শারীরিক প্রতিবন্ধী কিশোর অটোরিকশাচালকের নির্মম হত্যায় নোয়াখালীতে শোকের ছায়া
জন্মগতভাবে ডান হাত ও ডান পা অবশ থাকা সত্ত্বেও জীবনসংগ্রামে দাঁড়াতে চেয়েছিল ১৭ বছর বয়সী কিশোর আবদুল আহাদ। কিন্তু সেই সংগ্রামের পথ থেমে গেল ঘাতকের হাতে। নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার কুতুবপুর গ্রামে তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে, যা এলাকায় তীব্র শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
আহাদের করুণ জীবনকাহিনী ও সংগ্রাম
আহাদের জীবন শুরু থেকেই ছিল সংগ্রামময়। মাত্র তিন বছর বয়সে বাবা পরিবার ত্যাগ করে চলে যান। পরে মাকে অন্যত্র বিয়ে দেওয়া হয়, আর আহাদের দায়িত্ব নেন স্বামী পরিত্যক্তা খালা জান্নাতুল ফেরদাউস। তিনি নিজের সন্তানের মতোই আহাদকে লালন-পালন করেন। স্থানীয় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করলেও আর্থিক সংকটে পঞ্চম শ্রেণির পর তা বন্ধ হয়ে যায়।
শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উঠে আহাদ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালানো শুরু করে। গত তিন বছর ধরে সে জিলানী নামের এক ব্যক্তির গ্যারেজে কাজ করত। প্রথমে বাড়ি থেকে যাতায়াত করলেও পরে গ্যারেজেই থাকার ব্যবস্থা হয়। নিজের রোজগার দিয়েই সে খরচ চালাত এবং পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখত। এলাকাবাসীর মতে, আহাদ ছিল অত্যন্ত ভদ্র ও নম্র স্বভাবের ছেলে।
নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত বিবরণ
গত শনিবার দিবাগত রাতে আহাদকে অটোরিকশা নিয়ে বের হওয়ার পর আর ফেরেনি। পরে একটি ধানখেতে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তদন্তে জানা গেছে, দুর্বৃত্তরা তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করে মুখ ও গলা স্কচটেপ দিয়ে পেঁচিয়েছিল। হত্যার পর অটোরিকশাটি ছিনিয়ে নিয়ে যায় তারা।
এই ঘটনায় আহাদের পরিবার ও সহপাঠীরা হতবাক। তার মা বিবি ফাতেমা এবং খালা জান্নাতুল ফেরদাউস ক্রন্দনরত অবস্থায় রয়েছেন। খালা বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন এবং আহাদের ফিরে পাওয়ার আকুতি জানাচ্ছেন। গ্যারেজের মালিক জিলানী বলেন, ‘শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়া সত্ত্বেও ছেলেটি নিজের পায়ে দাঁড়াতে চেয়েছিল। অটোরিকশার জন্য এমন একজনকে হত্যা করা হবে—এটা ভাবতেই পারিনি।’ তিনি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
পুলিশের তদন্ত ও পূর্বের ঘটনার পুনরাবৃত্তি
বেগমগঞ্জ থানার পরিদর্শক মো. হাবিবুর রহমান জানান, আহাদের মামা বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। ঘটনাটি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে এবং একটি টিম মাঠে কাজ করছে। ময়নাতদন্ত শেষে লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ছয় মাসে নোয়াখালীতে এটিই দ্বিতীয় অটোরিকশাচালক হত্যার ঘটনা। এর আগে ২০২৫ সালের ২৫ আগস্ট রাতে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার রফিকুল ইসলাম নামের এক চালককে হত্যা করে অটোরিকশা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। একই বছরের ১০ এপ্রিল সদর উপজেলায় বাবর হোসেন নামের আরেক চালকের লাশ উদ্ধার করা হয়।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবু তৈয়ব মো. আরিফ হোসেন বলেন, প্রতিটি ঘটনায় পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে। আগের ঘটনাগুলোর আসামিরা গ্রেপ্তার হয়ে আদালতে স্বীকারোক্তিও দিয়েছেন। শনিবার রাতের ঘটনাটির ক্ষেত্রেও দ্রুত অপরাধীদের শনাক্ত করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
স্থানীয় অটোরিকশাচালকদের মধ্যে ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতা
এই হত্যাকাণ্ডের পর স্থানীয় অটোরিকশাচালকদের মধ্যে ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিয়েছে। মাইজদীতে তিন বছর ধরে অটোরিকশা চালানো মো. জহির বলেন, ‘আগের হত্যাকাণ্ডের খবর শোনার পর গভীর রাতে দূরে যাত্রী নিয়ে যেতে ভয় পাই। এখন শুধু শহরের ভেতরে পরিচিত ও জনবহুল সড়কেই চলাচল করি।’ এলাকাবাসী ও চালকরা দ্রুত অপরাধীদের গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবি জানাচ্ছেন, যাতে ভবিষ্যতে এমন নির্মম ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়।
