যদের দেখানো হলে তাঁরা শনাক্ত করেন। এরপর ২১ ফেব্রুয়ারি গাজীপুর থেকে বিলকিছ বেগমকে গ্রেপ্তার করা হয়, এবং তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
তদন্তের চ্যালেঞ্জ ও সাফল্য
পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তরের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক এনায়েত হোসেন মান্নান বলেন, ‘বিলকিছ বেগম কাজ নেওয়ার সময় কৌশলে নিজের পরিচয় গোপন রাখেন, যা তাঁকে শনাক্ত করা কঠিন করে।’ তবে প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ ও পুরোনো রেকর্ডের মাধ্যমে পুলিশ সফল হয়। এই ঘটনা গৃহকর্মী নিয়োগে সতর্কতা ও পুলিশের তদন্ত দক্ষতা উভয়ই তুলে ধরে।
